ঢাকা    মঙ্গলবার, ২৯ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ১৪ আশ্বিন ১৪৩৩ ১৬ রবিউস সানি ১৪৪৮ হিজরি
বাংলাদেশ সময়
বাংলা ভিউজ

পে-স্কেলে পেনশন বাড়ছে দ্বিগুণ, স্বস্তির সঙ্গে থাকছে ক্রয়ক্ষমতার প্রশ্ন

সরকারি চাকরিজীবীদের দীর্ঘ প্রতীক্ষিত নতুন পে-স্কেল অনুমোদন পেয়েছে। নতুন বেতন কাঠামোর আওতায় কর্মকর্তা-কর্মচারীদের বেতন শতভাগের বেশি বাড়ার পাশাপাশি সরকারি পেনশনভোগীদের সুবিধাও বাড়ানো হচ্ছে। নতুন সিদ্ধান্ত অনুযায়ী, যাদের মাসিক নিট পেনশন ৯ হাজার টাকা বা তার কম, তাদের পেনশন বাড়বে ১০০ শতাংশ। আর ৪০ হাজার ১ টাকা বা তার বেশি নিট পেনশন পাওয়া ব্যক্তিদের ক্ষেত্রে বৃদ্ধির হার হবে ৫৫ শতাংশ।নতুন প্রজ্ঞাপন অনুযায়ী, ৩০ জুন ২০২৬ তারিখে যে নিট পেনশন পাওয়া যাচ্ছিল, সেটিকে ভিত্তি ধরে ১ জুলাই ২০২৬ থেকে নতুন পেনশন নির্ধারণ করা হবে। বর্ধিত সুবিধাও ধাপে ধাপে কার্যকর করার সিদ্ধান্ত হয়েছে এবং ১ জুলাই ২০২৬ থেকে প্রাপ্য বকেয়া সুবিধা দেওয়ার কথা রয়েছে।সরকারের হিসাবে, নতুন পে-স্কেলের আওতায় প্রায় সোয়া ৯ লাখ অবসরপ্রাপ্ত কর্মচারী ও অন্যান্য যোগ্য সুবিধাভোগী উপকৃত হবেন। পুরো বেতন কাঠামো বাস্তবায়নে সরকারের অতিরিক্ত বার্ষিক ব্যয় হবে আনুমানিক ১ লাখ ৫ হাজার ৫৮০ কোটি টাকা।নতুন পেনশন কাঠামোতে পাঁচটি স্ল্যাব রাখা হয়েছে। ৯ হাজার টাকা বা তার কম নিট পেনশন পাওয়া ব্যক্তিদের ক্ষেত্রে বৃদ্ধি হবে ১০০ শতাংশ। ৯ হাজার ১ টাকা থেকে ২০ হাজার টাকা পর্যন্ত পেনশন পাওয়া ব্যক্তিদের ক্ষেত্রে বৃদ্ধি হবে ৭৫ শতাংশ। ২০ হাজার ১ টাকা থেকে ৩০ হাজার টাকা পর্যন্ত পেনশনে ৬৫ শতাংশ, ৩০ হাজার ১ টাকা থেকে ৪০ হাজার টাকা পর্যন্ত ৬০ শতাংশ এবং ৪০ হাজার ১ টাকা বা তার বেশি নিট পেনশন পাওয়া ব্যক্তিদের ক্ষেত্রে ৫৫ শতাংশ হারে বৃদ্ধি হবে।শতাংশের হিসাবে সবচেয়ে বেশি সুবিধা পাবেন কম পেনশন পাওয়া ব্যক্তিরা। সরকারের ভাষ্য, এর মাধ্যমে দীর্ঘদিন আগে অবসরে যাওয়া এবং তুলনামূলক কম পেনশন পাওয়া ব্যক্তিদের জীবনযাত্রার মান ও বার্ধক্যের আর্থিক নিরাপত্তাকে অগ্রাধিকার দেওয়া হয়েছে।