ইসরায়েলে ফ্লাইটের নিরাপত্তায় রাজনৈতিক বিতর্ক
ফ্লাইদুবাইয়ের একটি বিমানে সহ-পাইলটের হাতে পাইলট আক্রান্ত হওয়ার ঘটনায় ইসরায়েলের বিমান নিরাপত্তাব্যবস্থা নিয়ে তীব্র রাজনৈতিক বিতর্ক তৈরি হয়েছে। এ ঘটনায় প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু এবং তার ঘনিষ্ঠ সহযোগী হিসেবে পরিচিত পরিবহনমন্ত্রী মিরি রেগেভ রাজনৈতিক চাপের মুখে পড়েছেন। বিরোধী দলগুলোর নেতারা ঘটনাটির দায় নিয়ে রেগেভের পদত্যাগের দাবি তুলেছেন।আগামী ২৭ অক্টোবর ইসরায়েলে নির্বাচন অনুষ্ঠিত হওয়ার কথা রয়েছে। এর কয়েক সপ্তাহ আগে দুবাই থেকে তেল আবিবগামী ফ্লাইদুবাইয়ের একটি বিমানে ওমানের এক সহ-পাইলট কুড়াল দিয়ে পাইলটকে হামলা করার ঘটনায় দেশটির বিমানবন্দরের নিরাপত্তাব্যবস্থা এবং বিদেশি এয়ারলাইনসের ক্রু যাচাইয়ের পদ্ধতি নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন উঠেছে।ইসরায়েলি সংবাদমাধ্যমগুলোর প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, বিদেশি এয়ারলাইনসের নিরাপত্তা যাচাই এবং এসব প্রতিষ্ঠানের পাইলটদের বিষয়ে নজরদারি নিয়ে দেশটির বিভিন্ন নিরাপত্তা সংস্থা দীর্ঘদিন ধরেই উদ্বেগ প্রকাশ করে আসছিল। হামলার ঘটনার পর বিরোধী রাজনীতিকদের প্রধান প্রশ্নগুলোর একটি হলো—ইসরায়েলের সঙ্গে যেসব দেশের আনুষ্ঠানিক কূটনৈতিক সম্পর্ক নেই, সেসব দেশের নাগরিক কীভাবে তেল আবিবগামী বাণিজ্যিক বিমানের পাইলট বা সহ-পাইলট হিসেবে দায়িত্ব পালনের অনুমতি পেলেন।বিদেশি ফ্লাইটের নিরাপত্তা যাচাইয়ের দায়িত্ব নিয়ে ইসরায়েল সরকারের বিভিন্ন সংস্থার মধ্যে দীর্ঘদিন ধরে মতবিরোধ ছিল বলেও দেশটির সংবাদমাধ্যমের প্রতিবেদনে উঠে এসেছে। ‘দ্য টাইমস অব ইসরায়েল’-এর এক প্রতিবেদনের বরাতে জানা যায়, ২০২১ সালে ইসরায়েলের নিরাপত্তা মন্ত্রিসভা বিদেশি ফ্লাইটের নিরাপত্তা যাচাইয়ের দায়িত্ব অভ্যন্তরীণ গোয়েন্দা সংস্থা শিন বেতের কাছ থেকে পরিবহন মন্ত্রণালয়ের অধীন সিভিল এভিয়েশন অথরিটির কাছে হস্তান্তরের সিদ্ধান্ত নেয়।এরপর ২০২৪ সালে একটি গোপন রাষ্ট্রীয় নিরীক্ষা প্রতিবেদনে অভিযোগ করা হয়, পরিবহন মন্ত্রণালয় তাদের ওপর অর্পিত নিরাপত্তা যাচাইয়ের দায়িত্ব যথাযথভাবে পালনে সক্ষম হচ্ছে না। ওই বছরের মে মাসে নিরাপত্তা মন্ত্রিসভা জাতীয় নিরাপত্তা কাউন্সিলকে বিষয়টি পর্যালোচনা করে নতুন কাঠামোর সুপারিশ দেওয়ার জন্য একটি কমিটি গঠনের নির্দেশ দেয়। ওই কমিটিতে পরিবহন মন্ত্রণালয়, সিভিল এভিয়েশন অথরিটি, শিন বেত, মোসাদ এবং অর্থ মন্ত্রণালয়ের প্রতিনিধিদের অন্তর্ভুক্ত করা হয়।