ঢাকা    রোববার, ১৩ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ২৯ ভাদ্র ১৪৩৩ ৩০ রবিউল আউয়াল ১৪৪৮ হিজরি
বাংলাদেশ সময়
বাংলা ভিউজ

সরকারি কেনাকাটায় অনিয়ম ঠেকাতে আসছে অভিন্ন রেট শিডিউল

সরকারি কেনাকাটা ও নির্মাণকাজে একই ধরনের পণ্য ও উপকরণের দামে দপ্তরভেদে বড় ধরনের পার্থক্য এবং অস্বাভাবিক মূল্য নির্ধারণ ঠেকাতে অভিন্ন রেট শিডিউল চালুর উদ্যোগ নিয়েছে সরকার। প্রস্তাবিত ব্যবস্থায় সরকারি প্রকৌশল সংস্থাগুলোর জন্য একটি সাধারণ দর কাঠামো থাকবে। যেসব সংস্থার নিজস্ব দরতালিকা নেই, তাদেরও এই কাঠামো অনুসরণ করে পণ্য ও উপকরণের মূল্য নির্ধারণের প্রস্তাব করা হয়েছে।তবে অভিন্ন রেট শিডিউল চালু হলেও দেশের সব এলাকায় একই দাম প্রযোজ্য হবে না। দুর্গম, পাহাড়ি, উপকূলীয় ও দ্বীপাঞ্চলের দূরত্ব, পরিবহন ব্যয় এবং ভৌগোলিক বৈশিষ্ট্য বিবেচনায় জোনভিত্তিক আলাদা দর রাখার সুযোগ থাকবে। একই সঙ্গে কোনো সংস্থার বিশেষায়িত কাজের ক্ষেত্রে পৃথক রেট শিডিউলও নির্ধারণ করা যাবে।সরকারি বিভিন্ন প্রকল্পে অতীতে একই ধরনের পণ্য ও সরঞ্জাম কেনাকাটায় অস্বাভাবিক মূল্য নির্ধারণ নিয়ে ব্যাপক সমালোচনা হয়েছে। এর অন্যতম আলোচিত উদাহরণ রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মাণ প্রকল্প। ওই প্রকল্পে কর্মকর্তা-কর্মচারীদের আবাসনের জন্য একেকটি বালিশের দাম ৬ হাজার ৯৫৭ টাকা থেকে সর্বোচ্চ ৮৯ হাজার ৯০০ টাকা পর্যন্ত দেখানো হয়েছিল।চট্টগ্রাম মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ের জন্য একটি বালিশের প্রস্তাবিত মূল্য ছিল ২৭ হাজার ৭২০ টাকা। সরকারি স্বাস্থ্য খাতের বিভিন্ন কেনাকাটাতেও অস্বাভাবিক দামের অভিযোগ ওঠে। কোনো কোনো ক্ষেত্রে একেকটি গগলসের দাম ৫ হাজার টাকা, হ্যান্ড গ্লাভসের দাম ৩৫ হাজার টাকা এবং রক্ত পরীক্ষায় ব্যবহৃত ছোট একটি টিউবের মূল্য ১ লাখ ৩৪ হাজার টাকা পর্যন্ত নির্ধারণ করা হয়েছিল। এসব ঘটনার কয়েকটিতে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে মামলাও চলছে।সংশ্লিষ্ট কমিটির সদস্যরা মনে করছেন, সব সরকারি প্রকৌশল সংস্থার জন্য একটি অভিন্ন দর কাঠামো থাকলে একই ধরনের নির্মাণকাজ বা পণ্য কেনার ক্ষেত্রে দপ্তরভেদে ইচ্ছামতো ও অস্বাভাবিক দর নির্ধারণের সুযোগ অনেকটাই কমবে।গত ১৩ মে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত জাতীয় অর্থনৈতিক পরিষদের নির্বাহী কমিটির সভায় সরকারি নির্মাণকাজের দর তফসিল পুনর্বিন্যাসে একটি বিশেষ কমিটি গঠন করা হয়। অর্থ ও পরিকল্পনা উপদেষ্টা রাশেদ আল মাহমুদ তিতুমীরকে ওই কমিটির আহ্বায়ক করা হয়। এতে সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়ের সচিব, সরকারি সংস্থাগুলোর প্রধান প্রকৌশলী এবং বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের যোগ্য প্রতিনিধিদের অন্তর্ভুক্ত করা হয়।একাধিক বৈঠকের পর কমিটি একটি প্রতিবেদন চূড়ান্ত করেছে। প্রতিবেদনে বাজারদর, বৈদেশিক মুদ্রার বিনিময় হার, ভ্যাট, কর এবং অন্যান্য অর্থনৈতিক সূচকের পরিবর্তনের সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে রেট শিডিউল নিয়মিত হালনাগাদের সুপারিশ করা হয়েছে।