পে-স্কেল অনুমোদনের পর মন্ত্রিপরিষদ সচিব নাসিমুল গনি বলেন, সরকার নির্বাচনি অঙ্গীকার অনুযায়ী ‘এক গ্রেড এক পেনশন’ বা ‘ওয়ান র‍্যাংক ওয়ান পেনশন’ ব্যবস্থা চালু করতে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ। তবে এখনই পুরোপুরি এ ব্যবস্থা বাস্তবায়ন করতে গেলে বড় অঙ্কের অর্থের প্রয়োজন হবে। পাশাপাশি ২০১৯ সালের আগে অবসরে যাওয়া অসামরিক কর্মচারীদের অনেকের তথ্য সরকারের কাছে না থাকায় এ মুহূর্তে পুরো ব্যবস্থা চালু করা সম্ভব হচ্ছে না। তাই ২০৩০ সালের মধ্যে ধাপে ধাপে এটি বাস্তবায়নের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।অর্থাৎ বর্তমান পে-স্কেলে পেনশনভোগীদের জন্য তাৎক্ষণিক ব্যবস্থা হিসেবে স্ল্যাবভিত্তিক নিট পেনশন বাড়ানো হয়েছে। আর দীর্ঘমেয়াদি কাঠামোগত পরিবর্তন হিসেবে রাখা হয়েছে ‘এক গ্রেড এক পেনশন’ ব্যবস্থা চালুর পরিকল্পনা।নতুন পে-স্কেল নিয়ে পেনশনভোগীদের জন্য বড় প্রশ্ন হলো, বাড়তি এই অর্থে বর্তমান জীবনযাত্রার ব্যয় কতটা সামাল দেওয়া যাবে। অবসরপ্রাপ্ত সরকারি কর্মচারীদের ক্ষেত্রে নিয়মিত আয়ের প্রধান উৎস সাধারণত পেনশন। কর্মজীবনের মতো বার্ষিক ইনক্রিমেন্ট বা পদোন্নতির মাধ্যমে আয় বাড়ার সুযোগ থাকে না। আবার বয়স বাড়ার সঙ্গে চিকিৎসা, ওষুধ ও পরীক্ষা-নিরীক্ষার ব্যয়ও বাড়ে। ফলে পেনশন বৃদ্ধির ক্ষেত্রে শুধু নামমাত্র অঙ্ক নয়, সেই অর্থের প্রকৃত ক্রয়ক্ষমতাও গুরুত্বপূর্ণ।নতুন পে-স্কেল নিয়ে অনলাইন আলোচনাতেও এ বিষয়টি উঠে এসেছে। কম পেনশন পাওয়া ব্যক্তিদের জন্য ৭৫ থেকে ১০০ শতাংশ পর্যন্ত বৃদ্ধি অনেকের কাছে স্বস্তির খবর হলেও উচ্চ বাজারদর ও চিকিৎসা ব্যয়ের সঙ্গে তাল মিলিয়ে এই সুবিধা কতটা কার্যকর হবে, সে প্রশ্ন তুলেছেন পেনশনভোগীদের অনেকে।অর্থনীতিবিদদের আলোচনাতেও পে-স্কেলের ব্যয়ভার নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের (সিপিডি) ফেলো ফাহমিদা খাতুন নতুন পে-স্কেল প্রসঙ্গে বলেন, প্রায় ১১ থেকে ১২ বছর সরকারি কর্মচারীদের বেতন কাঠামো সমন্বয় না হওয়া এবং দীর্ঘদিনের মূল্যস্ফীতির কারণে বিশেষ করে নিম্ন ও মধ্যম গ্রেডের কর্মচারীদের বেতন বাড়ানোর যৌক্তিকতা রয়েছে। তবে তাঁর উদ্বেগের জায়গা হলো এই বাড়তি ব্যয়ের অর্থের উৎস।ফাহমিদা খাতুন বলেন, নতুন বেতন কাঠামো পুরোপুরি বাস্তবায়নে প্রায় ১ লাখ ৬ হাজার কোটি টাকা প্রয়োজন হতে পারে। এই অর্থ বাজেটের কোন খাত থেকে আসবে এবং এর ফলে অন্য কোনো কর্মসূচি ক্ষতিগ্রস্ত হবে কি না, তার পূর্ণাঙ্গ হিসাব জনসমক্ষে থাকা প্রয়োজন। তাঁর মতে, পে-স্কেল এক বছরের ব্যয় নয়; এটি সরকারের পুনরাবৃত্ত ও দীর্ঘমেয়াদি দায়।