আন্তর্জাতিক ফুটবল থেকে ক্রিশ্চিয়ানো রোনালদোর নাটকীয় বিদায়
পর্তুগালের লাল-সবুজ জার্সিতে দীর্ঘ ২৩ বছরের এক অবিশ্বাস্য ও রেকর্ডময় আন্তর্জাতিক অধ্যায়ের সমাপ্তি টেনেছেন সর্বকালের অন্যতম সেরা ফুটবলার ক্রিশ্চিয়ানো রোনালদো। জাতীয় দলের হয়ে সর্বোচ্চ ২৪৩ ম্যাচে বিশ্বরেকর্ড ১৪৬ গোলের মাইলফলক গড়া ৪১ বছর বয়সী এই মহাতারকার এমন আকস্মিক ও নাটকীয় বিদায় বিশ্ব ফুটবল অঙ্গনে গভীর বিস্ময়ের সৃষ্টি করেছে। কোনো জাঁকজমকপূর্ণ বিদায়ী ম্যাচ বা সতীর্থদের গার্ড অব অনারের বদলে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে দেওয়া একটি সংক্ষিপ্ত ভিডিও বার্তার মাধ্যমে আন্তর্জাতিক অঙ্গন থেকে সরে দাঁড়ানোর ঘোষণা দেন তিনি।রোনালদোর এই তড়িঘড়ি অবসরের পেছনে বয়স কিংবা ফিটনেসের চেয়েও পর্তুগালের প্রধান কোচ জর্জ জেসুসের সঙ্গে তাঁর সাম্প্রতিক গভীর মতবিরোধ ও সম্পর্কের টানাপোড়েনকেই মূল প্রভাবক হিসেবে দেখছেন ফুটবল বিশ্লেষকরা। বিশেষ করে ম্যাচের শুরুর একাদশে নিয়মিত জায়গা হারানোর স্পষ্ট শঙ্কা পরিস্থিতিকে চূড়ান্ত সংঘাতের দিকে ঠেলে দেয়।ঘটনার সূত্রপাত ঘটে গত ২৭ সেপ্টেম্বর উয়েফা নেশনস লিগে নরওয়ের বিপক্ষে ম্যাচে। সেই ম্যাচে পুরো ৯০ মিনিট সাইডবেঞ্চে বসিয়ে রাখা হয় পর্তুগালের অধিনায়ককে, যা ২০০৮ সালের পর কোনো আন্তর্জাতিক ম্যাচে রোনালদোর প্রথম পুরো সময় বেঞ্চে কাটানোর ঘটনা। এরপর পরবর্তী ম্যাচে ডেনমার্কের মুখোমুখি হওয়ার আগে কোচ জেসুস সংবাদ সম্মেলনে খোলামেলা ইঙ্গিত দেন যে, ওই ম্যাচেও রোনালদো শুরুর একাদশে জায়গা নাও পেতে পারেন। শীর্ষ পর্যায়ে টানা দুই ম্যাচে বেঞ্চে থাকার এমন পূর্বাভাস মানসিকভাবে মেনে নিতে পারেননি এই বর্ষীয়ান তারকা।এর পরপরই জাতীয় দলের প্রশিক্ষণ ক্যাম্প ছেড়ে আকস্মিকভাবে চলে যান রোনালদো। ইনস্টাগ্রামে দেওয়া এক আনুষ্ঠানিক বার্তায় তিনি উল্লেখ করেন, কোচের সংবাদ সম্মেলন পর্যবেক্ষণ এবং পর্তুগিজ ফুটবল ফেডারেশনের (এফপিএফ) সভাপতির সঙ্গে আলোচনার পরই তিনি ক্যাম্প ত্যাগের চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নিয়েছেন। পরবর্তীতে কোচ জেসুস রোনালদোর জন্য দলের দরজা খোলা রাখার বার্তা দিলেও পরিস্থিতি স্বাভাবিক হয়নি। এমনকি বৃহস্পতিবার জেসুস ব্যক্তিগতভাবে ফোনে রোনালদোর সাথে কথা বলে সংকট নিরসনের চেষ্টা করলেও রোনালদো সাড়া দেননি। বর্তমান কোচিং স্টাফের কৌশলে নিজের প্রান্তিক ভূমিকা নিয়ে অসন্তোষ থেকেই এই দূরত্বের সৃষ্টি হয়।পর্তুগাল ফুটবল ফেডারেশন ঘরের মাঠে হাজারো দর্শকের সামনে এই জাতীয় বীরকে মর্যাদাপূর্ণ আনুষ্ঠানিক বিদায় দেওয়ার পরিকল্পনা করলেও রোনালদো মাঠে নেমে বিদায় নেওয়ার কোনো আগ্রহ দেখাননি। এমন বিদায়ের ধরন স্তম্ভিত করেছে তাঁর সাবেক গুরু হোসে মরিনিও ও সাবেক সতীর্থ রুবেন আমোরিমকে। উভয়েই মন্তব্য করেছেন, পর্তুগাল ফুটবলে রোনালদোর আকাশচুম্বী অবদানের তুলনায় এমন নিরব ও তিক্ত সমাপ্তি কোনোভাবেই কাম্য ছিল না।সবশেষে ভিডিও বার্তায় ভক্তদের প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করে নিজের আইকনিক ‘৭ নম্বর’ জার্সিটি ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য আনুষ্ঠানিকভাবে রেখে যাওয়ার ঘোষণা দেন রোনালদো। এর মাধ্যমে ২০০৩ সালে শুরু হওয়া দুই দশকেরও বেশি সময়ের আন্তর্জাতিক পথচলার পরিসমাপ্তি ঘটল, যদিও কোচের সাথে সম্পর্কের তিক্ততার কারণেই এই বিদায় কি না—সেই রহস্য হয়তো কেবল সিআরসেভেনের মনের ভেতরেই রয়ে গেল।