ককপিটে ক্যাপ্টেনকে কু'পিয়ে বিমান নিয়ন্ত্রণের চেষ্টা, তদন্তে চাঞ্চল্যকর তথ্য
ইসরাইলগামী একটি যাত্রীবাহী উড়োজাহাজ ইচ্ছাকৃতভাবে বিধ্বস্ত করার চেষ্টা করেছিলেন ফ্লাইদুবাইয়ের সহকারী পাইলট হামাম আল-হামামি। সৌদি আরবে বিমানটির জরুরি অবতরণের পর জিজ্ঞাসাবাদে তিনি তদন্তকারীদের কাছে এমন তথ্য দিয়েছেন বলে জানিয়েছে মার্কিন সংবাদমাধ্যম ওয়াল স্ট্রিট জার্নাল।প্রতিবেদন অনুযায়ী, ২৯ বছর বয়সী ওমানি নাগরিক হামামি জিজ্ঞাসাবাদের সময় দাবি করেন, তিনি ইচ্ছা করেই বিমানটি বিধ্বস্ত করতে চেয়েছিলেন। একই সঙ্গে তিনি মৃত্যুকে ভয় পান না বলেও জানিয়েছেন বলে তদন্তের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট সূত্রের বরাতে সংবাদমাধ্যমটি জানিয়েছে।এ ঘটনায় এখন তদন্তকারীরা হামামির অতীত, তার উগ্রবাদী চিন্তাধারার সঙ্গে সংশ্লিষ্টতার সম্ভাবনা এবং পূর্বে কর্তৃপক্ষের নজরে আসার পরও কীভাবে তিনি আবার উড়োজাহাজের ককপিটে কাজ করার সুযোগ পেলেন—এসব বিষয় খতিয়ে দেখছেন।ওয়াল স্ট্রিট জার্নালের তথ্য অনুযায়ী, হামামির ক্যারিয়ারের শুরু হয়েছিল ওমানের রাষ্ট্রীয় মালিকানাধীন বিমান সংস্থা ওমান এয়ারে। সেখানে কাজ করার সময় কর্তৃপক্ষ জানতে পারে, তিনি উগ্রবাদী বিভিন্ন ওয়েবসাইটে প্রবেশ করতেন। বিষয়টি জানার পর তাকে উড়োজাহাজ পরিচালনার দায়িত্ব থেকে সরিয়ে দেওয়া হয়।পরে হামামিকে একটি ডির্যাডিকালাইজেশন বা উগ্রবাদমুক্তকরণ কর্মসূচির আওতায় নেওয়া হয়। একই সঙ্গে তাকে পাইলট হিসেবে দায়িত্ব না দিয়ে ডেস্কের কাজে রাখা হয়েছিল। এরপর ওমান এয়ারের চাকরি ছেড়ে হামামি সংযুক্ত আরব আমিরাতে কাজ শুরু করেন। শেষ পর্যন্ত ২০২৬ সালের ফেব্রুয়ারিতে তিনি ফ্লাইদুবাইয়ে নিয়োগ পান।তবে হামামির আগের কর্মকাণ্ড সম্পর্কে ফ্লাইদুবাই কর্তৃপক্ষ কতটা জানত এবং তাকে নিয়োগ দেওয়ার আগে ওমানের কাছ থেকে তার বিষয়ে কোনো তথ্য চাওয়া হয়েছিল কি না, তা এখনো স্পষ্ট নয়। ওয়াল স্ট্রিট জার্নালের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, হামামির বিষয়ে যাচাই বা তথ্য সংগ্রহের জন্য অন্য কোনো দেশ ওমানের কাছে অনুরোধ করেছিল—এমন কোনো অনুরোধ ওমানের কাছে পৌঁছেনি।