দুই হাসপাতালে অনিয়ম দেখে ক্ষুব্ধ স্বাস্থ্যমন্ত্রী, দুই নার্সকে বদলির নির্দেশ
মাদারীপুরের দুটি সরকারি হাসপাতালে আকস্মিক পরিদর্শনে গিয়ে চিকিৎসাসেবায় নানা অনিয়ম ও অব্যবস্থাপনার অভিযোগ পেয়েছেন স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণমন্ত্রী সরদার মো. সাখাওয়াত হোসেন বকুল। প্রয়োজনীয় ওষুধ ও স্যালাইন মজুত থাকার পরও রোগীদের বাইরে থেকে কিনে আনতে বলার অভিযোগে ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন তিনি। একই সঙ্গে দায়িত্বে অবহেলার অভিযোগে দুই নার্সকে বদলি এবং কয়েকজন চিকিৎসকের বিরুদ্ধে বিভাগীয় ব্যবস্থা নেওয়ার নির্দেশ দিয়েছেন।মঙ্গলবার (৩ নভেম্বর) সকালে কালকিনি উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স পরিদর্শনের মধ্য দিয়ে দিনের কর্মসূচি শুরু করেন স্বাস্থ্যমন্ত্রী। পরে আশপাশের কয়েকটি বেসরকারি ক্লিনিক ও ডায়াগনস্টিক সেন্টার ঘুরে দেখেন। দুপুরে যান মাদারীপুর ২৫০ শয্যা জেলা হাসপাতালে।কালকিনি উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে পরিদর্শনের সময় বিভিন্ন ওয়ার্ড ঘুরে দেখেন স্বাস্থ্যমন্ত্রী। ভর্তি রোগীদের সঙ্গে কথা বলে চিকিৎসার মান, ওষুধের প্রাপ্যতা এবং চিকিৎসক-নার্সদের উপস্থিতির বিষয়ে খোঁজ নেন।এ সময় নির্ধারিত সময়ে উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তাকে কর্মস্থলে না পেয়ে অপেক্ষা করেন তিনি। কয়েকজন চিকিৎসকের দেরিতে উপস্থিত হওয়ার বিষয়টিও তাঁর নজরে আসে।দায়িত্বে অবহেলার অভিযোগে দুই নার্সকে অন্যত্র বদলির নির্দেশ দেন স্বাস্থ্যমন্ত্রী। পাশাপাশি উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা এবং সংশ্লিষ্ট চিকিৎসকদের বিরুদ্ধে বিধি অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়ার কথা জানান।হাসপাতালের অপরিচ্ছন্নতা, জনবলসংকট এবং চিকিৎসাসেবার বিভিন্ন ঘাটতি নিয়েও অসন্তোষ প্রকাশ করেন তিনি।দুপুরে মাদারীপুর ২৫০ শয্যা জেলা হাসপাতাল পরিদর্শন করতে গিয়ে আরও কিছু অনিয়মের অভিযোগ পান স্বাস্থ্যমন্ত্রী।হাসপাতালের বিভিন্ন স্থানে ময়লা-আবর্জনা, সংস্কার ও মেরামতের অভাব এবং রোগীদের সেবায় ঘাটতি দেখে ক্ষোভ প্রকাশ করেন তিনি।এ সময় ওষুধ ও স্যালাইন সরবরাহের বিষয়টি গুরুত্ব দিয়ে খতিয়ে দেখেন মন্ত্রী।তাঁর অভিযোগ, হাসপাতালের মজুতে প্রয়োজনীয় ওষুধ ও স্যালাইন থাকা সত্ত্বেও রোগীদের সেগুলো দেওয়া হচ্ছে না। বরং বাইরে থেকে কিনে আনতে বলা হচ্ছে।পরিদর্শনকালে এমন পরিস্থিতি দেখতে পেয়েছেন জানিয়ে তিনি বলেন, এসব অনিয়মের সঙ্গে জড়িতদের বিরুদ্ধে ঢাকায় ফিরে বিভাগীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে।