ঢাকা    শুক্রবার, ০২ অক্টোবর ২০২৬, ১৭ আশ্বিন ১৪৩৩ ১৯ রবিউস সানি ১৪৪৮ হিজরি
বাংলাদেশ সময়
বাংলা ভিউজ

ট্রাম্প প্রশাসনের সঙ্গে ভারতের টানাপোড়েন প্রকাশ্যে আনলেন জয়শঙ্কর

যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের প্রশাসনের সঙ্গে সম্পর্কের টানাপোড়েন নিয়ে এবার প্রকাশ্যেই নিজেদের অবস্থান তুলে ধরছে ভারত। বাণিজ্যনীতি, রাশিয়া থেকে তেল কেনা, পাকিস্তানের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের সম্পর্ক এবং সন্ত্রাসবাদ ইস্যুতে ওয়াশিংটনের নীতির বিষয়ে আপত্তি জানাচ্ছে নয়াদিল্লি।ভারতের পররাষ্ট্রমন্ত্রী এস জয়শঙ্করের সাম্প্রতিক বক্তব্যে দুই দেশের সম্পর্কের বিভিন্ন মতপার্থক্য আরও স্পষ্ট হয়ে উঠেছে। নিউইয়র্কে এক অনুষ্ঠানে তিনি যুক্তরাষ্ট্রের কিছু নীতিকে ‘আত্মকেন্দ্রিক’ হিসেবে উল্লেখ করেন। একই সঙ্গে ভারতের নিরাপত্তা উদ্বেগ, বিশেষ করে সন্ত্রাসবাদ নিয়ে ওয়াশিংটনের অবস্থান নিয়েও প্রশ্ন তোলেন তিনি।বিশ্লেষকদের মতে, এতদিন যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে মতবিরোধের বিষয়গুলো সাধারণত কূটনৈতিক আলোচনার মধ্যেই সীমাবদ্ধ রাখত নয়াদিল্লি। তবে কয়েক মাস ধরে চলা টানাপোড়েনের পর ভারত এখন প্রকাশ্য বক্তব্যের মাধ্যমে নিজেদের অসন্তোষ জানাচ্ছে।ভারত-যুক্তরাষ্ট্র সম্পর্কে অন্যতম বড় বিরোধের জায়গা হয়ে উঠেছে বাণিজ্য। ২০২৫ সালে দুই দেশের পণ্য বাণিজ্যের পরিমাণ ছিল প্রায় ১৪৯ দশমিক ১ বিলিয়ন ডলার। এর মধ্যে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে ভারতের পণ্য বাণিজ্যে ৫৮ দশমিক ৪ বিলিয়ন ডলারের উদ্বৃত্ত ছিল।জয়শঙ্কর বলেন, কোনো দেশ নিজেদের সিদ্ধান্ত নেওয়ার সময় অন্য দেশের অর্থনীতি ও মানুষের ওপর সেই সিদ্ধান্তের প্রভাব পুরোপুরি উপেক্ষা করতে পারে না। ভারতের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের বাণিজ্য চুক্তি নিয়ে আলোচনা চললেও এখনো তা চূড়ান্ত হয়নি।বিশেষ করে কৃষি খাত নিয়ে দুই দেশের অবস্থানে বড় ধরনের পার্থক্য রয়েছে। ভারত দীর্ঘদিন ধরে নিজেদের কৃষকদের সুরক্ষায় কৃষিপণ্যের বাজারে নিয়ন্ত্রণ বজায় রেখেছে। ফলে যুক্তরাষ্ট্রের বাজার উন্মুক্ত করার প্রত্যাশা ভারতের বাস্তব পরিস্থিতির সঙ্গে পুরোপুরি সামঞ্জস্যপূর্ণ নয় বলে মন্তব্য করেন জয়শঙ্কর।এদিকে রাশিয়া থেকে তেল কেনার কারণে ভারতের ওপর যুক্তরাষ্ট্রের সম্ভাব্য উচ্চ শুল্ক নিয়েও উদ্বেগ রয়েছে নয়াদিল্লির। ভারতের আশঙ্কা, এ ধরনের পদক্ষেপ দুই দেশের বাণিজ্য সম্পর্ককে আরও জটিল করে তুলতে পারে।