পে-স্কেলের অর্থের সংস্থান সম্পর্কে তাঁর পরামর্শ হলো, বিদ্যমান করদাতাদের ওপর বাড়তি চাপ না দিয়ে করের আওতা বাড়ানো, অপ্রয়োজনীয় কর-সুবিধা পর্যালোচনা, উচ্চ আয়ের ব্যক্তি ও সম্পদধারীদের কার্যকরভাবে করজালে আনা, কর ফাঁকি ও অবৈধ আর্থিক প্রবাহ কমানো এবং সরকারি প্রতিষ্ঠানের আর্থিক শৃঙ্খলা বাড়ানো।অর্থনীতি অধ্যাপক ও সানেমের নির্বাহী পরিচালক সেলিম রায়হানও নতুন পে-স্কেলকে দীর্ঘদিনের মূল্যস্ফীতি ও জীবনযাত্রার ব্যয়ের পরিপ্রেক্ষিতে প্রয়োজনীয় আয় সমন্বয় হিসেবে দেখেছেন। তবে তাঁর মূল উদ্বেগ সরকারের আর্থিক সক্ষমতা নিয়ে।সেলিম রায়হান বলেন, নতুন বেতন ও পেনশন কার্যকর হলে বছরে অতিরিক্ত ১ লাখ ৫ হাজার ৫৮০ কোটি টাকার স্থায়ী ব্যয় তৈরি হবে। ধাপে ধাপে বাস্তবায়ন করলে প্রথম ধাক্কা কমতে পারে, কিন্তু সরকারের দায় কমবে না।তাঁর মতে, বেতন ও পেনশন এমন ব্যয়, যা একবার বাড়লে সহজে কমানো যায় না। রাজস্ব না বাড়লে এই অতিরিক্ত ব্যয় ভবিষ্যতে উন্নয়ন, সামাজিক সুরক্ষা বা অন্য অগ্রাধিকার খাতে সরকারের ব্যয়ের জায়গা সংকুচিত করতে পারে। এ কারণে পে-স্কেল বাস্তবায়নের সঙ্গে করের আওতা বাড়ানো, কর ফাঁকি রোধ, অযৌক্তিক কর-ছাড় কমানো এবং রাজস্ব প্রশাসনে সংস্কার জরুরি।বিশ্বব্যাংকের ঢাকা অফিসের সাবেক প্রধান অর্থনীতিবিদ জাহিদ হোসেনও পে-স্কেল বাস্তবায়নের আগে অর্থের উৎস নিশ্চিত করার ওপর গুরুত্ব দিয়েছেন। তিনি বলেন, বাংলাদেশের বড় দুর্বলতা রাজস্ব আহরণ। জিডিপির তুলনায় কর আদায়ের হার কম, অথচ সরকারি ব্যয় ধারাবাহিকভাবে বাড়ছে।তাঁর মতে, পে-স্কেলের মতো বড় ব্যয় কর্মসূচির অর্থায়ন নিশ্চিত না হলে বাজেট ঘাটতি ও মূল্যস্ফীতির চাপ বাড়তে পারে।অন্যদিকে, পে-স্কেল বাস্তবায়নের আগে দেবপ্রিয় ভট্টাচার্যও বিষয়টি পর্যালোচনার প্রয়োজনীয়তার কথা বলেছিলেন। মার্চে তিনি নতুন সরকারের নিজস্ব কমিশনের মাধ্যমে পে-স্কেল পুনর্বিবেচনার কথা বলেন। পরে আগস্টে তিনি পে-স্কেল নিয়ে সিদ্ধান্ত নিতে দেরি হলে পরিস্থিতি জটিল হওয়ার আশঙ্কা প্রকাশ করেছিলেন।সরকার অবশ্য বলছে, নতুন পে-স্কেল নির্ধারণের ক্ষেত্রে শুধু কর্মচারীদের বেতন নয়, দেশের আর্থিক সক্ষমতা, সামগ্রিক অর্থনৈতিক পরিস্থিতি, মূল্যস্ফীতি, জীবনযাত্রার ব্যয় ও সরকারি কর্মচারীদের জীবনমান বিবেচনায় নেওয়া হয়েছে। মন্ত্রিপরিষদ সচিব নাসিমুল গনি জানান, সর্বনিম্ন ও সর্বোচ্চ গ্রেডের বেতনের অনুপাতও কমিয়ে আনা হয়েছে।