সৌদিতে নির্যাতন সহ্য করতে না পেরে ফিরছেন নারী কর্মীরা
মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলোতে শারীরিক, মানসিক ও যৌন নিপীড়নসহ নানা বৈষম্যের শিকার হয়ে চলতি বছরের প্রথম নয় মাসে (জানুয়ারি থেকে সেপ্টেম্বর) দেশে ফিরে এসেছেন ১ হাজার ৬৮৭ জন নারী শ্রমিক। এই কর্মীদের অর্ধেকেরও বেশি, অর্থাৎ প্রায় ৫৯ শতাংশ (৯৭৯ জন) ফিরেছেন কেবল সৌদি আরব থেকে। একই সময়ে পবিত্র মক্কায় বাংলাদেশ সরকারকে কোনো প্রকার পূর্বাবগতি না দিয়ে দুই বাংলাদেশির মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের ঘটনায় মধ্যপ্রাচ্যে প্রবাসী শ্রমিকদের সামগ্রিক নিরাপত্তা, কূটনৈতিক নজরদারি এবং সরকারের তদারকির কার্যকারিতা নিয়ে নতুন করে তীব্র বিতর্ক ও ক্ষোভ দেখা দিয়েছে।বিমানবন্দরের প্রবাসী কল্যাণ ডেস্কের আউটপাসসংক্রান্ত হালনাগাদ প্রতিবেদন অনুযায়ী, চলতি বছর ফেরত আসা নারীদের মধ্যে সৌদি আরব ছাড়া জর্ডান থেকে ২২৭ জন, সংযুক্ত আরব আমিরাত থেকে ৭৮ জন, ভারত থেকে ৫২ জন এবং মালয়েশিয়া থেকে ৪৮ জন নারী দেশে ফিরেছেন। মাসভিত্তিক হিসাবে জুলাইয়ে সর্বোচ্চ ৩৩১ জন এবং আগস্টে ৩০৯ জন নারী নিঃস্ব হয়ে ফিরে আসেন। সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের তথ্যমতে, প্রবাসে প্রতিশ্রুতি অনুযায়ী কাজ ও পারিশ্রমিক না পাওয়া, অতিরিক্ত কাজের চাপে অসুস্থতা, চরম শারীরিক ও মানসিক নির্যাতন এবং যৌন সহিংসতার শিকার হয়ে অনেক কর্মী গর্ভবতী অবস্থায় দেশে ফিরতে বাধ্য হচ্ছেন। এমনকি প্রতি বছর দেশে ফেরা শতাধিক নারী কর্মীর কফিনের মৃত্যুসনদে ‘স্বাভাবিক মৃত্যু’ বা ‘আত্মহত্যা’র মতো কারণ লেখা থাকে। অভিবাসী কর্মী উন্নয়ন প্রোগ্রাম (ওকাপ)-এর গবেষণায় দেখা গেছে, ফেরত আসা নারী কর্মীদের ৯৪ শতাংশই নিয়মিত নির্যাতনের শিকার হয়েছেন এবং ৪৭ শতাংশ মুখোমুখি হয়েছেন যৌন নিপীড়নের।এদিকে সৌদি আরবের মক্কায় অনৈতিক কাজের অভিযোগে নজরুল ইসলাম আবদুল বাসির ও সিতি আক্তার নামের দুই বাংলাদেশি নাগরিকের মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের ঘটনায় কূটনৈতিক অঙ্গনে চরম অস্বস্তি তৈরি হয়েছে। সৌদি কর্তৃপক্ষ এ বিষয়ে ঢাকাকে আগে কিছু না জানানোয় তীব্র সমালোচনা শুরু হয়। পরিস্থিতি স্বাভাবিক করতে এবং ব্যাখ্যা চেয়ে রোববার (১৮ অক্টোবর) ঢাকায় নিযুক্ত সৌদি রাষ্ট্রদূত আবদুল্লাহ বিন জাফর এইচ বিন আবিয়াকে রাষ্ট্রীয় অতিথি ভবন পদ্মায় ডেকে আনুষ্ঠানিক নোট ভার্বাল হস্তান্তর করেছে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়।বিশেষজ্ঞরা বলছেন, দেশের মোট বৈদেশিক শ্রমবাজারের দুই-তৃতীয়াংশ এখনও এককভাবে সৌদি আরব এবং মধ্যপ্রাচ্যকেন্দ্রিক। জনশক্তি কর্মসংস্থান ও প্রশিক্ষণ ব্যুরোর (বিএমইটি) তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫ সালে বিদেশে যাওয়া ১১ লাখ ৩২ হাজারের বেশি কর্মীর মধ্যে ৭ লাখ ৫৫ হাজারই গেছেন সৌদি আরবে। চলতি বছরেও ছাড়পত্রপ্রাপ্তদের অর্ধেকের বেশি গেছেন দেশটিতে। তবে দক্ষ কর্মীর বদলে বিপুল পরিমাণ অদক্ষ গৃহকর্মী পাঠানোর কারণেই এই সংকট বাড়ছে। অভিবাসন বিশেষজ্ঞ আসিফ মুনীর জানান, সৌদি আরবের ব্যক্তি মালিকানাধীন বাসাবাড়িতে সামন্ততান্ত্রিক মানসিকতায় কাজ করতে গিয়ে নারী কর্মীরা ২৪ ঘণ্টা গৃহবন্দি থাকেন। ফলে গৃহকর্মে নির্ভরশীলতা কমিয়ে জর্ডানের মতো পোশাক শিল্প, নির্মাণ বা অন্যান্য কারিগরি খাতে প্রশিক্ষিত নারী কর্মী পাঠানো এবং ফিলিপাইন বা আফ্রিকার দেশের মতো ডরমিটরিতে বসবাসের দ্বিপক্ষীয় চুক্তি ছাড়া এই নারকীয় নিপীড়ন বন্ধ করা সম্ভব নয়।