হরমুজ প্রণালির নিয়ন্ত্রণ নিয়ে লড়াই: বিশ্ব অর্থনীতির ঝুঁকিতে বাংলাদেশ কতটা?
মধ্যপ্রাচ্যের ভূরাজনৈতিক উত্তেজনা এখন আর কেবল আঞ্চলিক নিরাপত্তার বিষয় নয়; এর প্রভাব ছড়িয়ে পড়েছে বিশ্ব অর্থনীতি, আন্তর্জাতিক বাণিজ্য এবং জ্বালানি সরবরাহ ব্যবস্থায়। এই উত্তেজনার কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছে পারস্য উপসাগর ও ওমান উপসাগরকে সংযুক্তকারী কৌশলগত জলপথ হরমুজ প্রণালি। বিশ্বের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ এই সামুদ্রিক রুট ঘিরে ইরান, যুক্তরাষ্ট্র ও তাদের আঞ্চলিক মিত্রদের সংঘাত আন্তর্জাতিক জ্বালানি বাজারকে নতুন অনিশ্চয়তার মুখে ঠেলে দিয়েছে। এর প্রভাব থেকে বাদ পড়ার সুযোগ নেই বাংলাদেশসহ জ্বালানি আমদানিনির্ভর দেশগুলোরও।১ নভেম্বর ২০২৬ পর্যন্ত পাওয়া তথ্য অনুযায়ী, ইরান ও কাতারের মধ্যস্থতাকারীদের মধ্যে যুদ্ধ অবসানের লক্ষ্যে তৃতীয় দিনের মতো আলোচনা চলছে। কূটনৈতিক তৎপরতা অব্যাহত থাকলেও এখনো কোনো চূড়ান্ত সমঝোতায় পৌঁছানো সম্ভব হয়নি। ফলে হরমুজ প্রণালি দিয়ে আন্তর্জাতিক জাহাজ চলাচল স্বাভাবিক হওয়ার বিষয়টি এখনো অনিশ্চিত। (সূত্র: Reuters, ১ নভেম্বর ২০২৬)কেন এত গুরুত্বপূর্ণ হরমুজ প্রণালি?ভৌগোলিক আয়তনে খুব বড় না হলেও বৈশ্বিক জ্বালানি বাণিজ্যে হরমুজ প্রণালির গুরুত্ব অসাধারণ। ইরান ও ওমানের মধ্যবর্তী এই জলপথ পারস্য উপসাগরকে ওমান উপসাগর এবং আরব সাগরের সঙ্গে যুক্ত করেছে। এর সবচেয়ে সংকীর্ণ অংশের প্রস্থ প্রায় ৩৯ কিলোমিটার। কিন্তু এই সীমিত জলপথ দিয়েই বিশ্বের বিপুল পরিমাণ অপরিশোধিত তেল, পরিশোধিত জ্বালানি এবং তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস (এলএনজি) পরিবহন করা হয়।আন্তর্জাতিক জ্বালানি সংস্থা (IEA)-এর ২০২৬ সালের ফেব্রুয়ারিতে হালনাগাদ করা তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫ সালে প্রতিদিন গড়ে প্রায় ২ কোটি ব্যারেল অপরিশোধিত তেল ও পরিশোধিত পেট্রোলিয়াম পণ্য এই প্রণালি দিয়ে পরিবাহিত হয়েছে। যা বিশ্বের সমুদ্রপথে বাণিজ্য হওয়া মোট তেলের প্রায় ২৫ শতাংশ। এসব জ্বালানির প্রায় ৮০ শতাংশের গন্তব্য এশিয়ার বিভিন্ন দেশ।শুধু তেল নয়, কাতার ও সংযুক্ত আরব আমিরাতের এলএনজি রপ্তানির বড় অংশও এই পথের ওপর নির্ভরশীল। ২০২৫ সালে বিশ্বের মোট এলএনজি বাণিজ্যের প্রায় এক-পঞ্চমাংশ হরমুজ প্রণালি দিয়ে পরিবাহিত হয়েছে। অর্থাৎ এই জলপথে দীর্ঘস্থায়ী অচলাবস্থা তৈরি হলে তার প্রভাব সরাসরি বিশ্ব জ্বালানি বাজারে পড়বে।