মঙ্গলের উপগ্রহ ফোবোস থেকে নমুনা সংগ্রহে জাপানের ঐতিহাসিক অভিযান
সৌরজগতের সৃষ্টিতত্ত্ব এবং পৃথিবীতে প্রাণের আদি উদ্ভবের রহস্য উন্মোচনের লক্ষ্যে লাল গ্রহ মঙ্গলের রহস্যময় উপগ্রহ ‘ফোবোস’ থেকে মাটির নমুনা সংগ্রহ করে পৃথিবীতে ফিরিয়ে আনার এক ঐতিহাসিক মহাকাশ অভিযানে নেমেছে জাপান। দেশটির মহাকাশ গবেষণা সংস্থা ‘জাকসা’ (JAXA)-র এই উচ্চাভিলাষী ‘মার্শিয়ান মুনস এক্সপ্লোরেশন’ বা ‘এমএমএক্স’ (MMX) মিশন সফল হলে মঙ্গল অঞ্চলে গিয়ে সেখান থেকে অক্ষত নমুনা সংগ্রহ করে পৃথিবীতে প্রত্যাবর্তনের ক্ষেত্রে এটিই হবে বিশ্বের প্রথম কোনো সফল মহাকাশ অভিযান।জাকসার তথ্য অনুযায়ী, মঙ্গলবার ভোর ৪টা ৪১ মিনিটে (বাংলাদেশ সময় সোমবার দিবাগত রাত ১টা ৪১ মিনিট) দেশটির দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলীয় তানেগাশিমা মহাকাশকেন্দ্র থেকে নিজস্ব তৈরি সর্বাধুনিক এইচ-৩ (H3) ভারী রকেটের সাহায্যে এমএমএক্স মহাকাশযানটি উৎক্ষেপণ করার চূড়ান্ত সময়সূচি নির্ধারিত হয়েছে।মহাকাশ গবেষণা সংস্থার পরিকল্পনা অনুযায়ী, পৃথিবী থেকে দীর্ঘ পথ পাড়ি দিয়ে উৎক্ষেপণের প্রায় এক বছর পর মহাকাশযানটি মঙ্গলের কক্ষপথে পৌঁছাবে। এরপর এটি মঙ্গলের প্রধান উপগ্রহ ফোবোসের অতি কাছাকাছি গিয়ে সর্বোচ্চ তিন বছর ধরে প্রদক্ষিণ ও পর্যবেক্ষণ চালাবে। ফোবোসের বুকে মহাকাশযান অবতরণের উপযুক্ত স্থান খুঁজে বের করতে আগেভাগে ‘আইডেফিক্স’ (Ideflix) নামের একটি উন্নত রোভার উপগ্রহটির পৃষ্ঠে নামানো হবে। রোভারটির তথ্য বিশ্লেষণ শেষে মূল মহাকাশযানটি ফোবোসের বুকে আলতোভাবে অবতরণ করে সেখানকার ভূগর্ভ ও পৃষ্ঠ থেকে অন্তত ১০ গ্রাম শিলা ও ধূলিকণার নমুনা সংগ্রহ করবে। ফোবোসে বৈজ্ঞানিক অনুসন্ধান ছাড়াও মঙ্গলের অপর উপগ্রহ ‘ডেইমোস’ পর্যবেক্ষণ করে সংগৃহীত মহামূল্যবান নমুনা নিয়ে ২০৩১ সালের দিকে মহাকাশযানটির পৃথিবীতে ফিরে আসার কথা রয়েছে।বিজ্ঞানীদের অন্যতম প্রধান লক্ষ্য হলো মঙ্গলের দুটি উপগ্রহের জন্মরহস্য উদঘাটন করা। সৌরজগতে এদের উৎপত্তি নিয়ে দুটি বড় তত্ত্ব প্রচলিত—একটি হলো ‘দৈত্যাকার সংঘর্ষ’ (কোনো মহাজাগতিক বস্তুর সঙ্গে মঙ্গলের সংঘর্ষে এদের সৃষ্টি) এবং অন্যটি ‘মহাকর্ষীয় ফাঁদ’ (গ্রহাণু হিসেবে ভেসে যাওয়ার সময় মঙ্গলের টানে আটকে পড়া)। এই প্রকল্পের সঙ্গে যুক্ত ফরাসি জ্যোতির্বিজ্ঞানী প্যাট্রিক মিশেল জানান, বাইরের সৌরজগৎ থেকে কীভাবে পানি ও উদ্বায়ী জৈব পদার্থ পাথুরে গ্রহগুলোতে পৌঁছে সেগুলোকে প্রাণধারণের উপযোগী করেছিল, এই নমুনা থেকে সেই প্রক্রিয়াটি স্পষ্টভাবে বোঝা যাবে।তবে ফোবোসের অত্যন্ত দুর্বল মহাকর্ষীয় বলের কারণে সেখানে মহাকাশযান অবতরণ করানোকে এই অভিযানের সবচেয়ে কঠিন ও জটিল চ্যালেঞ্জ হিসেবে দেখা হচ্ছে। এর আগে ২০২০ সালে গ্রহাণু রায়গু থেকে ‘হায়াবুসা-২’ মিশনের মাধ্যমে ৫.৪ গ্রাম কণা পৃথিবীতে এনে কৃতিত্ব দেখিয়েছিল জাপান। তবে মঙ্গলের শক্তিশালী মহাকর্ষ অতিক্রম করে সেখান থেকে উপগ্রহের উপাদান নিয়ে ফেরা আগের সব অভিযানের চেয়ে প্রযুক্তিগতভাবে অনেক বেশি ঝুঁকিপূর্ণ।মঙ্গল থেকে সরাসরি উপাদান ফিরিয়ে আনার প্রতিযোগিতায় বর্তমানে মার্কিন মহাকাশ গবেষণা সংস্থা নাসা এবং চীনও সক্রিয় রয়েছে। তবে নাসা ২০২১ সাল থেকে ‘পারসিভিয়ারেন্স’ রোভার দিয়ে নমুনা জমা করলেও ডোনাল্ড ট্রাম্প প্রশাসনের বাজেট ছাঁটাইয়ে তা ফেরত আনার মার্কিন পরিকল্পনা কার্যত ঝুলে গেছে। অন্যদিকে চীন তাদের ‘তিয়ানওয়েন-৩’ মিশনের মাধ্যমে ২০৩১ সালের মধ্যে মঙ্গলের মাটি আনার লক্ষ্য নির্ধারণ করেছে। তবে জাপানি বিজ্ঞানীদের দাবি, সরাসরি মঙ্গলের চেয়ে ফোবোসের বালুকণায় কোটি কোটি বছরের মহাজাগতিক ইতিহাসের আরও বহুবিধ ও অমূল্য তথ্য সুরক্ষিত রয়েছে।সূত্র: জিও নিউজ