ওপেনএআইকে টেক্কা দিতে মেটার নতুন এআই ‘মিউজ ওয়ান্ডার’
কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার (এআই) বাজারে ওপেনএআই ও অ্যানথ্রপিকের সঙ্গে প্রতিযোগিতা জোরদার করতে নতুন এআই মডেল ‘মিউজ ওয়ান্ডার’ উন্মোচন করেছে প্রযুক্তিপ্রতিষ্ঠান মেটা। প্রতিষ্ঠানটির প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা মার্ক জাকারবার্গের দাবি, এই মডেল মেটাকে বিশ্বের শীর্ষস্থানীয় এআই প্রযুক্তি নির্মাতাদের কাতারে নিয়ে এসেছে।মঙ্গলবার (১৩ অক্টোবর) ভারতীয় সংবাদমাধ্যম ইন্ডিয়া টুডের এক প্রতিবেদনে এ তথ্য জানানো হয়েছে।সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে নতুন মডেলটির ঘোষণা দেন জাকারবার্গ। তিনি জানান, এর আগে প্রকাশিত ‘মিউজ স্পার্ক’-এর তুলনায় মিউজ ওয়ান্ডার আরও বড় ও উন্নত প্রযুক্তির মডেল পরিবারের অন্তর্ভুক্ত।ফিন্যান্সিয়াল টাইমসকে দেওয়া বক্তব্যে জাকারবার্গ বলেন, নতুন প্রযুক্তির সাহায্যে এআই দিয়ে আরও জটিল কাজ সম্পাদন করা সম্ভব হবে। এর ফলে অত্যাধুনিক এআই সক্ষমতা অর্জনের ক্ষেত্রে মেটা গুরুত্বপূর্ণ অগ্রগতি অর্জন করেছে বলে মনে করেন তিনি।মেটার নিজস্ব পরীক্ষার ফল অনুযায়ী, নির্দিষ্ট কিছু কাজে মিউজ ওয়ান্ডার অ্যানথ্রপিকের ‘অপাস ৫.৫’ এবং ওপেনএআইয়ের ‘জিপিটি-৬ অ্যাস্ট্রা’ মডেলের তুলনায় ভালো ফলাফল দেখিয়েছে। তবে এসব দাবি প্রতিষ্ঠানটির অভ্যন্তরীণ বেঞ্চমার্ক পরীক্ষার ওপর নির্ভরশীল। স্বাধীন পরীক্ষায় একই ফল পাওয়া যাবে কি না, তা এখনো নিশ্চিত নয়।নতুন মডেলটির দুটি সংস্করণ তৈরি করেছে মেটা। এগুলো হলো ‘মিউজ ওয়ান্ডার’ এবং তুলনামূলক শক্তিশালী ‘মিউজ ওয়ান্ডার ফুল’।প্রথম সংস্করণটি প্রতিষ্ঠানটির অর্থের বিনিময়ে ব্যবহারযোগ্য ব্যক্তিগত এআই সহকারী ‘মিউজ’-এ যুক্ত করা হবে। এই সহকারীর মাধ্যমে ব্যবহারকারীরা অনলাইনে কেনাকাটার অর্ডার দেওয়া, ভ্রমণের বুকিং করা এবং বিভিন্ন দৈনন্দিন কাজ সম্পন্ন করার সুবিধা পাবেন।এসব কার্যক্রম পরিচালনার জন্য স্বয়ংক্রিয় এআই এজেন্ট ব্যবহার করা হবে, যা ব্যবহারকারীর নির্দেশনা অনুযায়ী একাধিক ধাপের কাজ সম্পন্ন করতে পারবে।মেটার সুপারইন্টেলিজেন্স ল্যাবসের প্রধান আলেকজান্ডার ওয়াং জানিয়েছেন, মডেলটি তৈরির ক্ষেত্রে ব্যক্তিগত ও পেশাগত জীবনে এআইয়ের ব্যবহার বাড়ানোর বিষয়টিকে অগ্রাধিকার দেওয়া হয়েছে।তাঁর মতে, অন্যান্য প্রযুক্তিপ্রতিষ্ঠান যেখানে মূলত সফটওয়্যার কোড তৈরিতে সহায়ক এআই এজেন্ট উন্নয়নে গুরুত্ব দিচ্ছে, সেখানে মেটা সাধারণ মানুষের দৈনন্দিন প্রয়োজন পূরণে আরও বিস্তৃত সুবিধা দিতে আগ্রহী।