ভারতে সামগ্রিক বেকারত্ব ৩.২%, স্নাতকদের মধ্যে ১৩ শতাংশ
ভারতে বেকারত্বের প্রকৃত হার কত, তা নিয়ে দীর্ঘদিন ধরেই বিতর্ক রয়েছে। সরকারি পরিসংখ্যানের পদ্ধতি ও তথ্য নিয়ে বিভিন্ন অর্থনীতিবিদ প্রশ্ন তুললেও শিক্ষিত জনগোষ্ঠীর মধ্যে বেকারত্বের হার তুলনামূলক বেশি—এ বিষয়টি নিয়ে তেমন বিতর্ক নেই। দেশটির সরকারি নীতি আয়োগের সাম্প্রতিক এক প্রতিবেদনের তথ্য অনুযায়ী, ভারতে সর্বভারতীয় বেকারত্বের হার যেখানে ৩ দশমিক ২ শতাংশ, সেখানে স্নাতকদের মধ্যে এই হার বেড়ে দাঁড়িয়েছে ১৩ শতাংশে।অর্থাৎ, ভারতের তরুণ জনগোষ্ঠীর একটি উল্লেখযোগ্য অংশ উচ্চশিক্ষা শেষ করেও কর্মসংস্থানের অনিশ্চয়তায় রয়েছেন। হাতে ডিগ্রি থাকলেও নিজেদের যোগ্যতা অনুযায়ী চাকরি না পাওয়ায় ভবিষ্যৎ নিয়ে উদ্বেগ বাড়ছে দেশটির শিক্ষিত তরুণদের মধ্যে।দিল্লির রাজপথে বিভিন্ন সময়ে তরুণদের বিক্ষোভেও শিক্ষিত বেকারত্বের বিষয়টি সামনে এসেছে। এসব আন্দোলনে অংশ নেওয়া তরুণদের একটি অংশ তুলনামূলক সচ্ছল পরিবারের হলেও চাকরির বাজারে প্রবেশের ক্ষেত্রে তাদেরও নানা সমস্যার মুখোমুখি হতে হচ্ছে। বড় অর্থনীতির দেশ ভারত অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি ধরে রাখলেও শিক্ষিত তরুণদের জন্য পর্যাপ্ত ও মানসম্মত কর্মসংস্থান তৈরি নিয়ে প্রশ্ন রয়ে গেছে।বিশেষজ্ঞদের মতে, ভারতের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোতে যে ধরনের শিক্ষা ও দক্ষতা দেওয়া হচ্ছে, আধুনিক কর্মবাজারের চাহিদার সঙ্গে তার অনেক ক্ষেত্রেই সামঞ্জস্য নেই। এর পাশাপাশি গবেষণা ও উন্নয়ন বা রিসার্চ অ্যান্ড ডেভেলপমেন্ট খাতে তুলনামূলক কম বিনিয়োগ উৎপাদন ও শিল্পখাতের সম্প্রসারণকেও সীমিত করছে বলে মনে করেন তারা।ফর্মাল বা প্রাতিষ্ঠানিক কর্মসংস্থানের পরিসরও প্রত্যাশিত হারে বাড়েনি। ফলে দেশের বিপুলসংখ্যক কর্মী এখনো অনানুষ্ঠানিক বা অসংগঠিত খাতে কাজ করছেন। এসব খাতে চাকরির স্থায়িত্ব, সামাজিক নিরাপত্তা ও বেতন কাঠামো নিয়ে নানা সীমাবদ্ধতা রয়েছে।২০১৮ সালে অর্থনীতিবিদ ইন্দ্রজিৎ বৈরাগ্যও সতর্ক করেছিলেন, শিক্ষার হার বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে বেকারত্বের চাপ বাড়তে পারে। এর একটি কারণ হিসেবে তিনি শিক্ষিত তরুণদের প্রত্যাশার সঙ্গে কর্মবাজারের বাস্তবতার পার্থক্যের বিষয়টি তুলে ধরেছিলেন। উচ্চশিক্ষিত তরুণদের একটি অংশ কম বেতন বা অনানুষ্ঠানিক কাজে যেতে অনাগ্রহী, অন্যদিকে তাদের প্রত্যাশা অনুযায়ী পর্যাপ্ত নিরাপদ ও ভালো বেতনের চাকরির সুযোগও সীমিত।