ঢাকা    শুক্রবার, ২৫ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ১০ আশ্বিন ১৪৩৩ ১২ রবিউস সানি ১৪৪৮ হিজরি
বাংলাদেশ সময়
বাংলা ভিউজ

জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের অধিবেশনে নেপালের প্রধানমন্ত্রী কেন সানগ্লাস পরলেন?

জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের অধিবেশনে বৃহস্পতিবার বক্তব্য দেওয়ার সময় নেপালের প্রধানমন্ত্রী বালেন্দ্র শাহের চোখে ছিল পরিচিত কালো সানগ্লাস। নেপালিদের কাছে অবশ্য তার এই উপস্থিতি নতুন কিছু নয়। জনসম্মুখে আসতে হয় এমন বেশিরভাগ অনুষ্ঠানেই গাঢ় রঙের সানগ্লাস পরে উপস্থিত হতে দেখা যায় ৩৬ বছর বয়সি এই প্রধানমন্ত্রীকে, যিনি দেশে ‘বালেন’ নামেই বেশি পরিচিত।জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে আনুপাতিক হারের তুলনায় বেশি ক্ষতিগ্রস্ত স্বল্পোন্নত দেশগুলোর পুনর্বাসনে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের কাছ থেকে অর্থসহায়তার আহ্বান জানাতে নিউইয়র্কে গিয়েছেন বালেন শাহ। জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদে দেওয়া বক্তব্যে তিনি গত মাসে নেপালে ঘটে যাওয়া প্রাণঘাতী বন্যার প্রসঙ্গও তুলে ধরেন। তিনি বলেন, ‘জলবায়ু পরিবর্তন কোনো সীমানা চেনে না... এটি সমগ্র বিশ্বের জন্য এক সতর্কবার্তা।’বক্তব্য দেওয়ার সময় কালো স্যুট ও নেপালের ঐতিহ্যবাহী কালো টুপির সঙ্গে মিলিয়ে কালো সানগ্লাস পরেছিলেন তিনি। জনসম্মুখে তার এই নির্দিষ্ট পোশাক ও উপস্থিতি দীর্ঘদিন ধরেই আলোচনার বিষয়।জুলাই মাসে দ্য কাঠমান্ডু পোস্টের এক প্রতিবেদনে এমন একজন রাজনীতিবিদের কথা তুলে ধরা হয়, যিনি নিজের জনসম্পৃক্ত ভাবমূর্তি অত্যন্ত সতর্কতার সঙ্গে নিয়ন্ত্রণ করেন। সংবাদপত্রটির প্রতিবেদনে বলা হয়, ক্যামেরার সামনে এবং বিদেশি রাষ্ট্রদূতদের সঙ্গে বৈঠকের সময় বালেন শাহ সানগ্লাস পরে থাকেন। তবে মন্ত্রিসভার বৈঠক ও ব্যক্তিগত আলোচনার সময় তিনি সানগ্লাস খুলে ফেলেন। এ বিষয়ে মন্তব্য জানতে তার কার্যালয়ের সঙ্গে যোগাযোগ করা হলেও কোনো সাড়া পাওয়া যায়নি।বালেনের সানগ্লাস পরার এই অভ্যাস তার প্রতি মানুষের আগ্রহ ও কৌতূহল আরও বাড়িয়েছে। তিনি খুব কমই সংবাদ সম্মেলন বা সাক্ষাৎকার দেন। বরং সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের মাধ্যমে জনগণের সঙ্গে যোগাযোগ রাখতেই বেশি স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করেন।তার পরিচিত এই উপস্থিতি এখন বাণিজ্যিক আকর্ষণেও পরিণত হয়েছে। নেপালের অন্যতম বড় অনলাইন মার্কেটপ্লেস দারাজে ‘বালেন শাহ গ্লাস’ লিখে অনুসন্ধান করলে তার ব্যবহৃত চশমার আদলে তৈরি বিভিন্ন ধরনের সানগ্লাস পাওয়া যায়।রাজনীতিতে আসার অনেক আগেই সানগ্লাসের সঙ্গে বালেনের এই পরিচিতি তৈরি হয়। নেপালের আন্ডারগ্রাউন্ড হিপ-হপ অঙ্গনে দ্বিমুখী প্রতিযোগিতায় অংশ নেওয়ার সময় তিনি সানগ্লাস পরা শুরু করেন। সেই সময় ‘নেপাল স্মাইলিং’-এর মতো গান তাকে তরুণ নেপালিদের কাছে জনপ্রিয় করে তোলে।