ঢাকা    বুধবার, ২৩ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ৭ আশ্বিন ১৪৩৩ ১০ রবিউস সানি ১৪৪৮ হিজরি
বাংলাদেশ সময়
বাংলা ভিউজ

ব্যাংক খাতে রেকর্ড সহায়তা কেন্দ্রীয় ব্যাংকের

সংকটাপন্ন ব্যাংকখাত সচল রাখতে ২০২৫ সালে ২১ লাখ ৬৮ হাজার কোটি টাকার তারল্য সহায়তা দিয়েছে বাংলাদেশ ব্যাংক। খেলাপি ঋণের বিস্তার, মূলধন ঘাটতি, ইসলামী ব্যাংকগুলোর আর্থিক দুরবস্থা, দুর্বল আর্থিক প্রতিষ্ঠান এবং বিনিয়োগকারীদের আস্থাহীনতার কারণে চাপে থাকা ব্যাংকিং ব্যবস্থাকে সচল রাখতে এই বিপুল পরিমাণ অর্থ জোগান দেওয়া হয়েছে বলে জানিয়েছে কেন্দ্রীয় ব্যাংক।[BANGVIEWS-POST:529]বাংলাদেশ ব্যাংকের সদ্য প্রকাশিত ‘ফিন্যান্সিয়াল স্ট্যাবিলিটি রিপোর্ট’-এ বলা হয়েছে, ক্রমবর্ধমান আর্থিক চাপের মধ্যেও ব্যাংকিং ব্যবস্থার স্থিতিশীলতা ও স্বাভাবিক কার্যক্রম বজায় রাখতে ২০২৫ সালে বিভিন্ন ব্যবস্থার মাধ্যমে এই তারল্য সহায়তা দেওয়া হয়। প্রতিবেদনের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৩-২৪ অর্থবছরে কেন্দ্রীয় ব্যাংক রেকর্ড ৩০ লাখ ২৯ হাজার ৬৬৪ কোটি টাকা তারল্য সহায়তা দিয়েছিল, যা আগের অর্থবছরের তুলনায় ১৩১ শতাংশ বেশি। এর আগে ২০২২-২৩ অর্থবছরে এ সহায়তার পরিমাণ ছিল ১৩ লাখ ৮ হাজার ৭৭৯ কোটি টাকা।২০২৫ সালে দেওয়া মোট সহায়তার মধ্যে রেপো অপারেশন, নিশ্চিত তারল্য সহায়তা (এএলএস), ইসলামী ব্যাংক তারল্য সুবিধা (আইবিএলএফ) এবং বিশেষ তারল্য সহায়তা (এসএলএস) অন্তর্ভুক্ত ছিল। এর মধ্যে প্রচলিত ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলো নিয়মিত উপকরণের মাধ্যমে পেয়েছে ১৯ লাখ ৭৫ হাজার কোটি টাকা। মোট সহায়তার ৫৯ দশমিক ১১ শতাংশ রেপোর মাধ্যমে এবং ৩৬ দশমিক ৬৭ শতাংশ এএলএসের মাধ্যমে বিতরণ করা হয়েছে। স্ট্যান্ডিং লিকুইডিটি ফ্যাসিলিটি (এসএলএফ)-এর অংশ ছিল মাত্র ৪ দশমিক ২২ শতাংশ।প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, একই সময়ে ব্যাংকগুলো স্থায়ী আমানত সুবিধা (এসডিএফ) হিসেবে বাংলাদেশ ব্যাংকে ৫ লাখ ১১ হাজার কোটি টাকা জমা দিয়েছে।মিউচুয়াল ট্রাস্ট ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক সৈয়দ মাহবুবুর রহমান বলেন, দুর্বল আন্তঃব্যাংক বাজারের কারণে ব্যাংকগুলো কেন্দ্রীয় ব্যাংকের সহায়তার ওপর নির্ভরশীল হয়ে পড়েছে। তার ভাষায়, আন্তঃব্যাংক বাজার শক্তিশালী না হওয়ায় ট্রেজারি বিল ও বন্ডের বিপরীতে রেপো সুবিধা নিতে হচ্ছে। তবে এসব অর্থ স্বল্প সময়ের মধ্যেই ফেরত দেওয়া হয়।বিশেষজ্ঞদের মতে, স্বল্পমেয়াদে আর্থিক স্থিতিশীলতা বজায় রাখতে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের এই সহায়তা কার্যকর হলেও দীর্ঘমেয়াদে এটি টেকসই সমাধান নয়। বরং দীর্ঘদিন এমন সহায়তা চলতে থাকলে ব্যাংকগুলোর মধ্যে দায়হীনতা বা ‘মোরাল হ্যাজার্ড’-এর প্রবণতা তৈরি হতে পারে।