হাসপাতালের বর্তমান পরিস্থিতির জন্য বিগত সরকারের সময়কার দুর্নীতিকে দায়ী করেন স্বাস্থ্যমন্ত্রী।তাঁর অভিযোগ, গত ১৭ বছরে স্বাস্থ্য খাতসহ বিভিন্ন মন্ত্রণালয়ের বরাদ্দ থেকে বিপুল অর্থ লুটপাট ও বিদেশে পাচার করা হয়েছে। ফলে সরকারি হাসপাতালগুলোতে পর্যাপ্ত জনবল, ওষুধ, ভ্যাকসিন ও প্রয়োজনীয় সরঞ্জামের সংকট তৈরি হয়েছে।তিনি বলেন, কোথাও চিকিৎসাযন্ত্র কেনা হলেও তা পরিচালনার জন্য প্রয়োজনীয় জনবল নেই। আবার কোথাও জনবল থাকলেও পর্যাপ্ত যন্ত্রপাতি নেই।এসব সমস্যা সমাধান করে সরকারি হাসপাতালের চিকিৎসাসেবার মান উন্নয়নে সরকার কাজ করছে বলে জানান তিনি।স্বাস্থ্য খাতের উন্নয়নে সরকারের পরিকল্পনার কথাও তুলে ধরেন সরদার মো. সাখাওয়াত হোসেন বকুল।তিনি জানান, প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের নির্দেশনায় দেশের উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সগুলোর শয্যাসংখ্যা বাড়ানোর উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।তাঁর বক্তব্য অনুযায়ী, প্রতিটি উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সকে ১৫১ শয্যায় উন্নীত করার পরিকল্পনা রয়েছে।পাশাপাশি প্রতিটি ইউনিয়নে একটি করে হেলথ সেন্টার স্থাপনের পরিকল্পনার কথা জানান তিনি। এসব কেন্দ্রে একজন করে চিকিৎসক রাখার লক্ষ্য রয়েছে সরকারের।এর মাধ্যমে সাধারণ মানুষকে নিজ নিজ এলাকায় প্রয়োজনীয় চিকিৎসাসেবা দেওয়ার পরিকল্পনা করা হয়েছে বলে জানান স্বাস্থ্যমন্ত্রী।কালকিনিতে কয়েকটি বেসরকারি ক্লিনিক ও ডায়াগনস্টিক সেন্টার পরিদর্শনের পর স্বাস্থ্যমন্ত্রী জানান, সরকারি হাসপাতালের এক কিলোমিটারের মধ্যে নতুন কোনো বেসরকারি ক্লিনিকের অনুমোদন দেওয়া হচ্ছে না।তাঁর দাবি, বর্তমানে হাসপাতালের আশপাশে থাকা অনেক বেসরকারি ক্লিনিক ও ডায়াগনস্টিক সেন্টার আগের সরকারের সময়ে অনুমোদন পেয়েছিল।এসব প্রতিষ্ঠানের বৈধ কাগজপত্র, অনুমোদন ও কার্যক্রম যাচাই করা হচ্ছে বলে জানান তিনি।জেলা প্রশাসন ও সিভিল সার্জনের নেতৃত্বে পরিদর্শন চালানো হচ্ছে। কোনো প্রতিষ্ঠানে অনিয়ম পাওয়া গেলে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে।তবে একসঙ্গে সব প্রতিষ্ঠান বন্ধ না করে পর্যায়ক্রমে ব্যবস্থা নেওয়ার কথা জানিয়েছেন স্বাস্থ্যমন্ত্রী।মাদারীপুর জেলা হাসপাতাল পরিদর্শনকালে স্বাস্থ্যমন্ত্রীর সঙ্গে ছিলেন মাদারীপুর-২ আসনের সংসদ সদস্য জাহান্দার আলী জাহান, জেলা প্রশাসক মর্জিনা আক্তার, পুলিশ সুপার ফজলে এলাহী, জেলা সিভিল সার্জন ডা. মোছা. মাহফুজা খাতুন, হাসপাতালের আবাসিক মেডিকেল কর্মকর্তা ডা. অখিল সরকার এবং জেলা পরিবার পরিকল্পনা কার্যালয়ের উপপরিচালক মতিউর রহমান।এ ছাড়া বিভিন্ন সরকারি দপ্তরের কর্মকর্তা ও রাজনৈতিক নেতারা উপস্থিত ছিলেন।