ঢাকা    বুধবার, ২৮ অক্টোবর ২০২৬, ১২ কার্তিক ১৪৩৩ ১৬ জমাদিউল আউয়াল ১৪৪৮ হিজরি
বাংলাদেশ সময়
বাংলা ভিউজ

চীনের প্রতিযোগিতার মাঝে ভারতমুখী হচ্ছে জাপান

চীনের সঙ্গে অর্থনৈতিক ও কৌশলগত প্রতিযোগিতা এবং পরিবর্তিত বৈশ্বিক ভূরাজনৈতিক পরিস্থিতিতে ভারতের সঙ্গে সম্পর্ক আরও বিস্তৃত করছে জাপান। জাপানের প্রধানমন্ত্রী সানায়ে তাকাইচির সাম্প্রতিক ভারত সফরে বাণিজ্য ও বিনিয়োগের পাশাপাশি প্রতিরক্ষা, সেমিকন্ডাক্টর, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই), জ্বালানি, প্রযুক্তি ও সরবরাহব্যবস্থার মতো গুরুত্বপূর্ণ খাতে সহযোগিতা জোরদারের বিষয়ে সমঝোতা হয়েছে।দিল্লিতে অনুষ্ঠিত ১৬তম জাপান-ভারত বার্ষিক শীর্ষ সম্মেলনের মধ্য দিয়ে দুই দেশের সম্পর্ক অর্থনৈতিক অংশীদারত্বের গণ্ডি ছাড়িয়ে ইন্দো-প্যাসিফিক অঞ্চলের নিরাপত্তা ও অর্থনৈতিক সুরক্ষার ক্ষেত্রেও আরও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠছে।কোয়াডের আওতায় ‘মুক্ত ও উন্মুক্ত ভারত-প্রশান্ত মহাসাগরীয় এলাকা’ গড়ে তোলার পাশাপাশি তথ্যপ্রযুক্তি ও এআই খাতে দক্ষ মানবসম্পদ আদান-প্রদান এবং শিক্ষার্থী বিনিময়ের মাধ্যমে দুই দেশের মানুষের মধ্যে যোগাযোগ বাড়ানোর বিষয়ে ঐকমত্য হয়েছে।প্রতিরক্ষা ও নিরাপত্তা সহযোগিতার ক্ষেত্রেও অগ্রগতি হয়েছে। ইয়োকোসুকায় অনুষ্ঠিত ‘জাইমেক্স ২৫’ নৌমহড়ার ধারাবাহিকতায় ভারতীয় নৌবাহিনী ও জাপানের মেরিটাইম সেলফ-ডিফেন্স ফোর্সের মধ্যে সামুদ্রিক নিরাপত্তা সহযোগিতা আরও শক্তিশালী করার অঙ্গীকার করা হয়েছে।একই সঙ্গে জাপানের মোগামি-ক্লাস ফ্রিগেটে ব্যবহৃত উন্নত স্টিলথ প্রযুক্তি ‘ইউনিকর্ন’ বা ইউনিফাইড কমপ্লেক্স রেডিও অ্যান্টেনা ভারতে হস্তান্তরের বিষয়ে নীতিগত চুক্তি হয়েছে। এই প্রযুক্তি ভারতের প্রতিরক্ষা সক্ষমতা বাড়াতে ভূমিকা রাখবে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।অর্থনৈতিক ও কৌশলগত নিরাপত্তার জন্য পাঁচটি খাতকে অগ্রাধিকার দেওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছে টোকিও ও নয়াদিল্লি। এগুলো হলো সেমিকন্ডাক্টর, বিরল খনিজ পদার্থ, আইসিটি, পরিচ্ছন্ন জ্বালানি এবং ওষুধ। বৈশ্বিক সরবরাহব্যবস্থা সচল রাখার ক্ষেত্রেও এসব খাতকে গুরুত্বপূর্ণ হিসেবে দেখা হচ্ছে।ভারতে জাপানি ব্যবসার বিস্তার একসময় তুলনামূলক ধীর ছিল। ১৯৮১ সালে প্রতিষ্ঠিত মারুতি সুজুকি ছিল এর বড় ব্যতিক্রম। ২০০৫ সালে তৎকালীন জাপানি প্রধানমন্ত্রী কোইজুমি জুনিচিরোর ভারত সফরের পর বার্ষিক শীর্ষ সম্মেলন শুরু হলে দুই দেশের রাজনৈতিক ও কূটনৈতিক সম্পর্কেও নতুন গতি আসে।জাপান এক্সটার্নাল ট্রেড অর্গানাইজেশনের (জেট্রো) তথ্য অনুযায়ী, ২০২৪ সালের অক্টোবর পর্যন্ত ভারতের ৫ হাজার ২০৫টি স্থানে ১ হাজার ৪৩৪টি জাপানি প্রতিষ্ঠান কার্যক্রম পরিচালনা করছিল। চীনের ৩০ হাজার স্থানের তুলনায় এ সংখ্যা কম হলেও মহামারী-পরবর্তী সময়ে সুজুকি, ব্রিজস্টোন ও ইউনিচার্মের মতো বড় প্রতিষ্ঠান ভারতে দ্বিতীয় বা তৃতীয় কারখানা স্থাপনের মাধ্যমে ব্যবসা সম্প্রসারণ করেছে।