তুরস্কের সংসদে মক্কা প্রতিরক্ষা চুক্তির পূর্ণাঙ্গ পাঠ পেশ
তুরস্ক, সৌদি আরব ও পাকিস্তানের মধ্যে স্বাক্ষরিত বহুল আলোচিত ‘মক্কা প্রতিরক্ষা চুক্তি’র পূর্ণাঙ্গ পাঠ আনুষ্ঠানিকভাবে নিজ দেশের সংসদে উপস্থাপন করেছে তুরস্কের সরকার। চুক্তির মূল নীতি অনুযায়ী, এই তিন দেশের যেকোনো একটির ওপর কোনো বিদেশি শক্তির সশস্ত্র বা সামরিক হামলা হলে, তা বাকি দুই দেশের ওপরও যৌথ আক্রমণ হিসেবে গণ্য করা হবে। এ ধরনের পরিস্থিতিতে আক্রান্ত মিত্র দেশকে রক্ষা করতে অপর সদস্য দেশগুলো নিজস্ব পূর্ণ সামরিক সক্ষমতা, অস্ত্র ও রসদ সরবরাহসহ প্রয়োজনীয় সব উপায়ে সক্রিয় সহায়তা দিতে বাধ্য থাকবে। আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যম মিডল ইস্ট আই (Middle East Eye) ১৬টি অনুচ্ছেদে বিন্যস্ত এই ঐতিহাসিক ও কৌশলগত চুক্তির পূর্ণাঙ্গ পাঠ এককভাবে সংগ্রহ করে প্রকাশ করেছে।গত আগস্টে স্বাক্ষরিত এই চুক্তির মাধ্যমে মধ্যপ্রাচ্য ও দক্ষিণ এশিয়ার সংযোগস্থলে সম্পূর্ণ নতুন ধরনের একটি আন্তর্জাতিক প্রতিরক্ষা বলয় গড়ে তোলা হয়েছে। সামরিক বিশ্লেষকরা একে সরাসরি উত্তর আটলান্টিক নিরাপত্তা জোটের (ন্যাটো) বিখ্যাত ৫ নম্বর অনুচ্ছেদের সঙ্গে তুলনা করছেন। চুক্তিতে কোনো নির্দিষ্ট রাষ্ট্র বা অঞ্চলকে আগাম শত্রু হিসেবে চিহ্নিত করা না হলেও জাতিসংঘের সনদের ৫১ নম্বর অনুচ্ছেদে স্বীকৃত যৌথ আত্মরক্ষার অধিকার নিশ্চিত করতে বলা হয়েছে। প্রথম ও দ্বিতীয় অনুচ্ছেদে স্পষ্ট উল্লেখ রয়েছে—কোনো সদস্য দেশের ভৌগোলিক অখণ্ডতা, সার্বভৌমত্ব ও আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত সীমান্ত বিপন্ন হলে বাকি দেশগুলো তা পুনরুদ্ধারে প্রয়োজনীয় সামরিক পদক্ষেপ নেবে।প্রতিরক্ষা ও নিরাপত্তা খাতের সামগ্রিক বিকাশ নিশ্চিত করতে চুক্তিতে ব্যাপকভিত্তিক প্রযুক্তিগত ও গোয়েন্দা সহযোগিতার রূপরেখা রাখা হয়েছে। এর আওতায় সদস্য দেশগুলো যৌথভাবে সমরাস্ত্র ও সামরিক প্রযুক্তি উদ্ভাবন ও উৎপাদন করবে এবং প্রতিরক্ষা কর্মীদের বিশেষায়িত প্রশিক্ষণ দেবে। শান্তিকাল ও যুদ্ধকালীন উভয় পরিস্থিতিতেই সদস্য রাষ্ট্রগুলো নিজেদের মধ্যে অস্ত্র, গোলাবারুদ, খুচরা যন্ত্রাংশ এবং জ্বালানি বিনিময়ের সুবিধা ভোগ করবে। এ ছাড়া নিরাপদ ও সুরক্ষিত চ্যানেলের মাধ্যমে নিয়মিত সামরিক গোয়েন্দা তথ্য আদান-প্রদানের বাধ্যবাধকতা রাখা হয়েছে।যৌথ প্রতিরক্ষার কৌশলগত নীতি নির্ধারণে তিন দেশের পররাষ্ট্রমন্ত্রী, প্রতিরক্ষামন্ত্রী ও সশস্ত্র বাহিনীর প্রধানদের নিয়ে একটি উচ্চক্ষমতাসম্পন্ন ‘কৌশলগত রাজনৈতিক ও প্রতিরক্ষা কমিটি’ গঠন করা হবে। এই কমিটি বছরে দুবার আনুষ্ঠানিক বৈঠকে বসবে এবং প্রয়োজনবোধে তিন দেশের শীর্ষ রাষ্ট্রপ্রধানেরা বছরে অন্তত একবার শীর্ষ সম্মেলনে মিলিত হবেন। সর্বসম্মতির ভিত্তিতে ভবিষ্যতে নতুন কোনো রাষ্ট্রকে এই জোটে যুক্ত করার ক্ষমতাও কমিটির ওপর ন্যস্ত থাকবে। চুক্তি বাস্তবায়নে সৌদি আরবের রাজধানী রিয়াদে স্থায়ী একটি সচিবালয় গড়ে তোলা হবে, যার প্রধান হিসেবে তিন বছরের জন্য পালাক্রমে একজন মহাসচিব নিযুক্ত হবেন। চুক্তির শর্তানুযায়ী, প্রথম মহাসচিব মনোনীত হবেন পাকিস্তানের কোনো জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা।আইনি কাঠামোর দিক থেকে এই চুক্তি অনির্দিষ্টকালের জন্য কার্যকর থাকবে। তবে চুক্তি কার্যকর হওয়ার প্রথম ১০ বছর কোনো সদস্য রাষ্ট্র এটি থেকে নিজেদের প্রত্যাহার করতে পারবে না। ১০ বছর পার হওয়ার পর কোনো দেশ সরে যেতে চাইলে অন্তত তিন মাস আগে অন্য শরিকদের লিখিত নোটিশ দিতে হবে। তুর্কি, আরবি ও ইংরেজি ভাষায় সমমর্যাদায় চুক্তিটি স্বাক্ষরিত হলেও যেকোনো বিরোধে ইংরেজি ভাষ্যটিই চূড়ান্ত আইনি প্রামাণ্য হিসেবে বিবেচিত হবে। তিন দেশের অভ্যন্তরীণ সাংবিধানিক ও সংসদীয় অনুমোদন সম্পন্ন করে সচিবালয়ে দলিল জমা হওয়ার দিন থেকেই এই চুক্তি আনুষ্ঠানিকভাবে কার্যকর হবে।