তবে শিন বেতের পক্ষ থেকে জানানো হয়, বিদেশি ফ্লাইটের নিরাপত্তা যাচাইয়ের জন্য প্রয়োজনীয় জনবল ও অর্থ তাদের হাতে নেই। পরে জাতীয় নিরাপত্তা কাউন্সিল বিদেশি ফ্লাইটের নিরাপত্তা যাচাইয়ের দায়িত্ব পরিবহন মন্ত্রণালয়ের কাছেই রাখার পক্ষে মত দেয়।প্রতিবেদন অনুযায়ী, ইসরায়েলের পরিবহন মন্ত্রণালয়ের নিরাপত্তা প্রধান এভরি কোহেন এত বড় ধরনের দায়িত্ব পালনের সক্ষমতা নিয়ে আপত্তি জানিয়েছিলেন। কিন্তু পরিবহনমন্ত্রী মিরি রেগেভ তার মন্ত্রণালয়ের অধীনে এই দায়িত্ব নেওয়ার বিষয়ে সম্মতি দেন। পরে ২০২৫ সালে প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুও বিদেশি ফ্লাইটের নিরাপত্তা ব্যবস্থাপনার দায়িত্ব পুরোপুরি পরিবহন মন্ত্রণালয়ের কাছে দেওয়ার নির্দেশ দেন বলে প্রতিবেদনে দাবি করা হয়েছে।তবে এসব অভিযোগ প্রত্যাখ্যান করেছে ইসরায়েলের পরিবহন মন্ত্রণালয়। তাদের বক্তব্য, বিদেশি ফ্লাইটের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার দায়িত্ব কয়েক দশক ধরেই মন্ত্রণালয়ের আওতায় রয়েছে। সাম্প্রতিক সময়ে নতুন করে এই দায়িত্ব পরিবহন মন্ত্রণালয়ের হাতে দেওয়া হয়েছে—এমন দাবি ‘সম্পূর্ণ মিথ্যা’ বলেও মন্ত্রণালয়ের পক্ষ থেকে মন্তব্য করা হয়েছে।এদিকে বিমানে হামলার ঘটনার পর নিরাপত্তাব্যবস্থার সম্ভাব্য ব্যর্থতার দায় নিতে অস্বীকৃতি জানিয়েছেন পরিবহনমন্ত্রী মিরি রেগেভ। ইসরায়েলের সরকারি সম্প্রচারমাধ্যম কানকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে তিনি বলেন, বিদেশি পাইলটদের বিষয়ে নিরাপত্তা যাচাই করার সক্ষমতা পরিবহন মন্ত্রণালয়ের নেই।রেগেভের ভাষ্য, বিমানের ক্রুদের পরিচয় ও নিরাপত্তাসংক্রান্ত বিষয় যাচাই করার দায়িত্ব নিরাপত্তা কর্মকর্তাদের। কোনো ব্যক্তিকে কী মাত্রার হুমকি হিসেবে বিবেচনা করা হবে এবং কোনো নির্দিষ্ট গন্তব্যে একটি ফ্লাইট পরিচালনা করা নিরাপদ কি না—সেটিও নিরাপত্তা কর্মকর্তাদের সিদ্ধান্তের বিষয় বলে দাবি করেন তিনি।