সংঘাতের পেছনে ভূরাজনৈতিক সমীকরণহরমুজ প্রণালিকে ঘিরে বর্তমান সংকটকে শুধু একটি সামুদ্রিক পথের নিয়ন্ত্রণ নিয়ে বিরোধ হিসেবে দেখলে পুরো পরিস্থিতি বোঝা যাবে না। এর সঙ্গে জড়িয়ে রয়েছে মধ্যপ্রাচ্যের ক্ষমতার ভারসাম্য, ইরানের নিরাপত্তা ও কৌশলগত অবস্থান, যুক্তরাষ্ট্রের আঞ্চলিক স্বার্থ এবং ইসরায়েলের নিরাপত্তা-সংক্রান্ত উদ্বেগ।ইরান দীর্ঘদিন ধরে হরমুজ প্রণালিকে তার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ কৌশলগত অবস্থান হিসেবে বিবেচনা করে আসছে। অন্যদিকে যুক্তরাষ্ট্র ও তার মিত্রদের কাছে এই জলপথের অবাধ চলাচল নিশ্চিত করা আন্তর্জাতিক বাণিজ্য ও জ্বালানি নিরাপত্তার গুরুত্বপূর্ণ অংশ।চলমান সংঘাতের ফলে সামরিক উত্তেজনার পাশাপাশি কূটনৈতিক আলোচনাও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। ১ নভেম্বর রয়টার্সের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, দোহায় ইরানি প্রতিনিধিদের সঙ্গে কাতারের মধ্যস্থতাকারীদের আলোচনা অব্যাহত রয়েছে। সম্ভাব্য সমঝোতার অংশ হিসেবে হরমুজ প্রণালি পুনরায় খুলে দেওয়ার বিষয়টিও আলোচনায় রয়েছে। তবে আলোচনা চলমান থাকলেও চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত না আসায় পরিস্থিতি এখনো অনিশ্চিত।বিশ্ব অর্থনীতিতে কী ধরনের প্রভাব পড়তে পারে?জ্বালানি সরবরাহে বিঘ্ন ঘটলে তার প্রভাব শুধু তেলের বাজারে সীমাবদ্ধ থাকে না। আধুনিক অর্থনীতির প্রায় প্রতিটি গুরুত্বপূর্ণ খাতের সঙ্গে জ্বালানির সরাসরি সম্পর্ক রয়েছে। পরিবহন, শিল্প উৎপাদন, বিদ্যুৎ, কৃষি এবং আন্তর্জাতিক পণ্য সরবরাহ—সব ক্ষেত্রেই জ্বালানির প্রয়োজন।হরমুজ প্রণালি দিয়ে জাহাজ চলাচল বাধাগ্রস্ত হলে আন্তর্জাতিক বাজারে অপরিশোধিত তেল ও এলএনজির সরবরাহ কমে যাওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়। এতে তেলের দাম ও পরিবহন ব্যয় বাড়তে পারে। একই সঙ্গে জাহাজের বীমা খরচ বৃদ্ধি, বিকল্প পথে পণ্য পরিবহন এবং সরবরাহে বিলম্বের কারণে আমদানিনির্ভর দেশগুলোর ওপর অতিরিক্ত অর্থনৈতিক চাপ তৈরি হতে পারে।