নতুন পে-স্কেলের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো, পুরো বেতন একসঙ্গে কার্যকর হচ্ছে না। ২০২৬-২৭ ও ২০২৭-২৮ অর্থবছরে ধাপে ধাপে এটি বাস্তবায়ন করা হবে। কর্মরতদের মূল বেতন তিন ধাপে পূর্ণ হবে। আর নতুন হারে বিভিন্ন ভাতা কার্যকর হবে ২০২৮ সালের ১ জানুয়ারি থেকে।পেনশনভোগীদের ক্ষেত্রেও বর্ধিত নিট পেনশন ধাপে কার্যকর করার সিদ্ধান্ত হয়েছে। ধাপে বাস্তবায়নের পেছনে সরকারের আর্থিক সক্ষমতা এবং মূল্যস্ফীতির ওপর সম্ভাব্য প্রভাব বিবেচনার বিষয়টি রয়েছে।তবে পেনশনভোগীদের জন্য নতুন ব্যবস্থার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো কম পেনশন পাওয়া ব্যক্তিদের ক্ষেত্রে বৃদ্ধির হার বেশি রাখা হয়েছে। এতে বহু বছর আগে অবসরে যাওয়া ব্যক্তিরা তুলনামূলকভাবে বেশি সুবিধা পাবেন। একই সঙ্গে সর্বোচ্চ নিট পেনশন ৭০ হাজার ২০০ টাকা নির্ধারণ করা হয়েছে।পেনশনভোগীদের প্রকৃত স্বস্তি নির্ভর করবে আরও একটি বিষয়ের ওপর—মূল্যস্ফীতি কতটা নিয়ন্ত্রণে থাকে। একজন অবসরপ্রাপ্ত ব্যক্তির মাসিক পেনশন ৯ হাজার টাকা থেকে ১৮ হাজার টাকা হলে কাগজে তাঁর আয় দ্বিগুণ হচ্ছে। কিন্তু একই সময়ে খাদ্য, চিকিৎসা, বাসাভাড়া ও অন্যান্য নিত্যপ্রয়োজনীয় ব্যয় যদি বেড়ে যায়, তাহলে বাড়তি আয়ের বড় অংশ সেই ব্যয় মেটাতেই চলে যেতে পারে। ফলে নামমাত্র আয় দ্বিগুণ হলেও জীবনযাত্রার সক্ষমতা একই অনুপাতে বাড়বে না।এ কারণেই অর্থনীতিবিদদের আলোচনায় পে-স্কেলের পাশাপাশি মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ ও রাজস্ব সংস্কারের বিষয়টি এসেছে। সরকারের জন্য যেমন বাড়তি ব্যয়ের অর্থের সংস্থান একটি চ্যালেঞ্জ, তেমনি পেনশনভোগীদের জন্য বাড়তি পেনশনের প্রকৃত মূল্য ধরে রাখাও গুরুত্বপূর্ণ।নতুন পে-স্কেলে তাই একদিকে দীর্ঘ অপেক্ষার পর অবসরভোগীদের মাসিক আয়ে বড় ধরনের বৃদ্ধি এসেছে, বিশেষ করে কম পেনশন পাওয়া ব্যক্তিদের জন্য। অন্যদিকে সরকারের জন্য তৈরি হয়েছে দীর্ঘমেয়াদি স্থায়ী ব্যয়ের দায়। আর পেনশনভোগীদের ক্ষেত্রে বাড়তি পেনশন বাস্তবে কতটা আর্থিক স্বস্তি দেবে, তা অনেকাংশে নির্ভর করবে মূল্যস্ফীতি, চিকিৎসা ব্যয় ও সামগ্রিক জীবনযাত্রার ব্যয়ের গতিপ্রকৃতির ওপর।

পে-স্কেলে পেনশন বাড়ছে দ্বিগুণ, স্বস্তির সঙ্গে থাকছে ক্রয়ক্ষমতার প্রশ্ন