দাঙ্গা-লুটপাটের মধ্যেও স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর ওপর আস্থা ফরাসি প্রধানমন্ত্রীর
ফ্রান্সে সপ্তাহান্তের দাঙ্গা ও লুটপাটের পর পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে স্থানীয় মেয়রদের প্রয়োজন অনুযায়ী কারফিউ জারির ক্ষমতা দেওয়ার ঘোষণা দিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী সেবাস্তিয়াঁ লেকর্নু। একই সঙ্গে সহিংসতায় ক্ষতিগ্রস্ত ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান ও সাধারণ মানুষের জন্য আর্থিক সহায়তা এবং ক্ষতিপূরণের উদ্যোগ নেওয়ার কথা জানিয়েছেন তিনি।দেশটির বিভিন্ন এলাকায় চলমান অস্থিরতার মধ্যে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী লরাঁ নুনেজের ওপর নিজের আস্থার কথাও পুনর্ব্যক্ত করেছেন ফরাসি প্রধানমন্ত্রী।রোববার সন্ধ্যায় নুনেজ পদত্যাগের প্রস্তাব দিলেও তিনি দায়িত্ব পালন অব্যাহত রেখেছেন বলে জানান লেকর্নু। প্রধানমন্ত্রীর বক্তব্য অনুযায়ী, স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর ওপর তাঁর আস্থা না থাকলে নুনেজ এখনো তাঁর পাশে দায়িত্ব পালন করতেন না।পরিস্থিতি মোকাবিলায় সরকারের ঐক্যবদ্ধ অবস্থানের ওপর গুরুত্ব দিয়ে লেকর্নু বলেন, ‘আমাদের সবাইকে একসঙ্গে দৃঢ় ও শক্ত থাকতে হবে।’সপ্তাহান্তে ফ্রান্সজুড়ে ছড়িয়ে পড়া অস্থিতিশীলতার জন্য উগ্র বামপন্থী গোষ্ঠীগুলোকে দায়ী করেন প্রধানমন্ত্রী।তাঁর অভিযোগ, এসব গোষ্ঠী পরিকল্পিতভাবে দেশে বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি এবং পরিস্থিতি অস্থিতিশীল করার চেষ্টা করছে। আগামী বছরের প্রেসিডেন্ট নির্বাচন পর্যন্ত এ ধরনের তৎপরতা অব্যাহত থাকতে পারে বলেও আশঙ্কা প্রকাশ করেন তিনি।তবে সহিংসতার পেছনে উগ্র বামপন্থী গোষ্ঠীগুলোর সংশ্লিষ্টতার বিষয়ে স্বাধীনভাবে যাচাই করা কোনো প্রমাণ প্রদত্ত প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়নি।রাজনৈতিক সভা-সমাবেশে নিরাপত্তা জোরদারের ঘোষণা দিয়ে প্রধানমন্ত্রী বলেন, আগামী কয়েক সপ্তাহ ও মাসে গণতান্ত্রিক কার্যক্রম যাতে স্বাভাবিকভাবে চলতে পারে, সে জন্য সরকার প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করবে।আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ে কঠোর অবস্থান তুলে ধরে লেকর্নু বলেন, ‘আমরা সন্ত্রাসী, চোর ও গুন্ডাদের কাছে মাথা নত করব না।’সহিংসতা নিয়ন্ত্রণে স্থানীয় প্রশাসনের ক্ষমতা বাড়ানোর পাশাপাশি ক্ষতিগ্রস্ত এলাকাগুলো পুনরুদ্ধারে অর্থ বরাদ্দ দেওয়ার পরিকল্পনার কথাও জানান তিনি।প্রধানমন্ত্রী বলেন, দাঙ্গা ও লুটপাটে ক্ষতিগ্রস্ত স্থাপনা ও এলাকাগুলো পুনর্গঠনে সরকারি সহায়তা দেওয়া হবে। তবে সম্পত্তির ক্ষতির জন্য দায়ী ব্যক্তিদের কাছ থেকেও অর্থ আদায়ের ব্যবস্থা করতে চায় সরকার।এ বিষয়ে লেকর্নু বলেন, ‘সম্পত্তির ক্ষতিসাধনকারীদের কাছ থেকে ক্ষতিপূরণ আদায়ের উপায় নিশ্চিত করতে একটি আইন করা হবে।’