রাকসু ভোটের আগে আম্মারকে বহিষ্কার, শিবিরের বিরুদ্ধে ফায়দা নেওয়ার অভিযোগ
রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদের (রাকসু) সাধারণ সম্পাদক (জিএস) সালাহউদ্দিন আম্মারকে বাংলাদেশ ইসলামী ছাত্রশিবিরের ‘সাথী’ পদ থেকে বহিষ্কারের বিষয়টি প্রকাশ্যে আসার পর ক্যাম্পাসে নতুন করে রাজনৈতিক বিতর্ক তৈরি হয়েছে। আম্মারের বহিষ্কারকে ঘিরে কয়েকটি ছাত্রসংগঠন অভিযোগ করেছে, পরবর্তী রাকসু নির্বাচনে রাজনৈতিক ফায়দা নিতে শিবির কৌশল অবলম্বন করছে। তবে শিবির বলছে, রাকসু নির্বাচনের এক মাসেরও বেশি আগে আম্মারকে সংগঠন থেকে বহিষ্কার করা হয়েছিল। ফলে তাকে ‘ডামি প্যানেল’-এর মাধ্যমে নির্বাচনে আনার অভিযোগের কোনো ভিত্তি নেই।সম্প্রতি প্রকাশ্যে আসা তিনটি চিঠিতে আম্মারকে শিবির থেকে বহিষ্কারের বিষয়টি উঠে এসেছে। এসব চিঠিতে তার বিরুদ্ধে অর্থের বিনিময়ে পদ দেওয়ার অভিযোগ, সাংগঠনিক শৃঙ্খলাবিরোধী কর্মকাণ্ডসহ বিভিন্ন অভিযোগের কথা উল্লেখ করা হয়েছে।চিঠিগুলোর মধ্যে ২০২৫ সালের ৪ ফেব্রুয়ারি শাখা শিবিরের তৎকালীন সভাপতি এবং বর্তমান রাকসু ভিপি মোস্তাকুর রহমান জাহিদের স্বাক্ষরিত একটি চিঠিতে আম্মারের বিরুদ্ধে বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের রাজশাহী মহানগর ও জেলা কমিটিতে অর্থের বিনিময়ে পদ-বাণিজ্যের অভিযোগের কথা বলা হয়। ওই চিঠিতে তার ‘সাথী’ পদ স্থগিত রেখে আত্মপক্ষ সমর্থনের সুযোগ দেওয়ার কথা উল্লেখ ছিল।পরবর্তী একটি চিঠিতে বলা হয়, অভিযোগগুলোর ‘যথাযথ জবাব’ দিতে ব্যর্থ হওয়ায় ২০২৫ সালের সেপ্টেম্বর মাসে সংগঠনের মাসিক সেক্রেটারিয়েট বৈঠকে আম্মারের ‘সাথী’ পদ বাতিল করে তাকে বহিষ্কারের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়।এ ছাড়া গত ৩১ জুলাই শাখা শিবিরের সভাপতি মুজাহিদ ফয়সালের স্বাক্ষরিত আরেকটি চিঠিতে আম্মারের বহিষ্কারের বিষয়টি উল্লেখ করে সংগঠনের নেতাকর্মীদের তার সঙ্গে যোগাযোগ না রাখার নির্দেশ দেওয়া হয়। ওই চিঠিতে আম্মারের কর্মকাণ্ড এবং ‘ক্ষেত্রবিশেষে ফৌজদারি অপরাধে জড়িত হওয়ার’ অভিযোগ তুলে ক্যাম্পাসে অস্থিতিশীল পরিস্থিতি তৈরির কথাও বলা হয়। এসব অভিযোগ অবশ্য আম্মার অস্বীকার করেছেন।আম্মারের বহিষ্কারকে রাজনৈতিক কৌশল হিসেবে দেখছে ক্যাম্পাসের কয়েকটি ছাত্রসংগঠন। শাখা ছাত্রদলের সিনিয়র সহ-সভাপতি শাকিলুর রহমান সোহাগ বলেন, আম্মারকে শিবির থেকে বিচ্ছিন্ন দেখানোর চেষ্টা করা হলেও বাস্তবে তিনি সংগঠনটির সঙ্গে সংশ্লিষ্ট। তার ভাষ্য, শিবিরের মধ্যে দ্বন্দ্ব শুরু হয়েছে, তার অর্থ এই নয় যে আম্মার শিবির করেন না। এটি তাদের ভবিষ্যৎ পরিকল্পনার অংশ এবং শিক্ষার্থীদের কাছে আম্মারকে নিরপেক্ষ হিসেবে উপস্থাপনের চেষ্টা করা হচ্ছে।