যুক্তরাষ্ট্রের জ্বালানি তথ্য প্রশাসন (EIA) জানিয়েছে, সৌদি আরব ও সংযুক্ত আরব আমিরাতের কিছু বিকল্প পাইপলাইন থাকলেও সেগুলোর মাধ্যমে হরমুজ প্রণালির সম্পূর্ণ তেল পরিবহনের বিকল্প তৈরি করা সম্ভব নয়। ফলে দীর্ঘস্থায়ী সংকটের ক্ষেত্রে বিশ্ববাজারে সরবরাহের ঘাটতি ও মূল্য অস্থিরতা বাড়ার ঝুঁকি রয়েছে।বাংলাদেশের জন্য কেন বাড়তি উদ্বেগ?বাংলাদেশের মতো জ্বালানি আমদানিনির্ভর অর্থনীতির জন্য হরমুজ প্রণালির সংকট বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ। দেশের বিদ্যুৎ উৎপাদন, শিল্পকারখানা, পরিবহন এবং কৃষি খাতের বড় একটি অংশ প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে আমদানি করা জ্বালানির ওপর নির্ভরশীল।বাংলাদেশ ব্যাংকের ২০২৬ সালের একটি গবেষণা প্রতিবেদনে হরমুজ প্রণালির অচলাবস্থার কারণে দেশের জ্বালানি আমদানি, সরবরাহব্যবস্থা এবং বাণিজ্যিক কার্যক্রমে সম্ভাব্য ঝুঁকির বিষয়টি তুলে ধরা হয়েছে। প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে, বাংলাদেশের এলএনজি আমদানির প্রায় ৬৪ শতাংশ কাতার থেকে আসে। ফলে ওই অঞ্চলে সরবরাহব্যবস্থা বাধাগ্রস্ত হলে বিকল্প উৎস থেকে এলএনজি সংগ্রহের প্রয়োজন হতে পারে, যা তুলনামূলক বেশি ব্যয়বহুল হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।এ ছাড়া বাংলাদেশের অপরিশোধিত জ্বালানি তেলের আমদানিও মধ্যপ্রাচ্যের ওপর নির্ভরশীল। ২০২৬ সালের এপ্রিলে জাতীয় সংসদে দেওয়া জ্বালানিমন্ত্রীর বক্তব্য অনুযায়ী, দেশের আমদানি করা মোট জ্বালানি তেলের প্রায় ২০ থেকে ২৩ শতাংশ হরমুজ প্রণালি দিয়ে পরিবাহিত হয়। অন্যদিকে অপরিশোধিত তেলের আমদানির ক্ষেত্রে এই জলপথের ওপর নির্ভরতা আরও বেশি।এর প্রভাব কয়েকটি স্তরে অনুভূত হতে পারে। প্রথমত, জ্বালানি আমদানির ব্যয় বাড়লে দেশের বৈদেশিক মুদ্রার ওপর চাপ তৈরি হবে। দ্বিতীয়ত, এলএনজির সরবরাহ ও দাম অস্থিতিশীল হলে বিদ্যুৎ উৎপাদন এবং শিল্পকারখানার কার্যক্রমে প্রভাব পড়তে পারে। তৃতীয়ত, জ্বালানি পরিবহন ব্যয় বৃদ্ধি পেলে পণ্য উৎপাদন ও সরবরাহের খরচ বাড়বে। শেষ পর্যন্ত এসব চাপ ভোক্তা পর্যায়ে পণ্যমূল্য বৃদ্ধির ঝুঁকি তৈরি করতে পারে।অর্থাৎ হরমুজ প্রণালির সংকট বাংলাদেশের জন্য শুধু জ্বালানি আমদানির সমস্যা নয়; এটি সামগ্রিক অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতার সঙ্গেও সম্পর্কিত।