সহিংসতার কারণে কর্মস্থলে যেতে না পারা ব্যক্তিদের জন্য আংশিক বেকারত্ব সহায়তা তহবিল চালুর ঘোষণাও দিয়েছেন ফরাসি প্রধানমন্ত্রী।একই সঙ্গে ক্ষতিগ্রস্তরা যাতে দ্রুত বিমার অর্থ পান, সে লক্ষ্যে বিমা কোম্পানিগুলোর সঙ্গে সরকারের আলোচনা চলছে বলে জানান তিনি।এদিকে দাঙ্গা ও লুটপাট মোকাবিলায় আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর ভূমিকা নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে।স্থানীয় মেয়ররা জানতে চাইছেন, সহিংসতা ছড়িয়ে পড়ার সময় পুলিশ কী ধরনের ব্যবস্থা নিয়েছিল এবং কীভাবে পরিস্থিতি এতটা অবনতির দিকে গেল।প্রধানমন্ত্রী নিজেও সহিংসতার সূত্রপাত ও বিস্তার সম্পর্কে বিস্তারিত জানার প্রয়োজনীয়তার কথা তুলে ধরেন।লেকর্নু বলেন, ‘কীভাবে এই বিশৃঙ্খলার সূত্রপাত হলো, কীভাবে ঘটনাগুলো ঘটল এবং কীভাবে আমাদের দেশে এই সহিংসতা ছড়িয়ে পড়ল—ফরাসি জনগণ তা জানতে চায়।’তিনি জানান, আগের রাতে প্যারিস ও মার্সেইয়ে তুলনামূলক বেশি বিশৃঙ্খলা দেখা গেছে।সপ্তাহান্তের দাঙ্গা ও লুটপাটের ঘটনায় গ্রেপ্তার ব্যক্তিদের প্রায় ৮০ শতাংশের বিরুদ্ধে ফৌজদারি অভিযোগ আনার প্রক্রিয়া চলছে বলেও জানান প্রধানমন্ত্রী।এর মধ্যে প্রধানমন্ত্রী সেবাস্তিয়াঁ লেকর্নু ও সরকারের বিভিন্ন মন্ত্রীর মধ্যে একটি বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়েছে।প্রদত্ত প্রতিবেদন অনুযায়ী, ওই বৈঠকে সহিংসতায় ক্ষতিগ্রস্ত ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানের ক্ষতিপূরণ, বিমা সহায়তা এবং নিরাপত্তাব্যবস্থা নিয়ে আলোচনা হয়ে থাকতে পারে। তবে বৈঠকের আলোচ্যসূচি সম্পর্কে নিশ্চিত তথ্য দেওয়া হয়নি।দাঙ্গা ও লুটপাটে ফ্রান্সের বহু দোকানদার বড় ধরনের আর্থিক ক্ষতির মুখে পড়েছেন। বিশেষ করে প্যারিসের ছোট মোবাইল ফোনের দোকানগুলোর অনেকগুলোই একক মালিকানাধীন ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান।এসব ব্যবসার ক্ষতি কাটিয়ে উঠতে সরকারি সহায়তার প্রয়োজন হতে পারে। ফলে ক্ষতিপূরণ ও পুনর্বাসন কার্যক্রমে সরকারের উল্লেখযোগ্য অর্থ ব্যয়ের সম্ভাবনা রয়েছে।পাশাপাশি সহিংসতা মোকাবিলায় পুলিশের কৌশল পরিবর্তন প্রয়োজন কি না এবং পর্যাপ্ত পুলিশ সদস্য মোতায়েন ছিল কি না, তা নিয়েও আলোচনা চলছে।রাজনৈতিক অঙ্গনেও চলমান অস্থিরতার প্রভাব পড়েছে।আগামী বছর ফ্রান্সে প্রেসিডেন্ট নির্বাচন হওয়ার কথা রয়েছে। এমন পরিস্থিতিতে প্রেসিডেন্ট ইমানুয়েল মাখোঁর রাজনৈতিক ভবিষ্যৎ নিয়েও অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের একাংশের মতে, কেন্দ্রীয় নেতৃত্বের দুর্বলতা ও ক্ষমতার শূন্যতার সুযোগ নিয়ে দাঙ্গাকারীরা পরিস্থিতি আরও জটিল করে তুলছে।তবে সহিংসতার রাজনৈতিক প্রভাব এবং এর পেছনে কারা জড়িত, সে বিষয়ে বিভিন্ন পক্ষের বক্তব্য ও অভিযোগের স্বাধীন যাচাই প্রয়োজন।সূত্র: এএফপি