নীতি আয়োগের সাম্প্রতিক পরিসংখ্যান অনুযায়ী, ভারতের মাত্র ৮ দশমিক ২৫ শতাংশ স্নাতক তাদের শিক্ষাগত যোগ্যতার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ পদে কাজ করছেন। অর্থাৎ, বিপুলসংখ্যক স্নাতক হয় তাদের যোগ্যতার তুলনায় অপেক্ষাকৃত কম দক্ষতা প্রয়োজন এমন কাজে যুক্ত হচ্ছেন, নয়তো প্রথাগত ডিগ্রির পাশাপাশি চাকরির বাজারে প্রয়োজনীয় বিশেষ দক্ষতা অর্জনের জন্য অতিরিক্ত প্রশিক্ষণ নিতে হচ্ছে।আন্তর্জাতিক শ্রম সংস্থা বা আইএলওর ‘ইন্ডিয়া এমপ্লয়মেন্ট রিপোর্ট ২০২৪’-এও ভারতের তরুণদের কর্মসংস্থান নিয়ে বিভিন্ন চ্যালেঞ্জের কথা তুলে ধরা হয়েছে। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, কৃষি খাত থেকে বেরিয়ে আসা তরুণদের জন্য অর্থনীতি পর্যাপ্ত উপযুক্ত ও ভালো আয়ের কর্মসংস্থান তৈরি করতে পারেনি।উৎপাদন খাতের ধীরগতির সম্প্রসারণের পেছনে ভারতের দুর্বল গবেষণা ও উন্নয়ন ব্যবস্থাকেও দায়ী করছেন অনেকে। দেশটির ‘ইকোনমিক সার্ভে’ অনুযায়ী, ভারত মোট দেশজ উৎপাদন বা জিডিপির প্রায় ০ দশমিক ৬৪ থেকে ০ দশমিক ৬৫ শতাংশ গবেষণা ও উন্নয়নে ব্যয় করে। তুলনায় যুক্তরাষ্ট্রের ব্যয় ৩ দশমিক ৪৮ শতাংশ, চীনের ২ দশমিক ৪৩ শতাংশ এবং দক্ষিণ কোরিয়ার ৪ দশমিক ৯১ শতাংশ।গবেষণা ও উন্নয়নে বেসরকারি খাতের অংশগ্রহণের ক্ষেত্রেও ভারত পিছিয়ে রয়েছে। বিশ্বের শীর্ষ ১০ অর্থনীতির দেশগুলোতে গবেষণা ও উন্নয়নে বেসরকারি খাতের গড় অবদান প্রায় ৬৮ শতাংশ হলেও ভারতে তা অর্ধেকেরও কম বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।ভারতে মহাকাশ ও প্রতিরক্ষা খাতে সরকারি বিনিয়োগ এবং বিভিন্ন উচ্চপ্রযুক্তির প্রকল্প থাকলেও এসব খাত একা বিপুলসংখ্যক তরুণের জন্য দ্রুত বড় পরিসরে কর্মসংস্থান তৈরি করতে পারে না। ফলে শিক্ষিত বেকারত্ব কমাতে বৃহত্তর শিল্প ও উৎপাদন খাতের সম্প্রসারণকে গুরুত্বপূর্ণ মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা।তাদের মতে, সমস্যার সমাধানে একদিকে শিক্ষাব্যবস্থাকে কর্মবাজারের চাহিদার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ করতে হবে, অন্যদিকে উৎপাদনমুখী ও শ্রমনিবিড় শিল্পে বিনিয়োগ বাড়াতে হবে। শিক্ষাব্যবস্থা, দক্ষতা উন্নয়ন এবং শিল্পখাতের মধ্যে কার্যকর সমন্বয় তৈরি করা না গেলে উচ্চশিক্ষিত তরুণদের বেকারত্ব ও যোগ্যতার তুলনায় কম দক্ষতার কাজে যুক্ত হওয়ার সমস্যা অব্যাহত থাকতে পারে।