মিউজ ওয়ান্ডারের অন্যতম বৈশিষ্ট্য ‘অ্যাকটিভ মেমোরি’। এই প্রযুক্তির মাধ্যমে এআই আগের দিন, সপ্তাহ কিংবা মাসের প্রয়োজনীয় তথ্য মনে রেখে পরবর্তী কাজে ব্যবহার করতে পারবে।এ ছাড়া কোনো নির্দিষ্ট পদ্ধতিতে কাজ সম্পন্ন করা সম্ভব না হলে বিকল্প উপায়ে সমস্যা সমাধানের চেষ্টা করতে পারবে মডেলটি।নতুন প্রযুক্তি তৈরিতে বড় অঙ্কের বিনিয়োগ করেছে মেটা। জাকারবার্গ জানিয়েছেন, মিউজ ওয়ান্ডারের উন্নয়নে বিপুল কম্পিউটিং সক্ষমতা, দীর্ঘ গবেষণা এবং উল্লেখযোগ্য আর্থিক ব্যয়ের প্রয়োজন হয়েছে।গত বছর এআই প্রযুক্তিতে নিজেদের সক্ষমতা বাড়াতে স্কেল এআইতে ১৪ বিলিয়ন মার্কিন ডলার বিনিয়োগ করে প্রতিষ্ঠানটি। একই সঙ্গে স্কেল এআইয়ের সহপ্রতিষ্ঠাতা আলেকজান্ডার ওয়াংকে মেটার এআই কার্যক্রম পরিচালনার দায়িত্ব দেওয়া হয়।প্রতিষ্ঠানটির তথ্য অনুযায়ী, মিউজ ওয়ান্ডার বর্তমানে মেটা মডেল এপিআই এবং মিউজ কোডের মাধ্যমে ব্যবহার করা যাচ্ছে। সাধারণ ব্যবহারের ক্ষেত্রে প্রতি ১০ লাখ টোকেনের মূল্য ২০ সেন্ট থেকে শুরু। অন্যদিকে, উন্নত সংস্করণ মিউজ ওয়ান্ডার ফুল ব্যবহারে মাসিক ব্যয় সর্বোচ্চ ২০০ ডলার হতে পারে।তবে নতুন মডেল চালুর পর মেটার কোড সাবস্ক্রিপশনে ব্যবহারের সীমা হিসাব করার ক্ষেত্রে একটি প্রযুক্তিগত সমস্যা দেখা দিয়েছে। বিষয়টি সমাধানে কাজ চলছে বলে জানিয়েছেন আলেকজান্ডার ওয়াং।এদিকে নতুন মডেল প্রকাশের মাধ্যমে এআই প্রযুক্তি ব্যবহারের নীতিতেও পরিবর্তন এনেছে মেটা। আগে প্রতিষ্ঠানটি উন্মুক্ত মডেল তৈরিতে গুরুত্ব দিলেও মিউজ ওয়ান্ডার সীমিত প্রবেশাধিকারভিত্তিক বা ক্লোজড মডেল হিসেবে পরিচালিত হবে।বিশেষ করে এর সবচেয়ে উন্নত সংস্করণগুলো সরাসরি বিভিন্ন ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানের কাছে বিক্রির পরিকল্পনা রয়েছে।জাকারবার্গ জানিয়েছেন, মিউজ ওয়ান্ডারের আরও উন্নত সংস্করণ তৈরির কাজ ইতোমধ্যে শুরু হয়েছে। আগামী দিনে এসব মডেলের সক্ষমতা আরও দ্রুত বাড়বে বলে আশা করছেন তিনি।অন্যদিকে এআই খাতে বিনিয়োগ বৃদ্ধির পাশাপাশি পরিচালন ব্যয় কমানোর উদ্যোগও নিয়েছে মেটা। চলতি বছরের মে মাসে প্রতিষ্ঠানটি মোট কর্মীর প্রায় ১০ শতাংশ, অর্থাৎ আনুমানিক আট হাজার কর্মী ছাঁটাই করে।এ ছাড়া এআই প্রশিক্ষণের উদ্দেশ্যে কর্মীদের মাউস ব্যবহারের গতিবিধি এবং কিবোর্ডে টাইপ করার তথ্য সংগ্রহের পরিকল্পনা নিয়ে সমালোচনার মুখে পড়ে প্রতিষ্ঠানটি। পরে ওই পরিকল্পনা বাতিল করা হয়।নতুন মডেলটি মেটার এআই ব্যবসায় কতটা প্রভাব ফেলবে এবং ওপেনএআই ও অ্যানথ্রপিকের সঙ্গে প্রতিযোগিতায় কতটা সফল হবে, তা নির্ভর করবে বাস্তব ব্যবহারে এর কার্যকারিতা ও নির্ভরযোগ্যতার ওপর।সূত্র : ইন্ডিয়া টুডে