ঢাকা    বুধবার, ২৮ অক্টোবর ২০২৬, ১৩ কার্তিক ১৪৩৩ ১৬ জমাদিউল আউয়াল ১৪৪৮ হিজরি
বাংলাদেশ সময়
বাংলা ভিউজ

নিরাপদ সড়ক গড়তে শুধু সরকারকে দায় দিলে হবে না: সড়কমন্ত্রী

সড়ক দুর্ঘটনা প্রতিরোধে চালকদের আচরণ পরিবর্তন ও যানবাহনের ফিটনেস নিশ্চিত করার প্রয়োজনীয়তা তুলে ধরে সড়ক পরিবহনমন্ত্রী শেখ রবিউল আলম বলেছেন, এসব বিষয়ে কথা বললেই কারও কারও মধ্যে বিরূপ প্রতিক্রিয়া দেখা যায়। পরিবহন খাতের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের আচরণ ও দায়িত্ববোধে পরিবর্তন না এলে নিরাপদ সড়ক প্রতিষ্ঠা কঠিন হবে বলেও মন্তব্য করেন তিনি।বুধবার (২৮ অক্টোবর) জাতীয় নিরাপদ সড়ক দিবস-২০২৬ উপলক্ষে সড়ক ও জনপথ অধিদপ্তরের অডিটোরিয়ামে আয়োজিত এক আলোচনা সভায় এসব কথা বলেন মন্ত্রী।অনুষ্ঠানে বক্তাদের বক্তব্য চলাকালে উপস্থিত কয়েকজন চালক উত্তেজিত হয়ে হইচই শুরু করলে তাঁদের উদ্দেশে সংযত আচরণের আহ্বান জানান শেখ রবিউল আলম।তিনি বলেন, ‘আমার ধারণা, পরিবহন খাতের সঙ্গে যারা জড়িত, তারা যেভাবে মেজাজ হারাচ্ছেন, এভাবে মেজাজ যদি পরিবহনের স্টিয়ারিং সিটে বসে হারান, তাহলে দুর্ঘটনা থেকে রেহাই পাওয়া যাবে না। আমাদের শুনতে হবে, মানতে হবে এবং কাজ করতে হবে। আমরা কেউ কারও প্রতিপক্ষ নই। এখানে যারা আছি, সবারই দায়িত্ব হচ্ছে নিরাপদ সড়ক প্রতিষ্ঠা করা।’সড়ক দুর্ঘটনায় মৃত্যু ঠেকাতে সরকার সব ধরনের কার্যকর পদক্ষেপ নিতে প্রস্তুত বলে জানান সড়ক পরিবহনমন্ত্রী।তিনি বলেন, ‘আমাকে কেউ যদি বলতে পারেন, যোগাযোগ মন্ত্রণালয় এই কাজটি বা কাজগুলো করলেই সড়কে একটি প্রাণও ঝরবে না, আমি তা-ই করব। আমাকে বলেন, কোন কাজটি করলে সড়কে একটি প্রাণও যাবে না। নিশ্চয়ই সেই দায়িত্ব নিতে চাই, সরকার সেই দায়িত্ব নিতে চায়।’মন্ত্রী জানান, প্রতিদিন সড়কে মানুষের মৃত্যু হচ্ছে এবং প্রাণহানির হার উদ্বেগজনক। তবে সব ধরনের দুর্ঘটনাকে একইভাবে মূল্যায়ন করা কিংবা প্রতিটি ঘটনার জন্য শুধু সড়ক পরিবহন মন্ত্রণালয়কে দায়ী করার প্রবণতা পরিবর্তন করা প্রয়োজন বলে মনে করেন তিনি।উদাহরণ হিসেবে প্রত্যন্ত অঞ্চলে কোনো ভ্যান উল্টে খাদে পড়ে প্রাণহানির ঘটনা ঘটলে তার পুরো দায় মন্ত্রণালয়ের ওপর চাপানো কতটা যৌক্তিক, সে প্রশ্ন তোলেন শেখ রবিউল আলম।তাঁর মতে, দুর্ঘটনার প্রকৃতি, কারণ এবং সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের দায়িত্ব বিবেচনায় নিয়েই সমস্যার সমাধান খুঁজতে হবে।সড়ক দুর্ঘটনার অন্যতম কারণ হিসেবে চালকদের সচেতনতা ও দক্ষতার অভাবের কথা তুলে ধরেন মন্ত্রী।তিনি বলেন, সড়কে নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে দক্ষ ও যোগ্য চালক প্রয়োজন। কিন্তু রাতারাতি পর্যাপ্তসংখ্যক দক্ষ চালক তৈরি করা সম্ভব নয়।এ ক্ষেত্রে পরিবহন মালিক সমিতির দায়িত্বশীল নেতাদের সক্রিয় ভূমিকা রাখার আহ্বান জানান তিনি।শেখ রবিউল আলমের ভাষ্য অনুযায়ী, পরিবহন মালিকদের মধ্যেও পরিবর্তনের আগ্রহ রয়েছে। তবে খাতটির কিছু সমস্যা দ্রুত সমাধান করা সম্ভব হচ্ছে না।তা সত্ত্বেও নিরাপদ সড়ক প্রতিষ্ঠার লক্ষ্য থেকে সরকার সরে আসেনি বলে জানান তিনি।