ঢাকা    সোমবার, ০৭ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ২৩ ভাদ্র ১৪৩৩ ২৪ রবিউল আউয়াল ১৪৪৮ হিজরি
বাংলাদেশ সময়
বাংলা ভিউজ

যুদ্ধের স্মৃতি পেরিয়ে ধর্মীয় পর্যটনের নতুন ঠিকানা ইরাক

একসময় ইরাক মানেই ছিল যুদ্ধ, ধ্বংস আর নিরাপত্তাহীনতার ছবি। কিন্তু ২০২৫-২৬ সালে দেশটি বিশ্বের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ ধর্মীয় ও ঐতিহাসিক পর্যটনভূমি হিসেবে পরিচিতি লাভ করেছে। শিয়া মুসলিমদের কারবালা ও নাজাফের পাশাপাশি খ্রিষ্টান তীর্থযাত্রীদের জন্যও ইরাক নতুন করে নিজেকে তুলে ধরছে।[BANGVIEWS-POST:5083] ইরাকের সবচেয়ে প্রতীকী স্থান সম্ভবত প্রাচীন উর এলাকা। ঐতিহ্যগতভাবে এটি হজরত ইব্রাহিম (আ.)-এর জন্মস্থান বা আদি বাসস্থান হিসেবে পরিচিত। ইউফ্রেটিসের দক্ষিণ তীরে নাসিরিয়াহ শহর থেকে ১৬ কিলোমিটার দক্ষিণ-পশ্চিমে অবস্থিত এ শহরটির উৎপত্তি উবাইদ যুগে, আনুমানিক খ্রিষ্টপূর্ব ৩ হাজার অব্দে। খ্রিষ্টপূর্ব ২৬ শতক থেকে একটি নগর-রাষ্ট্র হিসেবে এর ইতিহাস পাওয়া যায়। উর-এর প্রথম নথিভুক্ত রাজা ছিলেন মেসান্নেপাদা। ২০২১ সালে পোপ ফ্রান্সিস এই ঐতিহাসিক জায়গাটি ভ্রমণ করেন। এর পর থেকে উর আন্তর্জাতিকভাবে পর্যটনের আলোচনায় আসে। ২০২৫ সালের অক্টোবরে ইরাক ও ভ্যাটিকানের মধ্যে উরকে কেন্দ্র করে খ্রিষ্টান তীর্থযাত্রা আরও এগিয়ে নেওয়ার উদ্যোগের খবর প্রকাশিত হয় ইরাকি নিউজ ডট কম-এ। উরের প্রাচীন জিগুরাট, নতুন গির্জা এবং ‘আব্রাহামের ভূমি’ হিসেবে এর ধর্মীয় পরিচয়—সব মিলিয়ে ইরাক এখন খ্রিষ্টান ঐতিহ্যভিত্তিক পর্যটনের একটি নতুন করিডর তৈরির চেষ্টা করছে। বসরা, নিনেভে, মসুল ও প্রাচীন মন্দিরগুলো সেই সম্ভাবনার অংশ। এমনকি বর্তমানে ইরাকের পর্যটনব্যবস্থায় ধর্মীয় ও ঐতিহাসিক স্থানকে একসঙ্গে নিয়ে প্যাকেজও তৈরি হচ্ছে। তবে ইরাকের ধর্মীয় পর্যটনের সবচেয়ে বড় শক্তি শিয়া তীর্থযাত্রীরা। কারবালায় পবিত্র আশুরা বা ১০ মহররমের ঠিক ৪০ দিন পর সফর মাসের ২০ তারিখে অনুষ্ঠিত আরবাইন বিশ্বের বৃহত্তম বার্ষিক ধর্মীয় সমাবেশগুলোর একটি। গত বছর এ অনুষ্ঠানে ২ কোটি ১০ লাখের বেশি মানুষ অংশ নিয়েছিলেন বলে আল-আব্বাস মাজার কর্তৃপক্ষের তথ্য উদ্ধৃত করে প্রতিবেদন প্রকাশিত হয়। রাস্তাজুড়ে স্বেচ্ছাসেবীদের মাওকিব বা অস্থায়ী সেবাকেন্দ্রে তীর্থযাত্রীদের বিনা মূল্যে খাবার, পানি, বিশ্রাম ও অন্যান্য সহায়তা দেওয়া হয়। রয়টার্সের প্রতিবেদনে ২০২৫ সালের এক তীর্থযাত্রীর ৫০০ কিলোমিটার হাঁটার অভিজ্ঞতার কথাও উঠে এসেছে। এ বছরও এই প্রবণতা থামেনি। এ বছর অনুষ্ঠিত আরবাইনে কারবালা শহরে ২ কোটি ২০ লাখের বেশি মানুষ অংশ নিয়েছিলেন বলে জানা যায়। এই বিপুলসংখ্যক মানুষের প্রায় ৫০ লাখ মানুষ এসেছিলেন বিশ্বের ১৭২টি দেশ থেকে বলে জানিয়েছে স্থানীয় কর্তৃপক্ষ। অর্থাৎ ধর্মীয় পর্যটন শুধু আধ্যাত্মিক অভিজ্ঞতা নয়, ইরাকের স্থানীয় অর্থনীতি ও পর্যটনশিল্পেরও বড় চালিকাশক্তি হিসেবে দেখা দিচ্ছে। তবে এই পর্যটনের একটি অংশ কিছুটা ঝুঁকির মুখে আছে। এ বছরের শুরুতে ইরানের অর্থনৈতিক সংকটে নাজাফে ইরানি তীর্থযাত্রীর সংখ্যা ব্যাপক হারে কমে যায়। রয়টার্স জানায়, আগে প্রতিদিন যেখানে ৩ হাজার থেকে সাড়ে ৩ হাজার ইরানি তীর্থযাত্রী আসতেন, এখন তা কমে দাঁড়িয়েছে মাত্র ১০০ থেকে ২৫০ জনে। এর প্রভাব পড়েছে হোটেল ও দোকানগুলোতেও।[BANGVIEWS-POST:5082] তারপরও ইরাকের সামনে সম্ভাবনাটি স্পষ্ট। আধুনিক ই-ভিসা ব্যবস্থা চালু রয়েছে দেশটিতে এবং পর্যটন ভিসায় ধর্মীয় স্থান ভ্রমণের সুযোগও রাখা হয়েছে। ফলে যুদ্ধের স্মৃতি বহন করা দেশটি ধীরে ধীরে এমন এক পর্যটন মানচিত্র তৈরি করছে, যেখানে কারবালার আধ্যাত্মিকতা, উরের বাইবেলীয় ইতিহাস, মসুলের খ্রিষ্টান ঐতিহ্য এবং মেসোপটেমিয়ার প্রাচীন সভ্যতা—সব এক ভ্রমণপথে এসে মিলছে। সূত্র: শিয়া ওয়েভস ডট কম, রয়টার্স, ইরাকি নিউজ ডট কম

যুদ্ধের স্মৃতি পেরিয়ে ধর্মীয় পর্যটনের নতুন ঠিকানা ইরাক