ঢাকা    শনিবার, ৩১ অক্টোবর ২০২৬, ১৬ কার্তিক ১৪৩৩ ১৯ জমাদিউল আউয়াল ১৪৪৮ হিজরি
বাংলাদেশ সময়
বাংলা ভিউজ

বিএনপি ও জামায়াতের বিরোধের কেন্দ্রে সংবিধান ও কথিত আঁতাত

বাংলাদেশের রাজনীতিতে একসময়ের মিত্র দল বিএনপি ও জামায়াতে ইসলামীর মধ্যকার টানাপোড়েন এখন আর কোনো অপ্রকাশ্য বিষয় নয়। সংবিধানের মৌলিক সংস্কার ও ‘জুলাই জাতীয় সনদ’ বাস্তবায়নকে কেন্দ্র করে দুই দলের মধ্যকার দীর্ঘদিনের আদর্শিক ও কৌশলগত দূরত্ব এখন প্রকাশ্য রূপ নিয়েছে। সম্প্রতি এই মতবিরোধের সঙ্গে যুক্ত হয়েছে ক্ষমতাচ্যুত দল আওয়ামী লীগের সঙ্গে কথিত রাজনৈতিক আঁতাত ও গোপন সমঝোতার স্পর্শকাতর পাল্টাপাল্টি অভিযোগ।বিএনপির শীর্ষ নেতৃত্বের পক্ষ থেকে জামায়াতের বিরুদ্ধে সরকারবিরোধী কর্মকাণ্ডে আওয়ামী লীগের সহায়তা নেওয়ার ইঙ্গিত দেওয়া হলে জামায়াত তা জোরালোভাবে প্রত্যাখ্যান করে। একই সঙ্গে তারা উল্টো বিএনপির বিরুদ্ধেই আওয়ামী লীগের সঙ্গে নেপথ্য সমঝোতার পাল্টা অভিযোগ উত্থাপন করেছে।বিতর্কের সূত্রপাত ঘটে সম্প্রতি রাজশাহীর এক জনসভায় প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের এক বক্তব্যের পর। তিনি অভিযোগ করেন, দেশের বিভিন্ন শিল্পাঞ্চলে শ্রমিক অসন্তোষ সৃষ্টির পেছনে ক্ষমতাচ্যুত আওয়ামী লীগের অর্থায়ন রয়েছে এবং সীমান্তের ওপার থেকে অর্থ পাঠিয়ে দেশের ভেতরের একটি রাজনৈতিক শক্তিকে ব্যবহার করে অস্থিতিশীলতা তৈরির অপচেষ্টা চলছে।প্রধানমন্ত্রীর বক্তব্যের ধারাবাহিকতায় বিএনপির ভারপ্রাপ্ত মহাসচিব ও প্রধানমন্ত্রীর রাজনৈতিক উপদেষ্টা রুহুল কবির রিজভী দাবি করেন, জামায়াতের বর্তমান সরকারবিরোধী কর্মসূচিতে আওয়ামী লীগের গোপন সংশ্লিষ্টতা থাকার বিষয়ে জনমনে স্পষ্ট সন্দেহ রয়েছে। তিনি মন্তব্য করেন, গোপনে একটি বিশেষ পক্ষের সঙ্গে যোগসাজশ করে সরকারকে দ্রুত ক্ষমতাচ্যুত করার চেষ্টায় হিতে বিপরীত পরিস্থিতি তৈরি হতে পারে। বিএনপি নেতাদের দাবি, শুধু রাজনৈতিক চাপ নয়, বরং সুনির্দিষ্ট গোয়েন্দা তথ্যের ভিত্তিতেই তাঁরা এই আঁতাতের বিষয়ে সতর্ক করছেন।