এক বছর ধরে বন্ধ মাদারগঞ্জ সৌরবিদ্যুৎ প্রকল্পের কাজ
জামালপুরের মাদারগঞ্জে নির্মাণাধীন ১০০ মেগাওয়াট সৌরবিদ্যুৎ প্রকল্পের ভবিষ্যৎ নিয়ে অনিশ্চয়তা দেখা দিয়েছে। প্রায় ৬০ শতাংশ কাজ শেষ হলেও ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের বিপুল অঙ্কের বিল বকেয়া থাকায় গত বছরের নভেম্বর থেকে নির্মাণকাজ বন্ধ রয়েছে। এর মধ্যে সংশোধিত প্রকল্প থেকে প্রায় ২০০ কোটি টাকার কাজ বাদ দেওয়ায় নতুন জটিলতা তৈরি হয়েছে।প্রকল্পটির ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান ভারতীয় আমারা রাজা ইনফ্রা প্রাইভেট লিমিটেডের (এআরআইপিএল) দাবি, বাস্তবায়নকারী সংস্থা রুরাল পাওয়ার কোম্পানি লিমিটেডের (আরপিসিএল) কাছে তাদের প্রায় ২১২ কোটি টাকা পাওনা রয়েছে। দীর্ঘদিন বিল পরিশোধ না হওয়ায় প্রতিষ্ঠানটির আর্থিক সংকট বেড়েছে এবং নির্মাণকাজ এগিয়ে নেওয়া সম্ভব হচ্ছে না।জামালপুরের মাদারগঞ্জ উপজেলার কাইজার চর এলাকায় ৩১৬ দশমিক ৬৫ একর জমিতে ২০২১ সালে প্রকল্পটির বাস্তবায়ন শুরু হয়।দেশে নবায়নযোগ্য উৎস থেকে বিদ্যুৎ উৎপাদন বাড়ানোর লক্ষ্যে নেওয়া ১০০ মেগাওয়াট ক্ষমতার এই সৌরবিদ্যুৎ প্রকল্পের কাজ বর্তমানে বন্ধ রয়েছে।ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের সহকারী ব্যবস্থাপক শাহিনুর ইসলাম বলেন, ‘আরপিসিএলের কাছে গত বছরের নভেম্বর থেকে আমাদের প্রায় ২১২ কোটি টাকার বিল বকেয়া রয়েছে।’ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানটির অভিযোগ, দীর্ঘ সময় ধরে অর্থ আটকে থাকায় প্রকল্পের বাকি কাজ সম্পন্ন করা কঠিন হয়ে পড়েছে।প্রকল্পে আর্থিক সংকটের পাশাপাশি কারিগরি প্রক্রিয়া নিয়েও জটিলতা রয়েছে।ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫ সালের ১৮ জুলাই ৫০ মেগাওয়াট ক্ষমতার সৌর মডিউল প্রকল্প এলাকায় পৌঁছায়। কিন্তু আরপিসিএল এখনো এসব সরঞ্জামের পোস্ট ল্যান্ডিং ইনস্পেকশন সম্পন্ন করেনি।এর ফলে মডিউলগুলো স্থাপনের কাজ আটকে রয়েছে। একই সঙ্গে প্রায় ২৫ কোটি টাকার অতিরিক্ত বিলসংক্রান্ত প্রক্রিয়াও সম্পন্ন করা যাচ্ছে না বলে অভিযোগ সংশ্লিষ্টদের।গত ১৯ আগস্ট জাতীয় অর্থনৈতিক পরিষদের নির্বাহী কমিটির (একনেক) সভায় প্রকল্পটির সংশোধিত উন্নয়ন প্রকল্প প্রস্তাব অনুমোদন দেওয়া হয়।সংশোধনের মাধ্যমে প্রকল্পের ব্যয় কমানোর পাশাপাশি মূল পরিকল্পনা থেকে প্রায় ২০০ কোটি টাকার কাজ বাদ দেওয়া হয়েছে।ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান এআরআইপিএলের অভিযোগ, প্রকল্পের প্রায় ৬০ শতাংশ কাজ শেষ হওয়ার পর সুইজারল্যান্ডভিত্তিক পরামর্শক প্রতিষ্ঠান এএফআরওয়াই এবং ঠিকাদারের সঙ্গে আলোচনা ছাড়াই গুরুত্বপূর্ণ কয়েকটি কাজ বাদ দেওয়ার উদ্যোগ নেওয়া হয়।সংশোধিত প্রকল্প অনুযায়ী, মোট ব্যয় দাঁড়িয়েছে ১ হাজার ৬১২ কোটি টাকা।ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের কর্মকর্তা রুস্তম আলী বলেন, ‘প্রকল্পব্যয় কমানোয় বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ কাজ বাদ পড়বে। মডিউল পরিষ্কারের ব্যবস্থা, বিভিন্ন বৈদ্যুতিক সরঞ্জাম এবং পরিচালনা ও রক্ষণাবেক্ষণ সংশ্লিষ্ট কাজ বাদ পড়লে প্রকল্পের দীর্ঘমেয়াদি কর্ম ও উৎপাদনদক্ষতা ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে।’তাঁদের আশঙ্কা, প্রয়োজনীয় সরঞ্জাম ও রক্ষণাবেক্ষণসংক্রান্ত ব্যবস্থা বাদ দেওয়া হলে প্রকল্প চালু হওয়ার পর বিদ্যুৎ উৎপাদনের দক্ষতা এবং দীর্ঘমেয়াদি কার্যক্রমে নেতিবাচক প্রভাব পড়তে পারে।তবে এসব সম্ভাব্য প্রভাব সম্পর্কে আরপিসিএলের আনুষ্ঠানিক কারিগরি মূল্যায়ন পাওয়া যায়নি।প্রকল্পের বাস্তবায়ন পরিস্থিতি পর্যালোচনা করতে ১৬ অক্টোবর আরপিসিএলের পরিচালনা পর্ষদের একটি কমিটি নির্মাণ এলাকা পরিদর্শন করে।পরিদর্শনকালে কমিটির সদস্য শাহিদুল ইসলামের কাছে নকশা পরিবর্তন, সরঞ্জামের পরিদর্শন প্রক্রিয়া সম্পন্ন না হওয়া, ঠিকাদারের বকেয়া বিল এবং দীর্ঘদিন নির্মাণকাজ বন্ধ থাকার কারণ জানতে চান সাংবাদিকেরা।তবে এসব বিষয়ে তিনি সুনির্দিষ্ট কোনো ব্যাখ্যা দেননি।এর আগে ১ অক্টোবর বিদ্যুৎ বিভাগের অতিরিক্ত সচিব নূর আহমেদ ও উপসচিব আহসান সাদী প্রকল্প এলাকা পরিদর্শন করেন। এ সময় তাঁরা দ্রুত নির্মাণকাজ পুনরায় শুরুর ওপর গুরুত্ব দেন।অন্যদিকে প্রকল্পটির বর্তমান পরিচালক জাহাঙ্গীর মজুমদারের কাছে বকেয়া বিল, সংশোধিত পরিকল্পনায় কাজ বাদ দেওয়া এবং বাস্তবায়নে বিলম্বের বিষয়ে জানতে চাওয়া হলে তিনি মন্তব্য করতে রাজি হননি।সংশোধিত প্রকল্প অনুমোদন এবং সরকারি কর্মকর্তাদের পরিদর্শনের পরও নির্মাণকাজ পুনরায় শুরুর সুনির্দিষ্ট সময়সূচি জানা যায়নি।ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের দাবি অনুযায়ী, বকেয়া বিল পরিশোধের পাশাপাশি বাদ দেওয়া কাজগুলোর বিষয়ে সিদ্ধান্ত এবং অবশিষ্ট নির্মাণকাজ সম্পন্ন করার সুস্পষ্ট পরিকল্পনা প্রয়োজন।এসব বিষয়ে সমাধান না এলে ১০০ মেগাওয়াট সৌরবিদ্যুৎ প্রকল্পটির বাস্তবায়ন আরও বিলম্বিত হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।সূত্র : দ্য ডেইলি স্টার।