ঢাকা    শুক্রবার, ০৬ নভেম্বর ২০২৬, ২২ কার্তিক ১৪৩৩ ২৫ জমাদিউল আউয়াল ১৪৪৮ হিজরি
বাংলাদেশ সময়
বাংলা ভিউজ

সাবেক ২ অতিরিক্ত আইজিপি ও আ.লীগ নেতার ভয়ংকর চক্রান্ত ফাঁস

রাজধানীর মিরপুরে তৈরি পোশাক শ্রমিকদের ন্যায্য আন্দোলনের সুযোগ নিয়ে পুরো পোশাক খাতকে অস্থিতিশীল ও ধ্বংস করার এক গভীর ষড়যন্ত্রের রূপরেখা উন্মোচন করেছে ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা পুলিশ (ডিবি)। ডিবির দাবি, এই নৈরাজ্য কোনো সাধারণ শ্রমিক বিক্ষোভ ছিল না; এর নেপথ্যে বিজিএমইএ’র সাবেক সভাপতি ও আওয়ামী লীগ নেতা এস এম মান্নান কচি, সাবেক সংসদ সদস্য ইলিয়াস মোল্লা এবং পুলিশের সাবেক দুই অতিরিক্ত আইজিপিসহ একটি প্রভাবশালী রাজনৈতিক চক্রের প্রত্যক্ষ ইন্ধন, পরিকল্পনা ও বিপুল অর্থায়ন ছিল।গত ৩ নভেম্বর মিরপুরের কালশী-পূরবী মোড়ে ‘শিহা ডিজাইন বাংলাদেশ লিমিটেড’ কারখানার সামনে ডিএমপির কনস্টেবল সালমানের ওপর নৃশংস হামলা এবং ব্যাপক ভাঙচুর-সহিংসতায় জড়িত অভিযোগে গ্রেপ্তার হওয়া মোট ১৯ আসামির স্বীকারোক্তি ও তথ্যের ভিত্তিতে এই ষড়যন্ত্রের বিস্তারিত বের হয়ে আসে। পুলিশ ও গোয়েন্দা সূত্রে জানা যায়, সিসিটিভি ফুটেজ বিশ্লেষণ এবং গ্রেপ্তার ব্যক্তিদের ব্যবহৃত ১৬টি গোপন এনক্রিপ্টেড হোয়াটসঅ্যাপ ও মেসেঞ্জার গ্রুপের অডিও বার্তা ফরেনসিক পরীক্ষার মাধ্যমে এই অশুভ আঁতাতের প্রমাণ নিশ্চিত হওয়া গেছে।ডিবির তদন্তে উঠে আসে, কালশীর ‘শিহা ডিজাইন বাংলাদেশ লিমিটেড’ কারখানাটি ২০২৪ সালের ৫ আগস্টের পটপরিবর্তনের পূর্বে ঢাকা মহানগর উত্তর আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক এস এম মান্নান কচির প্রত্যক্ষ মালিকানায় পরিচালিত হতো। পরে তিনি কাগজে-কলমে মালিকানা পরিবর্তন করলেও কারখানাটির নিয়ন্ত্রণ ধরে রাখে পাঁচ সদস্যের একটি গোপন সিন্ডিকেট। এই সিন্ডিকেটের মধ্যে রয়েছেন বাংলাদেশ পুলিশের সাবেক দুই অতিরিক্ত আইজিপি আতিকুল ইসলাম ও আবু হাসান মুহম্মদ তারিক। এছাড়াও রয়েছেন আতিকুল ইসলামের শ্যালক নুরুল ইসলাম, শফিকুল ইসলাম ও মুশতাক আহমেদ।ডিএমপির অতিরিক্ত কমিশনার ও ডিবিপ্রধান শফিকুল ইসলাম যুগান্তরকে জানান, আওয়ামী লীগ নেতা কচি, সাবেক সংসদ সদস্য ইলিয়াস মোল্লা, তাঁর ভাগিনা আলিফ মোল্লা ও জুয়েল মোল্লা, সাবেক দুই অতিরিক্ত আইজিপি, মহানগর উত্তর আওয়ামী লীগের ১০ নম্বর ওয়ার্ডের প্রচার সম্পাদক আক্তার রনি এবং সাবেক এক ওয়ার্ড কাউন্সিলর পোশাক আন্দোলনের আড়ালে অর্থ সরবরাহ ও কর্মীদের দিকনির্দেশনা দিয়ে আসছিলেন। দেশের রপ্তানিমুখী পোশাক খাতকে ধ্বংসের মুখে ঠেলে দিতে সাধারণ শ্রমিকদের মূলত ঢাল হিসেবে ব্যবহার করা হয়েছিল। তিনি নিশ্চিত করেন, মাঠপর্যায়ের নাশকতাকারীদের জবানবন্দির ভিত্তিতে পর্দার আড়ালে থাকা শীর্ষ পরিকল্পনাকারী ও অর্থদাতাদের আইনের আওতায় আনতে সাঁড়াশি অভিযান চলছে।