অন্যদিকে বিএনপির এই বক্তব্যকে সম্পূর্ণ ভিত্তিহীন ও রাজনৈতিক বিভ্রান্তি সৃষ্টির অপচেষ্টা বলে আখ্যা দিয়েছেন জামায়াতের সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল হামিদুর রহমান আযাদ। তিনি তীব্র ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, যে আওয়ামী লীগ জামায়াতের শীর্ষ নেতাদের বিচারিক প্রক্রিয়ায় ফাঁসি দিয়েছে, দীর্ঘ বছর দলীয় কার্যালয় সিলগালা করে রেখেছিল এবং প্রকাশ্য কর্মকাণ্ড নিষিদ্ধ করেছিল—সেই দলের সঙ্গে জামায়াতের আঁতাতের অভিযোগ পুরোপুরি অবিশ্বাস্য। তিনি উল্টো দাবি করেন, আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় থাকাকালে বিএনপি তুলনামূলকভাবে রাজনৈতিক কর্মসূচি পালনের ছাড় পেলেও জামায়াতকে চরম রাষ্ট্রীয় নিগ্রহের শিকার হতে হয়েছে। আযাদের মতে, জুলাই সনদ ও গণভোটের রায় কার্যকর করার মূল দাবি থেকে জনগণের দৃষ্টি অন্যদিকে সরাতেই বিএনপি পরিকল্পিতভাবে আওয়ামী লীগের প্রসঙ্গটি সামনে আনছে।রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, বিএনপি ও জামায়াতের বর্তমান বিরোধের মূল জায়গাটি নিহিত রয়েছে রাষ্ট্র সংস্কার ও সংবিধানের রূপরেখায়। জামায়াতসহ ১১-দলীয় জোট গণভোটে অনুমোদিত ‘জুলাই জাতীয় সনদ’ অবিকল বাস্তবায়নের দাবি জানাচ্ছে এবং সংবিধানে মৌলিক পরিবর্তনের ওপর জোর দিচ্ছে। অন্যদিকে বিএনপি সনদের কিছু বিতর্কিত বিষয়ে দেওয়া ‘নোট অব ডিসেন্ট’ বহাল রেখে বিদ্যমান সাংবিধানিক কাঠামোর ভেতর প্রয়োজনীয় সংশোধনের পক্ষে অনড়। দুই পক্ষের অনমনীয় অবস্থানের কারণে সংসদে সংবিধান সংস্কারের উদ্যোগ কার্যত বর্জন করেছে বিরোধী দলগুলো, যার ফলে রাজনৈতিক অঙ্গনে বড় ধরনের অচলাবস্থা বিরাজ করছে।এদিকে নিষিদ্ধঘোষিত আওয়ামী লীগের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক আ ফ ম বাহাউদ্দীন নাসিম এক প্রতিক্রিয়ায় দাবি করেছেন, আওয়ামী লীগ কারও সঙ্গে আঁতাত করে রাজনীতি করে না এবং বিএনপি, জামায়াত ও এনসিপির মধ্যে কার্যত কোনো মৌলিক আদর্শগত পার্থক্য নেই।এ বিষয়ে জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক সাঈদ ফেরদৌস মন্তব্য করেন, দুই দল যেভাবে পরস্পরের বিরুদ্ধে আওয়ামী লীগের সঙ্গে আঁতাতের অভিযোগ তুলছে, তাতে কার্যত ক্ষমতাচ্যুত ও নিষিদ্ধ একটি দলকেই আবার রাজনীতির আলোচনার কেন্দ্রে টেনে আনা হচ্ছে। জনগণের আসল সংকট ও রাষ্ট্র বিনির্মাণের গঠনমূলক আলোচনার পরিবর্তে দলগুলোর এমন দোষারোপের রাজনীতি দেশে কাঙ্ক্ষিত গণতান্ত্রিক স্থিতিশীলতা অর্জনে প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করতে পারে।সূত্র: বিবিসি বাংলা

বিএনপি ও জামায়াতের বিরোধের কেন্দ্রে সংবিধান ও কথিত আঁতাত