ইরানের সঙ্গে সমঝোতা স্মারক স্বাক্ষরের মাত্র তিন দিন আগে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প দাবি করেছিলেন, তেহরান এই চুক্তি নিয়ে গর্ব করতে পারবে। তার ভাষায়, ইরান মার খেতে খেতে ক্লান্ত হয়ে পড়েছে। তবে সাম্প্রতিক ঘটনাপ্রবাহে ট্রাম্পের সেই আশাবাদের কোনো প্রতিফলন দেখা যাচ্ছে না।হরমুজ প্রণালিতে তিনটি বাণিজ্যিক জাহাজে ইরানের হামলার অভিযোগের পর তেহরানকে দেওয়া সীমিত তেল বিক্রির অনুমতি বাতিল করেছে যুক্তরাষ্ট্র। পাশাপাশি ইরানের শতাধিক সামরিক স্থাপনায় হামলা চালিয়েছে মার্কিন বাহিনী। এর ফলে সমঝোতা স্মারককে পূর্ণাঙ্গ চুক্তিতে রূপ দেওয়ার প্রক্রিয়াও কার্যত স্থগিত হয়ে পড়েছে। [BANGVIEWS-POST:1548]এ অবস্থায় ট্রাম্প প্রশাসনের কাছে বিকল্প কোনো পরিকল্পনা থাকলেও তা প্রকাশ করা হয়নি। বরং তাদের কর্মকাণ্ডে আবারও নিষেধাজ্ঞা ও সামরিক হামলার পুরোনো কৌশলে ফিরে যাওয়ার ইঙ্গিত মিলছে।মার্কিন ভাইস প্রেসিডেন্ট জেডি ভ্যান্সও ইরানকে কঠোর হুঁশিয়ারি দিয়েছেন। তিনি বলেছেন, ইরান বাণিজ্যিক জাহাজে হামলা চালালে যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক বাহিনী পাল্টা কঠোর আঘাত হানবে। বিশ্লেষকদের মতে, এর মাধ্যমে ইরানকে তেল বিক্রির সুযোগ দিয়ে আলোচনায় রাখার কৌশল দুর্বল হয়ে পড়েছে। কিন্তু নতুন করে অর্থনৈতিক চাপ ও বোমাবর্ষণ শুরু হলেও তা কীভাবে দীর্ঘমেয়াদি সফলতা আনবে, সে বিষয়ে ওয়াশিংটনের কাছে স্পষ্ট উত্তর নেই।যুক্তরাষ্ট্রের সাবেক কূটনীতিক রিচার্ড এন হাসের মতে, ট্রাম্প প্রশাসন এক ধরনের কৌশলগত চোরাবালিতে আটকে গেছে। যুক্তরাষ্ট্র যত বেশি আক্রমণাত্মক হবে, ইরানও পারস্য উপসাগরের জ্বালানি অবকাঠামো ও নৌপথে তত বেশি পাল্টা হামলা চালাতে পারে। অথচ গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনা ও বাণিজ্যিক জাহাজের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার কার্যকর উপায় এখনো বের করতে পারেনি ওয়াশিংটন।[BANGVIEWS-POST:1546]তার মতে, ট্রাম্প প্রথমে ভেবেছিলেন বোমাবর্ষণের মাধ্যমে ইরানে সরকার পরিবর্তন ঘটানো বা তেহরানকে আত্মসমর্পণে বাধ্য করা সম্ভব হবে। কিন্তু এর কোনোটিই ঘটেনি।যুক্তরাষ্ট্রের একজন কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে জানিয়েছেন, ট্রাম্প প্রশাসন এখনো শান্তিপূর্ণ সমাধানের বিষয়ে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ এবং কারিগরি পর্যায়ের আলোচনা অব্যাহত রাখার আশা করছে।তবে পর্যবেক্ষকদের মতে, দুই দেশের প্রধান বিরোধগুলো কারিগরি নয়, বরং পুরোপুরি রাজনৈতিক। এর মধ্যে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো হরমুজ প্রণালির নিয়ন্ত্রণ কার হাতে থাকবে।ইরানের সঙ্গে স্বাক্ষরিত সমঝোতা স্মারকের পঞ্চম অনুচ্ছেদে বাণিজ্যিক জাহাজের নিরাপদ চলাচল নিশ্চিত করতে তেহরানকে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিতে বলা হয়। একই সঙ্গে ৬০ দিনের জন্য টোল আদায় না করার বিষয়ও উল্লেখ ছিল।ট্রাম্প প্রশাসন ওই ধারাকে হরমুজে জাহাজ চলাচল স্বাভাবিক করার ভিত্তি হিসেবে দেখেছিল। কিন্তু ইরান এটিকে নৌপথের ওপর নিজেদের কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠার সুযোগ হিসেবে নিয়েছে। তেহরান জাহাজগুলোকে তাদের নির্ধারিত পথে চলাচলের দাবি জানানোর পাশাপাশি ভবিষ্যতে সেবা ফি আদায়ের কথাও জানিয়েছে। চুক্তির এই অস্পষ্ট ধারাই দুই পক্ষের মধ্যে নতুন বিরোধের অন্যতম কারণ হয়ে উঠেছে। পরবর্তী সময়ে মার্কিন নৌবাহিনী ওমান উপকূলের কাছাকাছি বিকল্প পথে জাহাজ চলাচলে সহায়তা করলে ইরান কয়েকটি নৌযানে হামলা চালায় বলে অভিযোগ ওঠে। এতে হরমুজে ট্যাংকার চলাচল আবারও মারাত্মকভাবে কমে যায়। সাম্প্রতিক সংঘাত ট্রাম্প প্রশাসনকে আবারও আগের অবস্থানে ফিরিয়ে নিয়েছে। সামরিক হামলায় ইরানকে কাবু করতে ব্যর্থ হয়ে যে কূটনৈতিক পথ বেছে নেওয়া হয়েছিল, সেটিও এখন ভেঙে পড়ার ঝুঁকিতে। ফলে আলোচনার পাশাপাশি নতুন করে দীর্ঘস্থায়ী সংঘাতের আশঙ্কাও বাড়ছে। সূত্র: দ্য নিউইয়র্ক টাইমস