জাপানি বিনিয়োগ এখন অটোমোবাইল ও ইলেকট্রনিকসের মতো প্রচলিত খাতের মধ্যেও সীমাবদ্ধ নেই। ফ্যাশন ব্র্যান্ড ইউনিক্লো পাঁচ বছরের মধ্যে ভারতে ১০০টি স্টোর চালুর পরিকল্পনা করেছে। ৭-ইলেভেন ফ্র্যাঞ্চাইজি ব্যবস্থায় ৬০টির বেশি আউটলেট পরিচালনা করছে এবং নিতোরি মুম্বাইয়ে কার্যক্রম শুরু করেছে।ভারী শিল্পেও বিনিয়োগ বাড়ছে। নিপ্পন স্টিল আর্সেলরমিত্তালের সঙ্গে যৌথ উদ্যোগে ভারতে ১ ট্রিলিয়ন ইয়েনের বেশি বিনিয়োগ করে কারখানা সম্প্রসারণ করেছে। সানটোরি, সুমিতোমো রিয়েলটি, ওসাকা গ্যাস ও মোনোটারোর মতো প্রতিষ্ঠানও ভারতকেন্দ্রিক পরিকল্পনা বাস্তবায়নে সক্রিয় রয়েছে।গত বছরের আগস্টে জাপানের তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী ইশিবা শিগেরু ও ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদীর বৈঠকে আগামী ১০ বছরে ১০ ট্রিলিয়ন ইয়েন বিনিয়োগের লক্ষ্য ঘোষণা করা হয়েছিল। সেই লক্ষ্য এগিয়ে নিতে এবারের সম্মেলনে বেশ কয়েকটি সমঝোতা স্মারক স্বাক্ষর হয়েছে। প্রধানমন্ত্রী তাকাইচির উপস্থিতিতে গত এক বছরে ঘোষিত ২ ট্রিলিয়ন ইয়েন বিনিয়োগের বিস্তারিতও তুলে ধরা হয়।দুই দেশের শীর্ষ নেতাদের উপস্থিতিতে অনুষ্ঠিত জয়েন্ট ইকোনমিক ফোরামে ১৫০টির বেশি জাপানি এবং ৮০টির বেশি ভারতীয় প্রতিষ্ঠানের শীর্ষ প্রতিনিধিরা অংশ নেন।প্রযুক্তি ও অবকাঠামো খাতেও সহযোগিতা সম্প্রসারিত হচ্ছে। ভারতের ‘লুপেক্স’ মহাকাশ মিশন থেকে শুরু করে পুনর্ব্যবহারযোগ্য অ্যামোনিয়া উৎপাদন, বায়োমিথেন প্রকল্প এবং ইস্পাত কারখানার গ্যাস প্ল্যান্ট পরিচালনায় চুক্তি হয়েছে।জাপানের সহায়তায় নির্মিত দিল্লি মেট্রো বর্তমানে ৪১৬ কিলোমিটার পর্যন্ত বিস্তৃত হয়েছে, যা টোকিও সাবওয়ে নেটওয়ার্ককেও ছাড়িয়ে গেছে। একই ধারাবাহিকতায় ৮০০ কোটি মার্কিন ডলার বা প্রায় ১ দশমিক ৮ ট্রিলিয়ন ইয়েন ঋণে আহমেদাবাদ থেকে মুম্বাই পর্যন্ত ভারতের প্রথম ‘বুলেট ট্রেন’ বা শিনকানসেন প্রকল্প নির্মাণ করা হচ্ছে। প্রকল্পটি ২০২৭ সালের আগস্ট নাগাদ আংশিক চালুর কথা রয়েছে।জাপান ব্যাংক ফর ইন্টারন্যাশনাল কোপারেশনের (জেবিআইসি) জরিপে টানা চতুর্থ বছরের মতো জাপানি কোম্পানিগুলোর কাছে আগামী তিন বছরে ব্যবসা সম্প্রসারণের জন্য ভারত ‘সবচেয়ে সম্ভাবনাময়’ গন্তব্য হিসেবে বিবেচিত হয়েছে। জেট্রোর হিসাবে, ভারতে ব্যবসা করা ৭৫ দশমিক ৫ শতাংশ জাপানি প্রতিষ্ঠান চলতি অর্থবছরে মুনাফার আশা করছে।২০০০ সাল থেকে ২০২৬ সালের মার্চ পর্যন্ত ভারতে জাপানের সরাসরি বৈদেশিক বিনিয়োগ ৪৮ দশমিক ১ বিলিয়ন ডলারে পৌঁছেছে। বর্তমানে দুই দেশের বার্ষিক বাণিজ্য ২৫ বিলিয়ন ডলার ছাড়িয়েছে।তবে ভারতের বহুমুখী ও স্বাধীন কূটনৈতিক অবস্থানের কারণে দুই দেশের সম্পর্কের পথ সবসময় সরল নয়। যুক্তরাষ্ট্রের ট্যারিফ চাপ উপেক্ষা করা, রাশিয়ার সঙ্গে নিজস্ব স্বার্থ অনুযায়ী জ্বালানি বাণিজ্য বজায় রাখা এবং চীন থেকে শর্তসাপেক্ষে বিনিয়োগ গ্রহণ—এসব পদক্ষেপ ভারতের নিজস্ব কৌশলগত অবস্থানের প্রতিফলন হিসেবে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।অন্যদিকে বিজ্ঞান ও প্রযুক্তিতে দক্ষ মানবসম্পদের সংকট এবং জনসংখ্যা হ্রাসের চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় ভারতের বাজার, প্রযুক্তি ও বিশেষজ্ঞদের প্রতি জাপানের আগ্রহ ক্রমেই বাড়ছে।

চীনের প্রতিযোগিতার মাঝে ভারতমুখী হচ্ছে জাপান