এদিকে হামামি সিরিয়ায় যে সময় কাটিয়েছেন, সেটিও তদন্তের আওতায় এসেছে। তদন্ত সম্পর্কে অবগত ব্যক্তিদের বরাতে ওয়াল স্ট্রিট জার্নাল জানিয়েছে, সিরিয়ায় অবস্থানের সময় হামামি উগ্রবাদী কোনো গোষ্ঠী বা মতাদর্শের সঙ্গে যুক্ত হয়েছিলেন কি না, তা খতিয়ে দেখা হচ্ছে। ওই সময়ে সিরিয়ায় বিদ্রোহীরা তৎকালীন প্রেসিডেন্ট বাশার আল-আসাদের সরকারের বিরুদ্ধে লড়াই করছিল।তদন্তকারীরা হামামির পুরোনো সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের কার্যক্রমও পরীক্ষা করছেন। তার মুছে ফেলা এক্স—যা আগে টুইটার নামে পরিচিত ছিল—অ্যাকাউন্টের ৩ হাজারের বেশি স্ক্রিনশট ইন্টারনেট আর্কাইভে সংরক্ষিত রয়েছে। এসব পুরোনো কর্মকাণ্ড তার মানসিকতা ও সম্ভাব্য উগ্রবাদী সংশ্লিষ্টতার বিষয়ে তদন্তকারীদের কাছে গুরুত্বপূর্ণ তথ্য দিতে পারে বলে মনে করা হচ্ছে।ঘটনাটি ঘটে গত ৩০ সেপ্টেম্বর ফ্লাইদুবাইয়ের ফ্লাইট ১০৭৩-এ। ইসরাইলের উদ্দেশে যাত্রা করা ওই উড়োজাহাজের ককপিটে হামামি ক্যাপ্টেন স্মিত মাচ্ছারের ওপর হামলা করেন বলে তদন্তসংশ্লিষ্ট তথ্যের বরাতে জানিয়েছে ওয়াল স্ট্রিট জার্নাল। তিনি ককপিটে থাকা ক্র্যাশ অ্যাক্স ব্যবহার করে ক্যাপ্টেনকে আঘাত করেন এবং পরে উড়োজাহাজটির নিয়ন্ত্রণ নেওয়ার চেষ্টা করেন।হামলার পর পরিস্থিতি দ্রুত ভয়াবহ আকার নেয়। মাত্র প্রায় ৩০ সেকেন্ডের মধ্যে বিমানটি ১৬ হাজার ফুটেরও বেশি নিচে নেমে যায়। গুরুতর আহত হওয়ার পরও ক্যাপ্টেন কোনোভাবে ককপিটের দরজা খুলতে সক্ষম হন। এরপর যাত্রী ও ক্রু সদস্যরা মিলে হামামিকে নিয়ন্ত্রণে আনার চেষ্টা করেন। বিমানে থাকা দায়িত্বে না থাকা দুজন পাইলটও পরিস্থিতি সামাল দিতে সহযোগিতা করেন।পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আসার পর উড়োজাহাজটি সৌদি আরবে জরুরি অবতরণ করে। সেখানে হামামিকে জিজ্ঞাসাবাদ করা হয়। তার জিজ্ঞাসাবাদ সম্পর্কে অবগত এক সৌদি কর্মকর্তার বরাত দিয়ে ওয়াল স্ট্রিট জার্নাল জানিয়েছে, হামামি তদন্তকারীদের কাছে স্বীকার করেন যে তিনি ইচ্ছাকৃতভাবে উড়োজাহাজটি বিধ্বস্ত করতে চেয়েছিলেন। জিজ্ঞাসাবাদের সময় তিনি মৃত্যুকে ভয় পান না বলেও জানিয়েছিলেন বলে ওই কর্মকর্তা দাবি করেন।ঘটনার পর হামামির উদ্দেশ্য ও সম্ভাব্য সহযোগীদের বিষয়ে তদন্ত আরও বিস্তৃত করা হয়েছে। সংযুক্ত আরব আমিরাত, সৌদি আরব ও ইসরাইলের তদন্তকারীরা এখন খতিয়ে দেখছেন, হামামি একাই এই ঘটনার পরিকল্পনা ও বাস্তবায়নের চেষ্টা করেছিলেন কি না, নাকি এর পেছনে কোনো বাইরের গোষ্ঠী বা ব্যক্তির যোগাযোগ ছিল।সূত্র: ওয়াল স্ট্রিট জার্নাল