ছাত্র অধিকার পরিষদের শাখা সভাপতি মেহেদী মারুফ বহিষ্কারের বিষয়টিকে ‘লোকদেখানো’ বলে মন্তব্য করেন। তার দাবি, অফিসিয়ালি শিবির করা সম্ভব নয়—এমন কাজগুলোই আম্মার করেন। এখন তার সঙ্গে শিবিরের কোনো সম্পর্ক নেই—এমন একটি ধারণা শিক্ষার্থীদের মধ্যে তৈরি করার চেষ্টা করা হচ্ছে বলেও তিনি দাবি করেন। তার মতে, এটি শিবিরের আরেকটি কৌশল।শাখা ছাত্র ইউনিয়নের কোষাধ্যক্ষ কায়সার আহমেদ বলেন, শিবিরের একটি বর্ধিত ভার্সন হলো আম্মার। তার দাবি, সংগঠন হিসেবে শিবির যেসব কর্মকাণ্ডের দায় নিতে পারত না, সেগুলো আম্মারকে দিয়ে করানো হয়েছে।কায়সার আহমেদ আরও বলেন, রাকসুর বর্তমান কমিটির মেয়াদ শেষের দিকে। আম্মারের বিভিন্ন কর্মকাণ্ডের কারণে পরবর্তী নির্বাচনে শিক্ষার্থীদের কাছ থেকে তার পুনরায় ম্যান্ডেট পাওয়ার বিষয়টি প্রশ্নের মুখে পড়তে পারে। এ কারণে তাকে বহিষ্কার দেখিয়ে নতুন কোনো ‘বি’ টিম সামনে আনা হতে পারে বলেও তিনি দাবি করেন।শাখা ছাত্রদলের সভাপতি সুলতান আহমেদ রাহী বলেন, রাজনীতিতে মিথ্যা বা প্রতারণার কোনো সুযোগ নেই। আম্মারকে ঘিরে শিবিরের সাম্প্রতিক অবস্থান তাদের আগের কর্মকাণ্ডের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ বলেই তারা মনে করেন।রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে দীর্ঘ প্রায় সাড়ে তিন দশক পর ২০২৫ সালের ১৬ অক্টোবর রাকসু নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়। ওই নির্বাচনে ‘আধিপত্যবিরোধী ঐক্য’ প্যানেল থেকে জিএস নির্বাচিত হন সালাহউদ্দিন আম্মার। ওই প্যানেলের ভিপি প্রার্থী ছিলেন মেহেদী সজীব। নির্বাচনের সময় তার সঙ্গে শিবিরের সংশ্লিষ্টতা নিয়ে আলোচনা ছিল। পরে তিনি শাখা শিবিরের প্রচার ও মিডিয়া সম্পাদকের দায়িত্ব পান।আম্মারকে ‘ডামি প্যানেল’-এর মাধ্যমে নির্বাচনে জেতানোর অভিযোগ অস্বীকার করেছেন শাখা শিবিরের সাধারণ সম্পাদক মেহেদী হাসান।তিনি বলেন, আম্মার যদি তাদের জনশক্তি হতেন বা ডামি প্যানেলের অংশ হতেন, তাহলে রাকসু নির্বাচনের এক মাসেরও বেশি আগে তাকে বহিষ্কার করা হতো না। তার দাবি, শিবিরের কোনো ডামি প্যানেল ছিল না এবং তাদের কোনো ‘এ টিম’ বা ‘বি টিম’ও ছিল না। বিভিন্ন জায়গা থেকে প্রার্থী নিয়ে একটি ইনক্লুসিভ প্যানেল করার চেষ্টা করা হয়েছিল।