বিকল্প পথ ও জ্বালানি নিরাপত্তার ভবিষ্যৎহরমুজ প্রণালির ওপর নির্ভরতা কমাতে দীর্ঘদিন ধরেই বিকল্প পাইপলাইন ও পরিবহন রুট ব্যবহারের বিষয়টি আলোচনায় রয়েছে। সৌদি আরবের পূর্ব-পশ্চিম পাইপলাইন এবং সংযুক্ত আরব আমিরাতের আবুধাবি পাইপলাইন কিছু পরিমাণ তেল বিকল্প পথে পরিবহনের সুযোগ তৈরি করেছে। তবে এসব ব্যবস্থার সক্ষমতা হরমুজ দিয়ে পরিবাহিত মোট জ্বালানির তুলনায় সীমিত।বাংলাদেশের জন্যও একক উৎস বা নির্দিষ্ট অঞ্চলের ওপর অতিরিক্ত নির্ভরতা কমানো গুরুত্বপূর্ণ। দীর্ঘমেয়াদে জ্বালানি আমদানির উৎস বহুমুখীকরণ, কৌশলগত মজুত সক্ষমতা বৃদ্ধি, নবায়নযোগ্য জ্বালানির ব্যবহার সম্প্রসারণ এবং জ্বালানি দক্ষতা বাড়ানোর মতো পদক্ষেপ প্রয়োজন।একই সঙ্গে আন্তর্জাতিক বাজারে অস্থিরতার সময় বিকল্প সরবরাহকারী দেশের সঙ্গে দীর্ঘমেয়াদি চুক্তি এবং আঞ্চলিক সহযোগিতা জোরদার করা যেতে পারে। তবে এসব উদ্যোগ বাস্তবায়নে ব্যয়, অবকাঠামোগত সক্ষমতা ও সরবরাহের নির্ভরযোগ্যতা বিবেচনায় নেওয়া জরুরি।সংকটের সমাধান কূটনীতিতেইহরমুজ প্রণালিকে ঘিরে বর্তমান পরিস্থিতি আবারও প্রমাণ করেছে, বৈশ্বিক জ্বালানি নিরাপত্তা কোনো একক দেশের নিয়ন্ত্রণে নেই। একটি গুরুত্বপূর্ণ সামুদ্রিক রুটে অস্থিরতা তৈরি হলে তার প্রভাব দ্রুত মহাদেশ পেরিয়ে অন্য দেশের অর্থনীতিতে পৌঁছে যায়।ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে উত্তেজনা প্রশমন এবং আঞ্চলিক পক্ষগুলোর মধ্যে কার্যকর সমঝোতা ছাড়া এই সংকটের স্থায়ী সমাধান কঠিন। আন্তর্জাতিক নৌ চলাচলের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার পাশাপাশি সংশ্লিষ্ট দেশগুলোর সার্বভৌমত্ব ও নিরাপত্তা-উদ্বেগ বিবেচনায় নিয়ে কূটনৈতিক সমাধানের পথ খুঁজে বের করা প্রয়োজন।বাংলাদেশের জন্য এই পরিস্থিতি একটি গুরুত্বপূর্ণ সতর্কবার্তা। বৈশ্বিক জ্বালানি সরবরাহব্যবস্থার ওপর অতিরিক্ত নির্ভরতা কমিয়ে দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা গ্রহণের প্রয়োজনীয়তা এখন আরও স্পষ্ট। কারণ আন্তর্জাতিক সংঘাতের সিদ্ধান্ত হয়তো হাজার মাইল দূরে নেওয়া হয়, কিন্তু তার অর্থনৈতিক প্রভাব এসে পড়ে দেশের বাজারে, শিল্পকারখানায় এবং সাধারণ মানুষের দৈনন্দিন জীবনে।হরমুজ প্রণালি তাই শুধু মধ্যপ্রাচ্যের একটি জলপথ নয়; এটি বিশ্ব অর্থনীতির সঙ্গে বাংলাদেশের জ্বালানি নিরাপত্তারও এক গুরুত্বপূর্ণ সংযোগস্থল।তথ্যসূত্র: আন্তর্জাতিক জ্বালানি সংস্থা (আইইএ), রয়টার্স, যুক্তরাষ্ট্রের জ্বালানি তথ্য প্রশাসন (ইআইএ)