তদন্তসংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা জানান, আসামিদের মোবাইল জব্দ করে ‘চেতনা মুক্তিযুদ্ধ’, ‘শেখ হাসিনা রিজার্ভ ফোর্স’, ‘ঢাকা জেলা গেরিলা ৭১’, ‘হাসু আপার বাংলা’, ‘শেখ হাসিনার প্রত্যাবর্তন’ ও ‘বঙ্গবন্ধুর আদর্শ গেরিলা’ নামের অন্তত ১৬টি গোপন চ্যাট গ্রুপের সন্ধান পাওয়া গেছে। আলামত মুছতে অনেক বার্তা মুছে ফেলা হলেও ডিবির ফরেনসিক ল্যাব বিপুল পরিমাণ অডিও নির্দেশ ও নাশকতার ছবি পুনরুদ্ধার করেছে। এসব গ্রুপে নির্দেশ দেওয়া হতো—আন্দোলনের ছবি ও গাড়িতে আগুন দেওয়ার ভিডিও ধারণ করে পাঠাতে হবে। ১ নভেম্বর পল্লবীতে পুলিশের গাড়িতে আগুন দিয়ে সেই ভিডিও নেতাদের কাছে পাঠান কক্সবাজারের যুবলীগ নেতা মুয়াজ্জেম শাহরিয়ার নেওয়াজ। প্রমাণ মিললেই ইলিয়াস মোল্লার ভাগিনা আলিফ মোল্লা ও জুয়েল মোল্লা ডিজিটাল মাধ্যমে অর্থ পাঠাতেন।তদন্তে আরও উঠে আসে, রাজধানী ও গাজীপুরের পোশাকশিল্পে অস্থিরতা তৈরি করতে পঞ্চগড়, কক্সবাজার ও নোয়াখালীসহ দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে রাজনৈতিক ক্যাডার এনে ঢাকায় জড়ো করা হয়েছিল। যেমন পঞ্চগড় কলেজ ছাত্রলীগের নেতা নাহিদ হাসান সরাসরি মাঠে সক্রিয় ছিলেন। অন্যদিকে, আওয়ামী লীগ নেতা আক্তার রনি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ভুয়া গুজব ছড়ান যে ‘গাজীপুরে দুজন পোশাক শ্রমিকের লাশ পাওয়া গেছে’। এই বানোয়াট তথ্যের জেরেই হাজার হাজার নিরীহ শ্রমিক ক্ষোভে ফেটে পড়ে রাস্তায় নেমেছিলেন।গত ৩ নভেম্বর কালশী মোড়ে ডিএমপি কনস্টেবল সালমানকে ঘিরে ধরে নৃশংসভাবে পেটানোর ঘটনায় ৪-৫টি ভিন্ন অ্যাঙ্গেলের সিসিটিভি ফুটেজ পরীক্ষা করে সরাসরি হামলায় জড়িত ৮ জনকে গ্রেপ্তার করে ডিবি। তাঁরা হলেন—আশিক জুলহাস, আরাফাত ইসলাম জিসান, মো. রশিদ আলী, সোহেল রানা, মিলন বাবু, আনারুল ইসলাম, মো. রানা ও মনছুর আলী। এর আগে ১ নভেম্বর গ্রেপ্তার হওয়া আওয়ামী লীগ ও সহযোগী সংগঠনের অপর ১১ নেতাকর্মীকে তিন দিনের রিমান্ড শেষে কারাগারে পাঠানো হয়েছে। তাদের সবার ডিজিটাল ডিভাইস ও আর্থিক লেনদেনের নেটওয়ার্কে শীর্ষ নেতাদের সংশ্লিষ্টতা প্রমাণিত হয়েছে।

সাবেক ২ অতিরিক্ত আইজিপি ও আ.লীগ নেতার ভয়ংকর চক্রান্ত ফাঁস