মেহেদী সজীবের বিষয়ে মেহেদী হাসান বলেন, রাকসু নির্বাচনের সময় তিনি শিবিরের দায়িত্বশীল ছিলেন না। পরবর্তী সময়ে তিনি শিবিরের সঙ্গে যোগাযোগ করে দায়িত্বশীল হন। নির্বাচনের সময় শিবিরের পক্ষ থেকে মেহেদী সজীবকে সংগঠনের দায়িত্বশীল হিসেবে পরিচয় করিয়ে দেওয়ার কোনো বক্তব্যও দেওয়া হয়নি বলে তিনি দাবি করেন।নিজের বিরুদ্ধে শিবিরের আনা অভিযোগ অস্বীকার করেছেন রাকসুর জিএস সালাহউদ্দিন আম্মার। গত বুধবার রাতে ফেসবুকে দেওয়া এক পোস্টে তিনি লিখেছেন, তিনি শেষ অধিবেশনে ছিলেন। সেখান থেকে এসে দেখেন, তাকে নারীদের সঙ্গে অবাধ মেলামেশা, অর্থের বিনিময়ে পদ দেওয়া-সহ বিভিন্ন অভিযোগে ২০২৫ সালে বহিষ্কার করা হয়েছে বলে প্রচার করা হচ্ছে।নারীদের সঙ্গে অবাধ মেলামেশার অভিযোগ অস্বীকার করে আম্মার বলেন, তার চরিত্র নিয়ে প্রশ্ন তোলার কোনো সুযোগ নেই।বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের বিভিন্ন কমিটি গঠনের প্রসঙ্গে আম্মার বলেন, রাজশাহীর স্থানীয় শিক্ষার্থীরা একটি কমিটি নিয়ে তার কাছে এসেছিলেন। তবে ওই কমিটি গঠনের সঙ্গে তার কোনো সম্পৃক্ততা ছিল না বলে তিনি দাবি করেন।চাঁদাবাজির অভিযোগের বিষয়ে আম্মার বলেন, জুলাই আন্দোলন নিয়ে একটি অনুষ্ঠান আয়োজনের জন্য তৎকালীন উপাচার্যের পরামর্শে বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান ও ব্যাংকের কাছে পৃষ্ঠপোষকতার প্রস্তাব নিয়ে গিয়েছিলেন তিনি। পরে সেটিকে ‘চাঁদা চাওয়ার চিঠি’ হিসেবে প্রচার করা হয়েছে বলে দাবি করেন তিনি।শিবিরের সঙ্গে নিজের সংশ্লিষ্টতার বিষয়ে আম্মার বলেন, তিনি কখনোই শিবিরের সংশ্লিষ্টতা গোপন করেননি। যখন অনেকে পরিচয় দিতে ভয় পেতেন, তখনও তিনি শিবিরের সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ডে অংশ নিয়েছেন বলে জানান। তবে বর্তমানে তার বিরুদ্ধে যেসব অভিযোগ আনা হচ্ছে, সেগুলোর সঙ্গে তিনি সম্পৃক্ত নন বলে দাবি করেন।আম্মারের আরও দাবি, শিবির তার বিরুদ্ধে একাধিক অভিযোগ করলেও সেগুলোর পক্ষে কোনো প্রমাণ দেয়নি। তিনি বলেন, ‘আল্লাহকে সাক্ষী রেখে বলছি, আজ পর্যন্ত আমার বিরুদ্ধে আনা অভিযোগগুলোর কোনোটির সঙ্গেই আমি সম্পৃক্ত নই।’ফলে রাকসু জিএস সালাহউদ্দিন আম্মারের শিবির থেকে বহিষ্কারের সময়, বহিষ্কারের কারণ এবং রাকসু নির্বাচনের সঙ্গে এর সম্পর্ক নিয়ে ক্যাম্পাসে পরস্পরবিরোধী বক্তব্য সামনে এসেছে। শিবির একদিকে বলছে, নির্বাচনের এক মাসেরও বেশি আগে আম্মারকে বহিষ্কার করা হয়েছিল; অন্যদিকে কয়েকটি ছাত্রসংগঠন এটিকে ভবিষ্যৎ নির্বাচনী কৌশল হিসেবে দেখছে। আম্মার নিজেও তার বিরুদ্ধে আনা অভিযোগ অস্বীকার করেছেন।