ট্রাম্প প্রশাসন হঠাৎ কেন মিয়ানমারের সঙ্গে সম্পর্ক গড়তে চাচ্ছে
মিয়ানমারের সামরিক জান্তাকে আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলে সম্পূর্ণ একঘরে ও বিচ্ছিন্ন করে রাখার দীর্ঘদিনের কঠোর পররাষ্ট্রনীতি থেকে সরে আসার স্পষ্ট ইঙ্গিত দিচ্ছে ওয়াশিংটন। দেশটির বর্তমান ক্ষমতাশালী সামরিক সরকারের সঙ্গে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প প্রশাসনের সাম্প্রতিক প্রত্যক্ষ যোগাযোগ, উচ্চপর্যায়ের বৈঠক এবং জান্তাসংশ্লিষ্ট কয়েকজন প্রভাবশালী ব্যবসায়ীর ওপর থেকে মার্কিন অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহারের মতো একের পর এক ঘটনা আন্তর্জাতিক ভূরাজনীতিতে সেই পরিবর্তনের আভাসই জোরালো করছে।২০২১ সালের ফেব্রুয়ারিতে রক্তক্ষয়ী সামরিক অভ্যুত্থানের মাধ্যমে শান্তিতে নোবেলজয়ী অং সান সু চির গণতান্ত্রিক সরকারকে হটিয়ে ক্ষমতা দখল করেছিলেন সিনিয়র জেনারেল মিন অং হ্লাইং। এরপর থেকে ওয়াশিংটনের সঙ্গে নেপিডোর আনুষ্ঠানিক কূটনৈতিক সম্পর্ক কার্যত স্থবির ও সীমিত ছিল। তবে সেই অচলাবস্থা ভেঙে গত ১৫ ও ১৬ সেপ্টেম্বর যুক্তরাষ্ট্রের গোয়েন্দা ও গবেষণাবিষয়ক অ্যাসিস্ট্যান্ট সেক্রেটারি অব স্টেট মাইকেল ভ্যান্স মিয়ানমারের রাজধানী নেপিডোতে স্বয়ং প্রেসিডেন্ট মিন অং হ্লাইংয়ের সঙ্গে আনুষ্ঠানিক দ্বিপাক্ষিক বৈঠক করেন। যদিও এ সফরের আনুষ্ঠানিক উদ্দেশ্য হিসেবে স্থানীয় আমেরিকান চেম্বার অব কমার্সের বিরোধে আটক হওয়া মার্কিন নাগরিক অ্যাডাম কাস্তিলোকে মুক্ত করার কথা বলা হয়েছিল, তবে বাস্তবে এই ঐতিহাসিক বৈঠকের পরিসর কেবল নাগরিক মুক্তির মধ্যেই সীমাবদ্ধ ছিল না। ২০২১ সালে ক্ষমতা দখলের পর এই প্রথম কোনো শীর্ষ মার্কিন কর্মকর্তা জান্তাপ্রধানের মুখোমুখি হলেন, যেখানে দুই দেশের পারস্পরিক স্বার্থসংশ্লিষ্ট ভূকৌশলগত বিষয়াদি গুরুত্ব পায়। এর আগে ও পরে টোকিওতেও মিয়ানমারের উচ্চপর্যায়ের প্রতিনিধি এবং জান্তাবিরোধী পক্ষের সঙ্গে একাধিক গোপন বৈঠকে অংশ নেন মাইকেল ভ্যান্স।কূটনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, মিয়ানমার নিয়ে ওয়াশিংটনের সুর নরম হওয়ার পটভূমি তৈরি হয়েছিল মূলত গত বছরের জুলাইয়ে শুরু হওয়া বৈশ্বিক বাণিজ্য যুদ্ধের সময়ে। যখন তৎকালীন ভঙ্গুর অর্থনীতির মিয়ানমারের ওপর ৪০ শতাংশ শাস্তিমূলক শুল্ক আরোপের ঘোষণা দিয়ে প্রেসিডেন্ট মিন অং হ্লাইংকে ব্যক্তিগত চিঠি পাঠিয়েছিলেন ট্রাম্প। অন্যান্য ১৪টি দেশের নেতারা এমন সিদ্ধান্তে ক্ষুব্ধ হলেও হ্লাইং উল্টো উচ্ছ্বসিত হয়েছিলেন। কারণ, আনুষ্ঠানিকভাবে সামরিক জান্তাকে স্বীকৃতি না দেওয়া ওয়াশিংটনের প্রেসিডেন্ট খোদ হ্লাইংকে ‘মহামান্য’ (Excellency) সম্বোধন করে চিঠি পাঠিয়েছিলেন। এতে যুদ্ধাপরাধের অভিযোগে আইসিসি ও আইসিজেতে মামলার মুখে থাকা একঘরে স্বৈরশাসক হ্লাইং আন্তর্জাতিক বৈধতার এক অদৃশ্য সুযোগ দেখতে পান।পরবর্তীতে ট্রাম্পের লেখার অতি-উৎসাহী ধরন অনুকরণ করে হ্লাইং পাল্টা চিঠিতে ট্রাম্পকে ‘সত্যিকারের দেশপ্রেমিক’ আখ্যা দিয়ে মার্কিন অর্থনীতিতে অংশগ্রহণের জন্য তোষামোদপূর্ণ কৃতজ্ঞতা জানান। কূটনৈতিক পর্যবেক্ষকদের মতে, এপ্রিল মাসে ট্রাম্পের শুল্কের জবাবে চীন যখন যুক্তরাষ্ট্রে গুরুত্বপূর্ণ বিরল খনিজ (Rare Earth Elements) রপ্তানি বন্ধ করে দেয়, তখন এই খনিজের বিকল্প উৎসের জন্য মিয়ানমারের ওপর মার্কিন নির্ভরতার বাস্তবতা তীব্র হয়ে ওঠে। জান্তার ওপর আন্তর্জাতিক নিষেধাজ্ঞা শিথিল হওয়া কিংবা সু চির কারাবাস ও গণতন্ত্র ধ্বংসের প্রসঙ্গকে পাশ কাটিয়ে এই আকস্মিক ভূরাজনৈতিক পুনর্মিলনের পেছনে খনিজ সম্পদ ও বেইজিংকে টেক্কা দেওয়ার কৌশলই মূল চালিকাশক্তি হিসেবে কাজ করছে বলে ধারণা করা হচ্ছে।