সড়ক নিরাপত্তার উন্নয়নে সরকার ইতোমধ্যে বিভিন্ন পরিকল্পনা ও কার্যক্রম হাতে নিয়েছে বলে জানান সড়ক পরিবহনমন্ত্রী।তাঁর বক্তব্য অনুযায়ী, বেশ কিছু উদ্যোগ বাস্তবায়নাধীন রয়েছে। পাশাপাশি আন্তর্জাতিক পর্যায়ে দেওয়া অঙ্গীকার পূরণেও সরকার কাজ করছে।জাতিসংঘে দেওয়া প্রতিশ্রুতির কথা উল্লেখ করে তিনি বলেন, ২০৩০ সালের মধ্যে সড়ক দুর্ঘটনায় নিহত ও আহত মানুষের সংখ্যা অর্ধেকে নামিয়ে আনার লক্ষ্য রয়েছে।এই লক্ষ্য অর্জনে সবাইকে একযোগে কাজ করার আহ্বান জানান মন্ত্রী।তিনি বলেন, শুধু একে অন্যের ওপর দায় চাপিয়ে সমস্যার সমাধান সম্ভব নয়। সড়ক ব্যবহারকারী থেকে শুরু করে পরিবহন মালিক, শ্রমিক এবং সংশ্লিষ্ট সরকারি প্রতিষ্ঠান—সব পক্ষের দায়িত্ব রয়েছে।আলোচনা সভায় সড়ক ব্যবস্থাপনায় নাগরিকদের ভূমিকা নিয়েও কথা বলেন শেখ রবিউল আলম।তিনি জানান, অটোরিকশার কারণে রাজধানীসহ দেশের বিভিন্ন এলাকায় চলাচলে সমস্যা তৈরি হওয়ার বিষয়ে অনেকেই অভিযোগ করেন। কিন্তু যাঁরা এর বিরোধিতা করেন, তাঁদের নিজেদের ব্যবহারিক আচরণও বিবেচনা করা উচিত।অটোরিকশা নিয়ে আপত্তি জানানো ব্যক্তিরা নিজেরা সেই যানবাহন ব্যবহার বন্ধ করেছেন কি না, সে প্রশ্ন তোলেন মন্ত্রী।ফুটপাত দখলের প্রসঙ্গও সামনে আনেন তিনি।শেখ রবিউল আলম বলেন, ফুটপাতে দোকান বসিয়ে পথচারীদের চলাচলে বাধা সৃষ্টি হোক, তা কেউ চান না। কিন্তু নিজের পরিচিত ব্যক্তি কিংবা আত্মীয় ফুটপাত দখল করলে অনেকেই প্রতিবাদ করেন না।এ ধরনের আচরণ পরিবর্তন না হলে সড়ক ও নগর ব্যবস্থাপনায় কাঙ্ক্ষিত উন্নতি অর্জন কঠিন হবে বলে মন্তব্য করেন তিনি।নিরাপদ সড়ক নিশ্চিত করতে পরিবহন মালিক, শ্রমিক, প্রকৌশলী, পুলিশ ও সড়ক নিরাপত্তা বিশেষজ্ঞদের সমন্বিত উদ্যোগের আহ্বান জানিয়েছেন মন্ত্রী।তিনি বলেন, কোথায় কী ধরনের ব্যবস্থা নেওয়া প্রয়োজন, তা চিহ্নিত করে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা সুনির্দিষ্ট প্রস্তাব দিলে সরকার বাস্তবায়নে সহযোগিতা করবে।নিরাপদ সড়ক প্রতিষ্ঠায় জনসচেতনতা বাড়ানো, আচরণবিধি মেনে চলা এবং প্রত্যেকের নিজ নিজ দায়িত্ব পালনের ওপর গুরুত্ব দেন তিনি।আলোচনা সভায় আরও বক্তব্য দেন সড়ক পরিবহন ও মহাসড়ক বিভাগের প্রতিমন্ত্রী হাবিবুর রশিদ, সড়ক পরিবহন ও সেতু মন্ত্রণালয় সম্পর্কিত সংসদীয় স্থায়ী কমিটির সভাপতি রকিবুল ইসলাম, শ্রম ও কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয় সম্পর্কিত সংসদীয় স্থায়ী কমিটির সভাপতি মো. শামছুর রহমান শিমুল বিশ্বাস এবং সেতু বিভাগের সচিব মোহাম্মদ আব্দুর রউফ।এ ছাড়া বাংলাদেশ বাস-ট্রাক ওনার্স অ্যাসোসিয়েশনের সাবেক সভাপতি ফারুক তালুকদার সোহেল, বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন শ্রমিক ফেডারেশনের সভাপতি আবদুর রহিম বক্স দুদু ও সাধারণ সম্পাদক হুমায়ুন কবির খান এবং বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন মালিক সমিতির সাধারণ সম্পাদক সাইফুল আলম বক্তব্য দেন।

নিরাপদ সড়ক গড়তে শুধু সরকারকে দায় দিলে হবে না: সড়কমন্ত্রী