তবে রেগেভের এই বক্তব্যের সমালোচনা করেছেন তার সাবেক মন্ত্রণালয় সচিব এবং বর্তমানে বিরোধী দলের প্রার্থী কেরেন টেরনার। তার দাবি, সিভিল এভিয়েশন অথরিটি যেহেতু সরাসরি পরিবহন মন্ত্রণালয়ের অধীনে কাজ করে, তাই বিমান নিরাপত্তাব্যবস্থায় কোনো ব্যর্থতা হয়ে থাকলে এর রাজনৈতিক দায় পরিবহনমন্ত্রী মিরি রেগেভকেই নিতে হবে।বিমানে হামলা চালানো ওমানি সহ-পাইলটকে ঘিরেও নতুন করে প্রশ্ন উঠেছে। ইসরায়েলি সংবাদমাধ্যমের প্রতিবেদনে দাবি করা হয়েছে, সাম্প্রতিক বছরগুলোতে ওমানের কয়েক ডজন পাইলট ফ্লাইদুবাইয়ের বিভিন্ন ফ্লাইটে করে তেল আবিবে গেছেন। অথচ ইসরায়েলের নীতিমালা অনুযায়ী, দেশটির সঙ্গে আনুষ্ঠানিক কূটনৈতিক সম্পর্ক নেই—এমন দেশের পাইলটদের ইসরায়েলগামী ফ্লাইট পরিচালনার অনুমতি থাকার কথা নয়।চ্যানেল ১২-এর এক প্রতিবেদনে দাবি করা হয়েছে, এই নিষেধাজ্ঞা কার্যকর করার ক্ষেত্রে ইসরায়েলের অভ্যন্তরীণ গোয়েন্দা সংস্থা শিন বেতের পক্ষ থেকে গাফিলতি হয়ে থাকতে পারে। ফলে হামলার ঘটনায় শুধু পরিবহন মন্ত্রণালয় নয়, দেশটির নিরাপত্তা সংস্থাগুলোর ভূমিকা নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে।ওমান ২০২০ সালের আব্রাহাম অ্যাকর্ডসে যোগ দেয়নি এবং ইসরায়েলের সঙ্গে দেশটির আনুষ্ঠানিক কূটনৈতিক সম্পর্কও নেই। ইসরায়েলি নীতিমালা অনুযায়ী, যেসব দেশ ইসরায়েলকে আনুষ্ঠানিকভাবে স্বীকৃতি দেয় না, সেসব দেশের পাইলটদের ইসরায়েলগামী ফ্লাইট পরিচালনার অনুমতি দেওয়ার ক্ষেত্রে নিষেধাজ্ঞা রয়েছে বলে দেশটির সংবাদমাধ্যমে উল্লেখ করা হয়েছে।ফলে দুবাই থেকে তেল আবিবগামী একটি বাণিজ্যিক বিমানের ককপিটে ওমানি সহ-পাইলটের উপস্থিতি কীভাবে অনুমোদিত হলো, সেটিই এখন ইসরায়েলের রাজনৈতিক ও নিরাপত্তা মহলে বড় প্রশ্ন হয়ে দাঁড়িয়েছে। একই সঙ্গে বিদেশি এয়ারলাইনসের ক্রু যাচাইয়ের দায়িত্ব কোন সংস্থার হাতে থাকবে এবং নিরাপত্তা ব্যর্থতার ক্ষেত্রে রাজনৈতিক দায় কার—এসব বিষয়ও নতুন করে সামনে এসেছে।নির্বাচনের মাত্র কয়েক সপ্তাহ আগে এমন ঘটনা প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুর সরকারের ওপর রাজনৈতিক চাপ আরও বাড়িয়েছে। বিশেষ করে পরিবহনমন্ত্রী মিরি রেগেভের পদত্যাগের দাবি ওঠায় বিষয়টি এখন শুধু বিমান নিরাপত্তার মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই; এটি ইসরায়েলের অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক বিতর্কেরও গুরুত্বপূর্ণ ইস্যুতে পরিণত হয়েছে।