ঢাকা    সোমবার, ২১ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ৬ আশ্বিন ১৪৩৩ ৮ রবিউস সানি ১৪৪৮ হিজরি
বাংলাদেশ সময়
বাংলা ভিউজ

বরফের ঘর থেকে সমুদ্রে গোপন কেবিন, সৌদি যুবরাজের বিলাসী ইয়টে আর কী আছে?

বিশ্বের অধিকাংশ বিলিয়নিয়ারের কাছে সুপারইয়টের সবচেয়ে আকর্ষণীয় অংশগুলোর একটি হলো বিশাল মাস্টার স্যুট। তবে সৌদি যুবরাজ মোহাম্মদ বিন সালমান আল সৌদের ৪৩৯ ফুট দীর্ঘ বিলাসবহুল ইয়ট ‘সেরিন’-এ সবচেয়ে চমকপ্রদ শয়নকক্ষটি মূল স্যুটের তিন ডেক নিচে। ‘সি কেবিন’ নামে পরিচিত এই কক্ষটি আকার কিংবা চাকচিক্য দিয়ে নজর কাড়ার জন্য তৈরি হয়নি। বরং ইয়ট সমুদ্রে চলার সময় যাত্রী যাতে তুলনামূলক স্বস্তিতে ঘুমাতে পারেন, সেই লক্ষ্যেই বিশেষভাবে নকশা করা হয়েছে।সৌদি যুবরাজ সমুদ্রযাত্রায় অসুস্থতাবোধ করেন বলে বিভিন্ন প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। সে কারণেই ‘সেরিন’-এর এই বিশেষ কেবিনটি আলোচনায় এসেছে। ভূমধ্যসাগর পাড়ি দেওয়া হোক কিংবা দীর্ঘ সমুদ্রযাত্রা, ইয়টের অনেক ওপরে থাকা বিশাল মালিকের স্যুটের তুলনায় এই বালিনিজ ধাঁচের কক্ষটি অপেক্ষাকৃত শান্ত ও স্থির জায়গা হিসেবে কাজ করে। এখানে নকশার মূল লক্ষ্য ছিল চারপাশের দৃশ্য দেখানো নয়, বরং উত্তাল সমুদ্রে ইয়টের দুলুনি যতটা সম্ভব কম অনুভব করা।বিজ্ঞান মাথায় রেখে তৈরি১৩৪ মিটার দীর্ঘ ‘সেরিন’-এর দ্বিতীয় ডেকের মাঝামাঝি, ডান পাশের অংশে এই ‘সি কেবিন’ অবস্থিত। ইয়টের এই অবস্থানকে তুলনামূলকভাবে স্থিতিশীল হিসেবে বিবেচনা করা হয়।নৌযানের নকশাবিদ্যার ব্যাখ্যা অনুযায়ী, ঢেউয়ের বিপরীতে চলার সময় ইয়টের সামনের অংশ সবচেয়ে বেশি ওঠানামা করে। অন্যদিকে পেছনের অংশে ইয়টের দুলুনি, কম্পন এবং প্রপেলারের কারণে তৈরি নড়াচড়া বেশি অনুভূত হয়। একই সঙ্গে ওপরের ডেকগুলো ইয়ট দুললে তুলনামূলকভাবে বড় পরিসরে ওঠানামা করে।এর বিপরীতে ইয়টের নিচের দিকে এবং মাঝামাঝি অংশে থাকা কেবিনটি নৌযানের দোলা ও ওঠানামার স্বাভাবিক কেন্দ্রের কাছাকাছি থাকে। ফলে সেখানে নড়াচড়া তুলনামূলকভাবে কম অনুভূত হয়। ‘সেরিন’-এ অত্যাধুনিক স্ট্যাবিলাইজার বা দুলুনি নিয়ন্ত্রণের ব্যবস্থাও রয়েছে, যা ইয়টের পাশ থেকে পাশের দোলা কমাতে সহায়তা করে। তবে দীর্ঘ সমুদ্রযাত্রা বা প্রতিকূল আবহাওয়ায় কোনো স্ট্যাবিলাইজারই সব ধরনের নড়াচড়া পুরোপুরি বন্ধ করতে পারে না। সমুদ্রযাত্রায় অসুস্থতাবোধ করেন এমন কারও জন্য নিচের দিকে ও মাঝামাঝি অবস্থানে ঘুমানো তাই তুলনামূলকভাবে কার্যকর হতে পারে।