দুই দেশের সম্পর্কে আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বিরোধের জায়গা পাকিস্তান। গত বছর ভারত ও পাকিস্তানের মধ্যে কয়েক দিনের সামরিক সংঘাতের পর যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যস্থতায় যুদ্ধবিরতি হয়েছিল বলে দাবি করেছিলেন ট্রাম্প। তবে কাশ্মীরসহ ভারত-পাকিস্তান সম্পর্কের বিষয়ে তৃতীয় পক্ষের হস্তক্ষেপের বিরোধিতা করে আসছে নয়াদিল্লি। পাশাপাশি পাকিস্তানের সঙ্গে ট্রাম্প প্রশাসনের ঘনিষ্ঠতা নিয়েও ভারতের অস্বস্তি রয়েছে।জয়শঙ্কর বলেন, সন্ত্রাসবাদ ভারতের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ একটি বিষয়। দীর্ঘদিন ধরে প্রতিবেশী দেশের মাটি থেকে সন্ত্রাসবাদের মুখোমুখি হওয়ার অভিযোগ করে আসছে ভারত। এই নিরাপত্তা উদ্বেগের প্রতি যুক্তরাষ্ট্রের কাছ থেকে পর্যাপ্ত বোঝাপড়া ও সহানুভূতি না পাওয়া দিল্লির জন্য সমস্যার কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে বলে তিনি মন্তব্য করেন।সাবেক ভারতীয় কূটনীতিক অজয় বিসারিয়া বলেন, যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে নিজেদের মতপার্থক্য এবার প্রকাশ্যে তুলে ধরার সিদ্ধান্তের পেছনে ভারতের অভিজ্ঞতা কাজ করছে। যুদ্ধবিরতি ইস্যুর পর দুই দেশের সম্পর্কের পরিবেশ আরও জটিল হয়েছে বলেও তিনি উল্লেখ করেন।বিশ্লেষকদের মতে, যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সম্পর্কের বিষয়ে ভারতের কঠোর অবস্থানের পেছনে অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক চাপও ভূমিকা রাখছে। আগামী বছর ভারতের গুরুত্বপূর্ণ কয়েকটি রাজ্যে নির্বাচন রয়েছে। এর আগে যুক্তরাষ্ট্রের চাপের কাছে ভারত সরকার নতি স্বীকার করছে—এমন অভিযোগ বিরোধীদের পক্ষ থেকে উঠছে।এ ছাড়া যুক্তরাষ্ট্রের এইচ-১বি ভিসা নীতিতে পরিবর্তন নিয়েও ভারতে উদ্বেগ রয়েছে। দীর্ঘদিন ধরে ভারতীয় দক্ষ কর্মীরা যুক্তরাষ্ট্রের এই কর্মসূচির বড় সুবিধাভোগী। তবে ট্রাম্প প্রশাসনের সময়ে ভিসা প্রক্রিয়া ও খরচে পরিবর্তন এসেছে।জয়শঙ্কর বলেন, একসময় কর্মীদের আন্তর্জাতিক চলাচলকে অর্থনৈতিক সুবিধা হিসেবে দেখা হতো। এখন অভিবাসননীতি ও অর্থনৈতিক স্বার্থের মধ্যে বিরোধ তৈরি হচ্ছে।ভারত-যুক্তরাষ্ট্র সম্পর্কের টানাপোড়েন বাড়লেও দুই দেশই সম্পর্ক পুনর্গঠনের সম্ভাবনা ধরে রেখেছে বলে মনে করছেন বিশ্লেষকেরা।চ্যাথাম হাউসের দক্ষিণ এশিয়াবিষয়ক গবেষক চিয়েটিগ বাজপেয়ি বলেন, দুই দেশের মধ্যে মতপার্থক্য বাড়লেও সম্পর্ক পুনরুদ্ধারের চেষ্টা পুরোপুরি বন্ধ হয়নি। দ্বিপক্ষীয় বাণিজ্য চুক্তি সম্পন্ন হওয়া ভবিষ্যৎ সম্পর্কের একটি গুরুত্বপূর্ণ সূচক হতে পারে বলেও তিনি মন্তব্য করেন।অবজারভার রিসার্চ ফাউন্ডেশনের হার্শ পান্তের মতে, ট্রাম্প প্রশাসনের নীতির সঙ্গে মানিয়ে নিতে গিয়ে নয়াদিল্লি এখন প্রকাশ্যেই নিজেদের স্বার্থের কথা বলছে।

ট্রাম্প প্রশাসনের সঙ্গে ভারতের টানাপোড়েন প্রকাশ্যে আনলেন জয়শঙ্কর