নিয়মিত বই পড়লে মস্তিষ্ক ও মানসিক স্বাস্থ্যে মিলতে পারে বড় উপকার
শুধু জ্ঞান অর্জন নয়, নিয়মিত বই পড়ার অভ্যাস মস্তিষ্ক ও মানসিক স্বাস্থ্যের জন্যও উপকারী হতে পারে। সাম্প্রতিক বিভিন্ন গবেষণা ও পর্যালোচনায় দেখা গেছে, আনন্দের জন্য নিয়মিত পড়ার সঙ্গে উন্নত স্মৃতিশক্তি, মনোযোগ, মানসিক সুস্থতা এবং বয়স বাড়ার সঙ্গে জ্ঞানীয় সক্ষমতা ধরে রাখার সম্পর্ক রয়েছে।কেমব্রিজ বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক বারবারা সাহাকিয়ান ও তাঁর সহকর্মীরা বই পড়া, মস্তিষ্কের স্বাস্থ্য, কগনিশন ও মানসিক সুস্থতা নিয়ে বিভিন্ন গবেষণার ফল পর্যালোচনা করেছেন। তাঁদের মতে, পড়ার অভ্যাসকে ছোটবেলা থেকেই উৎসাহিত করা হলে তা দীর্ঘমেয়াদে মস্তিষ্কের বিকাশ ও মানসিক স্বাস্থ্যে ইতিবাচক ভূমিকা রাখতে পারে।এর আগে ১০ হাজারের বেশি কিশোর-কিশোরীকে নিয়ে পরিচালিত একটি বড় গবেষণায় দেখা যায়, যারা শৈশব থেকেই আনন্দের জন্য বই পড়ত, তাদের স্মৃতি, ভাষা, মনোযোগ ও সমস্যা সমাধানের দক্ষতা তুলনামূলকভাবে ভালো ছিল। একই সঙ্গে তাদের মানসিক চাপ ও আচরণগত সমস্যার লক্ষণও তুলনামূলকভাবে কম পাওয়া গেছে।মস্তিষ্কের স্ক্যান বিশ্লেষণেও কিছু পার্থক্য পাওয়া গেছে। ছোটবেলা থেকে নিয়মিত পড়ার অভ্যাস থাকা শিশুদের ভাষা, শেখা, মনোযোগ ও আবেগ নিয়ন্ত্রণের সঙ্গে সম্পর্কিত মস্তিষ্কের কিছু অঞ্চলের আয়তন তুলনামূলকভাবে বেশি ছিল। তবে গবেষকেরা সতর্ক করেছেন, এসব ফলের বড় অংশই সম্পর্ক নির্দেশ করে, সব ক্ষেত্রেই সরাসরি কারণ প্রমাণ করে না।পড়ার উপকার শুধু শিশু-কিশোরদের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়। বয়স্কদের ক্ষেত্রেও নিয়মিত বই, পত্রিকা বা ম্যাগাজিন পড়ার মতো মানসিকভাবে সক্রিয় কার্যক্রমের সঙ্গে ধীরগতির কগনিটিভ অবক্ষয় এবং ডিমেনশিয়ার কম ঝুঁকির সম্পর্ক পাওয়া গেছে। সামাজিকভাবে একসঙ্গে পড়া বা বই নিয়ে আলোচনা করাও একাকিত্ব কমাতে সহায়তা করতে পারে।গবেষকেরা আরও বলছেন, বই পড়া মানসিক চাপ কমাতে এবং মনোযোগ ধরে রাখতে সহায়তা করতে পারে। বিশেষ করে কল্পকাহিনি পড়ার সময় একজন পাঠক বিভিন্ন চরিত্র, পরিস্থিতি ও আবেগের ভেতর দিয়ে মানসিকভাবে ভ্রমণ করেন। এতে সহমর্মিতা ও অন্যের দৃষ্টিভঙ্গি বোঝার ক্ষমতা বাড়তে পারে।নেদারল্যান্ডসের ম্যাক্স প্ল্যাঙ্ক ইনস্টিটিউট ফর সাইকোলিঙ্গুইস্টিকসের গবেষক ফাল্ক হুয়েটিগ দীর্ঘদিন ধরে পড়ার প্রভাব নিয়ে গবেষণা করছেন। তাঁর মতে, পড়ার সময় স্মৃতি, মনোযোগ, ভাষা, দৃষ্টিশক্তি ও যুক্তিবোধের মতো একাধিক কগনিটিভ প্রক্রিয়া একসঙ্গে সক্রিয় থাকে। ফলে নিয়মিত পড়া এসব দক্ষতার অনুশীলন হিসেবে কাজ করতে পারে।তবে গবেষকদের জোর মূলত আনন্দের জন্য পড়ার ওপর। বাধ্যতামূলক বা অনিচ্ছাকৃত পড়ার চেয়ে যে ধরনের বই একজন মানুষ উপভোগ করেন, তা নিয়মিত ও দীর্ঘ সময় পড়ার অভ্যাস তৈরি করতে বেশি সহায়ক হতে পারে।ডিজিটাল প্ল্যাটফর্ম, স্বল্পদৈর্ঘ্যের ভিডিও এবং সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে সময় বেড়ে যাওয়ায় দীর্ঘ সময় মনোযোগ দিয়ে পড়ার অভ্যাস কমে যাচ্ছে বলে উদ্বেগ রয়েছে। বিশেষজ্ঞদের মতে, প্রতিদিন কিছু সময় বই পড়ার জন্য আলাদা রাখা মস্তিষ্কের সক্রিয়তা ও মানসিক প্রশান্তি ধরে রাখার একটি সহজ অভ্যাস হতে পারে।তবে বই পড়াকে কোনো রোগের চিকিৎসার বিকল্প হিসেবে দেখা উচিত নয়। বরং এটি ঘুম, ব্যায়াম, সামাজিক যোগাযোগ ও স্বাস্থ্যকর জীবনযাপনের পাশাপাশি মস্তিষ্ক ও মানসিক স্বাস্থ্যের সহায়ক একটি অভ্যাস।