বালিনিজ আবহে শান্ত শয়নকক্ষকেবিনটির নকশায় রয়েছে পরিমিত বিলাসিতা। পেছনের দিকে মুখ করা একটি ডাবল বেড ঘরের মূল আকর্ষণ। এর ওপরের ছাদটি এমনভাবে তৈরি করা হয়েছে, যাতে ঐতিহ্যবাহী বালিনিজ খড়ের ছাদের নিচের অংশের মতো দেখায়।মাটির কাছাকাছি রঙের উপকরণ ও আধুনিক বালিনিজ ধাঁচের সাজসজ্জা পুরো কক্ষটিকে শান্ত একটি সৈকত অবকাশকেন্দ্রের আবহ দিয়েছে। মেঝে থেকে ছাদ পর্যন্ত বিস্তৃত একটি হেডবোর্ড ঘুমানোর জায়গাকে খোলা ধরনের বাথরুম থেকে আলাদা করেছে।কেবিনটির অন্যতম আকর্ষণ হলো বড় একটি শেল দরজা। এটি ভাঁজ করে নামিয়ে দিলে একটি ব্যক্তিগত জলপারের বারান্দায় পরিণত হয়। ইয়ট যখন শান্ত সমুদ্রে নোঙর করা থাকে, তখন ঘুম থেকে উঠে প্রায় সমুদ্রপৃষ্ঠের সমান উচ্চতায় দাঁড়ানোর সুযোগ পাওয়া যায়। তবে ইয়ট চলার সময় বারান্দাটি বন্ধ রাখা হয়।অর্থাৎ এটি মূলত সমুদ্রে চলার সময় আরামে ঘুমানোর জন্য তৈরি একটি ব্যবহারিক শয়নকক্ষ, নিছক বিলাসী অবকাশযাপনের জায়গা নয়।ইয়টটির ডিজাইনার পাসকেল রেমন্ড একসময় কক্ষটিকে ইয়টের অন্যতম আকর্ষণীয় ধারণা হিসেবে বর্ণনা করেছিলেন। তার মতে, এর নকশায় মাটির সঙ্গে এক ধরনের ঘনিষ্ঠতা রয়েছে।কক্ষটির অবস্থানও বেশ সুবিধাজনক। এর ঠিক পাশেই রয়েছে অতিথিদের রান্নাঘর। ফলে রাতে হালকা কিছু খেতে চাইলে আলাদা করে কর্মীদের ডাকতে হয় না কিংবা কয়েক ডেক ওপরে-নিচে যেতে হয় না।কেবিনের পেছনেই অল্প দূরত্বে রয়েছে স্পা ও বিচ ক্লাব। আর একটি ব্যক্তিগত লিফটের মাধ্যমে কক্ষটি সরাসরি পঞ্চম ডেকে থাকা মূল মালিকের স্যুটের সঙ্গে যুক্ত বলে জানা যায়।অর্থাৎ মোহাম্মদ বিন সালমানের জন্য এখানে কার্যত দুটি মাস্টার বেডরুমের ব্যবস্থা রয়েছে। নোঙর করা অবস্থায় আরাম ও চারপাশের দৃশ্য উপভোগের জন্য রয়েছে বিশাল ও খোলামেলা মূল স্যুট। আর ইয়ট সমুদ্রে চলার সময় তুলনামূলক শান্তিতে ঘুমানোর জন্য রয়েছে নিচের এই নিরিবিলি ‘সি কেবিন’।ধারণাটি নতুন নয়, তবে ‘সেরিন’ ব্যতিক্রমইয়টের নিচের দিকে মাঝামাঝি অংশে এ ধরনের ‘সি কেবিন’ রাখার ধারণা একেবারে নতুন নয়। বড় আকারের কয়েকটি ইয়টেই নড়াচড়া কম অনুভব করার জন্য হালের মাঝামাঝি নিচের ডেকগুলোতে এ ধরনের কেবিন রাখা হয়েছে।তবে ‘সেরিন’-কে আলাদা করেছে এর বিস্তৃত বালিনিজ সাজসজ্জা, সরাসরি সমুদ্রের সঙ্গে কক্ষটির সংযোগ এবং মালিকের ব্যক্তিগত স্যুটের সঙ্গে এর সরাসরি যোগাযোগ।