ঢাকা    বুধবার, ১৪ অক্টোবর ২০২৬, ২৯ আশ্বিন ১৪৩৩ ২ জমাদিউল আউয়াল ১৪৪৮ হিজরি
বাংলাদেশ সময়
বাংলা ভিউজ

রেমিট্যান্স প্রণোদনার ৮,৫৬৫ কোটি টাকা বকেয়া, চাপে ব্যাংকগুলো

প্রবাসী আয়ের সরকারি প্রণোদনার অর্থ সময়মতো ফেরত না পাওয়ায় দেশের বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলোর বকেয়া পাওনা ৮ হাজার ৫৬৫ কোটি টাকার বেশি দাঁড়িয়েছে। সরকারের ঘোষিত প্রণোদনার অর্থ ব্যাংকগুলো নিজস্ব তহবিল থেকে পরিশোধ করায় তারল্য সংকটের পাশাপাশি মুনাফায়ও নেতিবাচক প্রভাব পড়ছে।সরকারি নীতিমালা অনুযায়ী, দেশে আসা প্রবাসী আয়ের বিপরীতে ব্যাংকগুলো প্রবাসীদের ২ দশমিক ৫ শতাংশ হারে নগদ প্রণোদনা দেয়। অর্থ মন্ত্রণালয়ের হয়ে ব্যাংকগুলো এই অর্থ বিতরণ করার পর বাংলাদেশ ব্যাংকের মাধ্যমে তা ফেরত পাওয়ার কথা। তবে সরকারের কাছ থেকে অর্থ ফেরত পেতে বর্তমানে প্রায় সাড়ে ৯ মাস পর্যন্ত সময় লাগছে।[BANGVIEWS-POST:4743]দ্য বিজনেস স্ট্যান্ডার্ডের হাতে আসা নথি ও বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, গত জুনের শেষে ব্যাংকগুলোর বকেয়া দাবির পরিমাণ ছিল ৮ হাজার ১৮৫ কোটি টাকা। এরপর ২ আগস্ট ৫০০ কোটি টাকা পরিশোধ করা হলেও জুলাই মাসের নতুন ৮৭৯ কোটি টাকার দাবি যুক্ত হয়েছে। এতে মোট বকেয়া দাঁড়িয়েছে ৮ হাজার ৫৬৫ কোটি টাকা।বর্তমানে সবচেয়ে বেশি বকেয়া রয়েছে ইসলামী ব্যাংক বাংলাদেশের, ১ হাজার ৫১৩ কোটি টাকা। এরপর ব্র্যাক ব্যাংকের ৮৫০ কোটি, সিটি ব্যাংকের ৩৩৫ কোটি, ইস্টার্ন ব্যাংকের ২৫০ কোটি, পুবালী ব্যাংকের ২৫০ কোটি এবং সাউথইস্ট ব্যাংকের ১৭০ কোটি টাকা পাওনা রয়েছে।ব্যাংকাররা বলছেন, প্রায় দুই বছর ধরে তারা এই সমস্যার মুখোমুখি হচ্ছেন। প্রবাসীদের প্রণোদনা দিতে ব্যাংকগুলোকে নিজেদের আমানতের অর্থ ব্যবহার করতে হচ্ছে। ফলে এসব অর্থ অন্য খাতে বিনিয়োগ করে আয় করার সুযোগও হারাচ্ছে ব্যাংকগুলো।মিউচুয়াল ট্রাস্ট ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক ও প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা সৈয়দ মাহবুবুর রহমান বলেন, বকেয়া পরিশোধে বিলম্বের কারণে ব্যাংকগুলোকে বড় ধরনের সুযোগব্যয়ের মুখোমুখি হতে হচ্ছে। গ্রাহকদের আমানত থেকে প্রণোদনার অর্থ পরিশোধ করায় ব্যাংকগুলোর বার্ষিক অর্থায়ন ব্যয় হচ্ছে, অথচ ওই অর্থ বিনিয়োগ করে আয় করার সুযোগ থাকছে না।সিটি ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক ও প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা মাসরুর আরেফিন বলেন, এর ফলে ব্যাংকের ঋণ দেওয়ার সক্ষমতা কমে যাচ্ছে। একই সঙ্গে আমানতের ওপর সুদের দায় অব্যাহত থাকলেও আটকে থাকা অর্থ থেকে কোনো আয় হচ্ছে না। আয় সৃষ্টি করতে পারে এমন সম্পদে বিনিয়োগের সুযোগও হারাচ্ছে ব্যাংকগুলো।