প্রস্তাব অনুযায়ী, সরকারি কাজে ব্যবহৃত বিভিন্ন নির্মাণসামগ্রীর বাজারদর নিয়মিত সংগ্রহ করবে বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরো। এসব তথ্য বিবিএসের ওয়েবসাইটে প্রকাশ করা হবে। সরকারি সংস্থাগুলো তাদের প্রকল্পের ব্যয় নির্ধারণের সময় ওই দরের তথ্য ব্যবহার করবে।কমিটির সদস্যসচিব ও পরিকল্পনা কমিশনের অতিরিক্ত সচিব কবির আহামদ জানিয়েছেন, ইট, রড, সিমেন্ট ও বালুর মতো প্রায় সব প্রকৌশল সংস্থায় ব্যবহৃত সাধারণ পণ্যের জন্য একটি অভিন্ন তালিকা থাকবে। তবে কোনো সংস্থার বিশেষ ধরনের কাজ থাকলে তাদের জন্য আলাদা বিশেষ দরতালিকার সুযোগ রাখা হবে।তিনি জানান, একক রেট শিডিউল তৈরির কাজ প্রায় শেষ। প্রতিবেদনটি শিগগিরই একনেক সভায় উপস্থাপনের প্রস্তুতি রয়েছে।নতুন ব্যবস্থায় দীর্ঘ সময় একই দাম বহাল রাখার পরিবর্তে বাজার পরিস্থিতির পরিবর্তনের সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে দাম হালনাগাদ করার ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। বৈদেশিক মুদ্রার বিনিময় হার, মূল্যস্ফীতি, পরিবহন ব্যয় এবং কর কাঠামোর পরিবর্তন বিবেচনায় নিয়ে রেট শিডিউল হালনাগাদের জন্য একটি অনলাইন পোর্টাল তৈরিরও সুপারিশ করা হয়েছে।প্রতিবেদনে বৈদেশিক মুদ্রার বিনিময় হারের পরিবর্তনের উদাহরণও দেওয়া হয়েছে। এতে বলা হয়েছে, ২০২০ সালে প্রতি ডলারের গড় মূল্য ছিল প্রায় ৮৪ টাকা। ২০২৬ সালে তা বেড়ে প্রায় ১২২ টাকায় দাঁড়িয়েছে। ডলারের দামের এই পরিবর্তনের কারণে আমদানিনির্ভর নির্মাণসামগ্রীর ব্যয়েও উল্লেখযোগ্য প্রভাব পড়েছে।বিটুমিন, পাথর ও বালুর মতো গুরুত্বপূর্ণ নির্মাণসামগ্রীর দেশি ও আন্তর্জাতিক বাজারদরও নিয়মিত সংগ্রহ ও প্রকাশের প্রস্তাব করা হয়েছে। সরকারি সংস্থাগুলো এসব তথ্য বিবেচনায় নিয়ে প্রকল্পের ব্যয় প্রাক্কলন করবে।তবে শুধু অভিন্ন দর নির্ধারণ করলেই সরকারি কেনাকাটার সব অনিয়ম বন্ধ হবে না বলে মনে করেন বিশ্বব্যাংকের ঢাকা কার্যালয়ের সাবেক মুখ্য অর্থনীতিবিদ জাহিদ হোসেন। তার মতে, সমস্যার মূল জায়গায় সংস্কার প্রয়োজন। সরকারি ক্রয় আইন ও ক্রয় বিধিমালা পুরোপুরি অনুসরণ এবং বাংলাদেশ সরকারি ক্রয় কর্তৃপক্ষের নিয়ম অনুযায়ী কেনাকাটা সম্পন্ন করার ওপর গুরুত্ব দিয়েছেন তিনি।বর্তমানে সরকারি বিভিন্ন সংস্থা ভিন্ন ভিন্ন পদ্ধতিতে পণ্য ও উপকরণের মূল্য নির্ধারণ করে। কোনো কোনো সংস্থা বাজারদর যাচাই করতে নিজস্ব কমিটি গঠন করে। আবার কোনো সংস্থা আগের বছরের দাম এবং মূল্যস্ফীতি বিবেচনায় নিয়ে নতুন মূল্য নির্ধারণ করে। ফলে একই ধরনের পণ্য বা উপকরণের দামে এক সংস্থার সঙ্গে অন্য সংস্থার বড় ধরনের পার্থক্য তৈরি হয়।বর্তমানে গণপূর্ত অধিদপ্তর, সড়ক ও জনপথ অধিদপ্তর, স্থানীয় সরকার প্রকৌশল অধিদপ্তর এবং পানি উন্নয়ন বোর্ডের নিজস্ব রেট শিডিউল রয়েছে। অন্যদিকে জনস্বাস্থ্য প্রকৌশল অধিদপ্তর, স্বাস্থ্য ও শিক্ষা প্রকৌশল অধিদপ্তর, বেসামরিক বিমান চলাচল কর্তৃপক্ষ এবং সেতু বিভাগের মতো কয়েকটি সংস্থার নিজস্ব পূর্ণাঙ্গ দরতালিকা নেই।সংশ্লিষ্টদের আশা, অভিন্ন রেট শিডিউল কার্যকর হলে সরকারি প্রকল্পে একই ধরনের পণ্য ও নির্মাণসামগ্রীর দামে দপ্তরভেদে অস্বাভাবিক পার্থক্য কমবে। একই সঙ্গে প্রকল্পের ব্যয় নির্ধারণে স্বচ্ছতা বাড়বে এবং বাজারদরের সঙ্গে সামঞ্জস্যহীন মূল্য দেখিয়ে অতিরিক্ত অর্থ ব্যয়ের সুযোগও সীমিত হবে।

সরকারি কেনাকাটায় অনিয়ম ঠেকাতে আসছে অভিন্ন রেট শিডিউল