ভাসমান প্রাসাদ যেন ‘সেরিন’ইতালির ফিনকান্তিয়েরি নির্মিত ‘সেরিন’ ২০১১ সালে পানিতে নামানো হয়। এটি ইতালিতে নির্মিত বড় ইয়টগুলোর একটি। ইয়টটির দৈর্ঘ্য ৪৩৯ ফুট বা ১৩৪ মিটার এবং প্রস্থ ৬০ দশমিক ৭ ফুট বা ১৮ দশমিক ৫ মিটার।এস্পেন ওইনোর নকশা করা বাইরের অংশে রয়েছে সাতটি বিশাল ডেক। আর রেমন্ড ল্যাংটন ডিজাইন এর ভেতরের অংশ তৈরি করেছে। বিশাল পরিসরের পাশাপাশি ইয়টের ভেতরে তুলনামূলক ছোট ও ব্যক্তিগত আবাসনের ব্যবস্থাও রাখা হয়েছে।আটটি এমটিইউ ৪০০০ সিরিজের ইঞ্জিনে চলে ‘সেরিন’। ইয়টটির স্বাভাবিক চলার গতি প্রায় ১৫ নট এবং সর্বোচ্চ গতি ২০ নট। এতে সর্বোচ্চ ২৪ জন অতিথির থাকার ব্যবস্থা রয়েছে। তাদের জন্য রয়েছে ১২টি কেবিন। আর তাদের সেবা দিতে কাজ করেন ৫২ জন কর্মী। এসব তথ্য চার্টার ওয়ার্ল্ডের প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।হেলিপ্যাড থেকে সাবমেরিন হ্যাঙ্গার‘সেরিন’-এর সুযোগ-সুবিধার তালিকাও বেশ দীর্ঘ। ইয়টে রয়েছে দুটি হেলিকপ্টার অবতরণ ও ওঠানামার জায়গা। এর একটি প্রয়োজন অনুযায়ী সুইমিংপুল কিংবা নাচের মঞ্চে রূপান্তর করা যায়।এতে রয়েছে সাবমেরিন রাখার হ্যাঙ্গার। রয়েছে ‘টোয়েন্টি থাউজ্যান্ড লিগস আন্ডার দ্য সি’ উপন্যাস থেকে অনুপ্রাণিত পানির নিচের ‘নিমো রুম’ও।এ ছাড়া ইয়টে রয়েছে গম্বুজ আকৃতির ফায়ারপ্লেসসহ একটি পর্যবেক্ষণ লাউঞ্জ, সম্মেলনকক্ষ, পিয়ানো লাউঞ্জ, খোলা আকাশের নিচে সিনেমা দেখার ব্যবস্থা, বিচ ক্লাব, বিউটি সেন্টার, হাম্মাম, সনা, স্টিম রুম এবং একাধিক স্পা পুল।সবচেয়ে চমকপ্রদ ব্যবস্থাগুলোর একটি হলো ইয়টের বিখ্যাত ‘স্নো রুম’।ইয়টের ভেতরেই তুষারপাত‘সেরিন’-এর স্নো রুমের তাপমাত্রা প্রায় ১২ ডিগ্রি ফারেনহাইট বা প্রায় মাইনাস ১১ ডিগ্রি সেলসিয়াসে নামিয়ে আনা যায়। সেখানে ছাদ থেকে সত্যিকারের তুষার পড়ার ব্যবস্থা রয়েছে।অতিথিরা চাইলে এই বরফশীতল কক্ষ থেকে সরাসরি সনা, হাম্মাম কিংবা উষ্ণ স্পা পুলে যেতে পারেন। মধ্যপ্রাচ্যের মতো উষ্ণ অঞ্চলে চলাচলকারী একটি ইয়টের জন্য গরম থেকে বাঁচার এটি ব্যতিক্রমী ব্যবস্থা।সব মিলিয়ে ‘সেরিন’-এর বিলাসিতা চোখ ধাঁধানো। তবে ইয়টটির আলোচিত বৈশিষ্ট্যগুলোর একটি হলো এর ‘সি কেবিন’। মালিকের বিশাল ও জাঁকজমকপূর্ণ মূল স্যুটের নিচে থাকা তুলনামূলক ছোট এই বালিনিজ ধাঁচের কক্ষটি দেখায়, বিলাসবহুল নকশায় আরাম ও ব্যবহারিকতার বিষয়টিও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠতে পারে।

বরফের ঘর থেকে সমুদ্রে গোপন কেবিন, সৌদি যুবরাজের বিলাসী ইয়টে আর কী আছে?