বাংলাদেশ ব্যাংকের মুখপাত্র আরিফ হোসেন খান জানিয়েছেন, অর্থ মন্ত্রণালয় থেকে অর্থ পাওয়ার পরপরই কেন্দ্রীয় ব্যাংক ব্যাংকগুলোর মধ্যে তা বিতরণ করে। ফলে অর্থ ছাড়ের সময়সূচি মূলত সরকারের তহবিল সরবরাহের ওপর নির্ভর করছে।ব্যাংকারদের মতে, রেমিট্যান্স প্রবাহ দ্রুত বাড়ায় প্রণোদনার জন্য সরকারের প্রয়োজনীয় অর্থও বেড়েছে। কিন্তু সে অনুযায়ী বাজেট বরাদ্দ ও অর্থ ছাড় না বাড়ায় বকেয়া জমছে। এতে বিশেষ করে তারল্য সংকটে থাকা ছোট ব্যাংকগুলো বেশি চাপে পড়ছে।টাকার অবমূল্যায়নে বেড়েছে প্রণোদনার ব্যয়রেমিট্যান্সের পরিমাণ বাড়ার পাশাপাশি টাকার অবমূল্যায়নের কারণেও ব্যাংকগুলোর প্রণোদনা বাবদ ব্যয় বেড়েছে। ২০২৪ সালের আগস্টের আগে প্রতি ডলারের বিনিময় হার ছিল প্রায় ১১৭ টাকা। তখন ব্যাংকগুলো প্রণোদনা হিসেবে প্রতি ডলারে প্রায় ২ টাকা ৯৫ পয়সা দিত।বর্তমানে রেমিট্যান্সের বিনিময় হার প্রায় ১২৩ টাকা হওয়ায় প্রতি ডলারে প্রণোদনার পরিমাণ প্রায় ৩ টাকায় দাঁড়িয়েছে। একই সঙ্গে রেমিট্যান্সের প্রবাহ বাড়ায় মোট প্রণোদনা ব্যয়ের পরিমাণও বেড়েছে।দীর্ঘমেয়াদি বকেয়ায় বাড়ছে ঝুঁকিব্যাংকাররা সতর্ক করে বলেছেন, সরকারি অর্থ ফেরতে বিলম্ব দীর্ঘায়িত হলে রেমিট্যান্স সংগ্রহে ব্যাংকগুলোর আগ্রহ কমে যেতে পারে। বিদেশি মুদ্রা বিনিময় প্রতিষ্ঠান ও অর্থ স্থানান্তরকারী প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে ব্যবসায়িক সম্পর্ক বজায় রাখার ক্ষেত্রেও অতিরিক্ত চাপ তৈরি হতে পারে।[BANGVIEWS-POST:4742]বিশেষ করে ছোট ও তারল্য সংকটে থাকা ব্যাংকগুলো এই চাপ বেশি অনুভব করতে পারে। দীর্ঘদিন সরকারি পাওনা আটকে থাকলে ব্যাংকগুলোর সম্পদ ও দায় ব্যবস্থাপনাতেও সমস্যা তৈরি হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।এ ছাড়া প্রণোদনা প্রদানে দীর্ঘসূত্রতা তৈরি হলে প্রবাসীদের আস্থা কমে গিয়ে ব্যাংকিং চ্যানেলের পরিবর্তে অবৈধ হুন্ডি ব্যবস্থার দিকে ঝুঁকে পড়ার ঝুঁকি তৈরি হতে পারে। এতে বৈদেশিক মুদ্রার বাজার, চলতি হিসাবের ভারসাম্য এবং দেশের বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভে রেমিট্যান্সের ইতিবাচক প্রভাবও ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।ব্যাংকাররা বকেয়া দ্রুত পরিশোধের পাশাপাশি ব্যাংকগুলোকে কয়েক মাসের অগ্রিম প্রণোদনা দেওয়ার পুরোনো ব্যবস্থা চালু, প্রতি মাসে স্বয়ংক্রিয়ভাবে দাবি নিষ্পত্তি এবং রেমিট্যান্স প্রবাহের সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে বাজেটে পর্যাপ্ত অর্থ বরাদ্দের প্রস্তাব দিয়েছেন।

রেমিট্যান্স প্রণোদনার ৮,৫৬৫ কোটি টাকা বকেয়া, চাপে ব্যাংকগুলো