২০২২ সালে স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে কাঠমান্ডুর মেয়র নির্বাচনে জয়ী হয়ে বালেন শাহ নেপালের প্রচলিত রাজনৈতিক ধারায় বড় ধরনের চমক তৈরি করেন। তখন থেকেই কালো স্যুট ও সানগ্লাস পরা তার উপস্থিতি মূলধারার দলীয় রাজনীতির বাইরে থাকা এক ‘আউটসাইডার’ ভাবমূর্তির সঙ্গে যুক্ত হয়ে যায়।২০২৫ সালের সেপ্টেম্বরে তরুণদের নেতৃত্বে এক গণঅভ্যুত্থানের পর কে. পি. শর্মা অলির সরকারের পতন ঘটে। এরপর চলতি বছরের শুরুতে নির্বাচনী প্রচারণার সময়ও নিজের পরিচিত সেই পোশাক ও সানগ্লাসের উপস্থিতি ধরে রাখেন বালেন শাহ। মার্চে অনুষ্ঠিত সংসদীয় নির্বাচনে তার নতুন দল রাষ্ট্রীয় স্বতন্ত্র পার্টি ঐতিহাসিক নিরঙ্কুশ বিজয় অর্জন করে। প্রধানমন্ত্রী হওয়ার পথে দেশের পূর্বাঞ্চলের একটি আসনে তিনি নিজেই সাবেক প্রধানমন্ত্রী কে. পি. শর্মা অলিকে পরাজিত করেন।প্রধানমন্ত্রীর দায়িত্ব নেওয়ার পরও বালেন শাহ তার পরিচিত সানগ্লাস পরা উপস্থিতি বজায় রেখেছেন। সংসদ, রাষ্ট্রীয় অনুষ্ঠান, কুচকাওয়াজ এমনকি তার অফিসিয়াল প্রতিকৃতিতেও তাকে গাঢ় সানগ্লাস পরা অবস্থায় দেখা গেছে।তবে সবসময় যে তিনি সানগ্লাস পরেন, তা নয়। দক্ষিণ নেপালে প্রাণঘাতী হিন্দু-মুসলিম দাঙ্গার পর গত জুলাইয়ে শান্তি বজায় রাখার আহ্বান জানিয়ে দেওয়া এক ভাষণে তিনি সানগ্লাস খুলেছিলেন। দ্য কাঠমান্ডু পোস্ট তখন উল্লেখ করেছিল, পরিস্থিতির গুরুগম্ভীরতার সঙ্গে সামঞ্জস্য রাখতেই তিনি সানগ্লাস ছাড়া সরাসরি ক্যামেরার দিকে তাকিয়ে বক্তব্য দিয়েছিলেন।গত মাসে হিমালয় অঞ্চলে বিধ্বংসী বন্যায় সেতু ও পুরো শহর ভেসে যাওয়ার পর ক্ষতিগ্রস্ত এলাকা পরিদর্শনের সময়ও তাকে সানগ্লাস ছাড়া দেখা যায়। এর কয়েক মাস আগে উচ্ছ্বসিত জনসমাবেশের সামনে সানগ্লাস খুলে সমর্থকদের উদ্দেশে তিনি বলেছিলেন, ‘আমি আপনাদের ভালোবাসি।’তবে আগস্টে সংসদে তার এই সানগ্লাস পরার অভ্যাস নিয়ে আপত্তি ওঠে। সংসদীয় স্পিকার জানিয়ে দেন, প্রতিনিধি পরিষদের অধিবেশন চলাকালে গাঢ় রঙের সানগ্লাস পরা আর মেনে নেওয়া হবে না। দ্য কাঠমান্ডু পোস্টের তথ্য অনুযায়ী, স্পিকার দোল প্রসাদ আরিয়াল বলেন, সানগ্লাস পরা আইনপ্রণেতাদের নিয়ে বারবার প্রশ্ন ও সমালোচনার সৃষ্টি হচ্ছিল।এর কয়েক সপ্তাহ পর অবশ্য প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয় থেকে জানানো হয়, উজ্জ্বল আলো থেকে চোখ রক্ষা করতে চিকিৎসকরাই বালেন শাহকে সানগ্লাস ব্যবহারের পরামর্শ দিয়েছেন। ফলে দীর্ঘদিনের এই পরিচিত সানগ্লাস শুধু তার ব্যক্তিগত স্টাইলের অংশ হিসেবেই নয়, নেপালের রাজনীতিতে তার জনপরিচিতিরও একটি দৃশ্যমান বৈশিষ্ট্য হয়ে উঠেছে।

জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের অধিবেশনে নেপালের প্রধানমন্ত্রী কেন সানগ্লাস পরলেন?