প্রতিবেদন অনুযায়ী, ইসলামী ব্যাংকিং খাতে পরিস্থিতি সবচেয়ে উদ্বেগজনক। ২০২৫ সালে ইসলামী ব্যাংকগুলো আইবিএলএফ, মুদারাবাহ লিকুইডিটি সাপোর্ট (এমএলএস) এবং বিশেষ তারল্য সহায়তার মাধ্যমে মোট ১ লাখ ৭৪ হাজার কোটি টাকা সহায়তা পেয়েছে। এর মধ্যে আইবিএলএফের অংশ ছিল প্রায় ৯০ শতাংশ। এছাড়া ১১টি ব্যাংক জরুরি তারল্য সহায়তা (ইএলএ) হিসেবে পেয়েছে ১৮ হাজার ৩৩৩ কোটি টাকা।বাংলাদেশ ব্যাংকের প্রতিবেদনে আরও বলা হয়েছে, ব্যাংকখাতে মূলধন সংকট ভয়াবহ আকার ধারণ করেছে। ২০২৫ সালে ক্যাপিটাল টু রিস্ক-ওয়েটেড অ্যাসেটস রেশিও (সিআরএআর) ২০২৪ সালের ৩ দশমিক ০৮ শতাংশ থেকে কমে ঋণাত্মক ২ দশমিক ৬৪ শতাংশে নেমে এসেছে। মূলধন সংরক্ষণ বাফারও শূন্যে পৌঁছেছে। রাষ্ট্রায়ত্ত, বিশেষায়িত এবং কয়েকটি বেসরকারি ও ইসলামী ব্যাংক এই সংকটের জন্য সবচেয়ে বেশি দায়ী বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।ইসলামী ব্যাংকগুলোর সম্মিলিত সিআরএআর নেমে দাঁড়িয়েছে ঋণাত্মক ৪৩ দশমিক ১৮ শতাংশে। একই সময়ে এসব ব্যাংকের খেলাপি ঋণ বেড়েছে ৫৬ দশমিক ১৫ শতাংশ। অনেক ব্যাংক বাধ্যতামূলক তারল্য সূচক বজায় রাখতেও ব্যর্থ হয়েছে। কেন্দ্রীয় ব্যাংক সতর্ক করে বলেছে, ইসলামী ব্যাংকিং খাতের সংকট পুরো আর্থিক ব্যবস্থার জন্য ঝুঁকি তৈরি করতে পারে।বাংলাদেশের ব্যাংকখাতের সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হিসেবে খেলাপি ঋণকেই চিহ্নিত করেছে কেন্দ্রীয় ব্যাংক। স্ট্রেস টেস্টে দেখা গেছে, খেলাপি ঋণ আরও বাড়লে মূলধন পরিস্থিতির আরও অবনতি ঘটবে। বড় ঋণগ্রহীতাদের ঋণ খেলাপিতে পরিণত হওয়ার ঝুঁকিও অত্যন্ত বেশি বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।ব্যাংকের বাইরের আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলোর অবস্থাও উদ্বেগজনক। ২০২৫ সালের শেষে এ খাতের খেলাপি ঋণের হার দাঁড়িয়েছে ৩৩ দশমিক ৩২ শতাংশ এবং মূলধন পর্যাপ্ততার হার নেমে এসেছে ঋণাত্মক ২৩ দশমিক ১৯ শতাংশে। একই সঙ্গে আমানত কমেছে ৭ দশমিক ০৩ শতাংশ।তবে নেতিবাচক পরিস্থিতির মধ্যেও কিছু ইতিবাচক দিক তুলে ধরা হয়েছে প্রতিবেদনে। রেমিট্যান্স প্রবাহ বৃদ্ধি, রপ্তানি আয়ের স্থিতিশীলতা এবং আমদানি ব্যয় নিয়ন্ত্রণে থাকায় চলতি হিসাবের ভারসাম্যে উন্নতি হয়েছে। ২০২৫ সালের শেষে দেশের বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ দাঁড়িয়েছে ৩৩ দশমিক ১৯ বিলিয়ন ডলার, যদিও আইএমএফের বিএপিএম-৬ পদ্ধতিতে তা ২৮ দশমিক ৫৯ বিলিয়ন ডলার।[BANGVIEWS-POST:525]এছাড়া ডিজিটাল আর্থিক সেবায় উল্লেখযোগ্য অগ্রগতির কথাও জানিয়েছে বাংলাদেশ ব্যাংক। এনপিএসবি, বিইএফটিএন, ইন্টারনেট ব্যাংকিং, পেমেন্ট কার্ড, বিডি-আরটিজিএস, এজেন্ট ব্যাংকিং, বাংলা কিউআর এবং টাকা-পে ব্যবস্থার ব্যবহার বেড়েছে। বাংলাদেশ ব্যাংকের ভাষ্য, দেশের আর্থিক ব্যবস্থা এখনও স্থিতিশীল থাকলেও বিদ্যমান ঝুঁকিগুলো উপেক্ষা করার সুযোগ নেই। বিশেষজ্ঞদের মতে, খেলাপি ঋণ আদায়ে কঠোর পদক্ষেপ, দুর্বল ব্যাংকের পুনর্গঠন, সুশাসন নিশ্চিত করা, মূলধন ঘাটতি পূরণ এবং নিয়ন্ত্রক তদারকি জোরদার করাই এখন সবচেয়ে জরুরি কাজ।

ব্যাংক খাতে রেকর্ড সহায়তা কেন্দ্রীয় ব্যাংকের