ঢাকা    রোববার, ০১ নভেম্বর ২০২৬, ১৭ কার্তিক ১৪৩৩ ২০ জমাদিউল আউয়াল ১৪৪৮ হিজরি
বাংলাদেশ সময়
বাংলা ভিউজ

ফ্ল্যাট ও জমির শেয়ার বিক্রির নামে শতকোটি টাকা আত্মসাৎ

কম খরচে নিজস্ব ফ্ল্যাটের মালিক হওয়ার স্বপ্ন দেখিয়ে রাজধানীতে গড়ে উঠেছে অনুমোদনহীন বহু ডেভেলপার কোম্পানি। তবে ফ্ল্যাট পাওয়ার আশায় জীবনের সব সঞ্চয় তুলে দিয়ে এখন উল্টো পথে হাঁটছেন হাজার হাজার ভুক্তভোগী। টাকা পরিশোধের পর ফ্ল্যাট তো মেলেইনি, উল্টো একই জমি বা ফ্ল্যাটের শেয়ার একাধিক ব্যক্তির কাছে বিক্রি করে শতকোটি টাকা হাতিয়ে নিয়ে গা-ঢাকা দিয়েছে প্রতারক চক্রগুলো।ভুক্তভোগীদের মধ্যে হাবিবুর রহমান আজাদ নামের এক ব্যক্তি ‘ডোম ইনো’ ইমপ্লিসিটো প্রকল্পে একটি শেয়ারের বিপরীতে ১ হাজার ৪০০ বর্গফুটের ফ্ল্যাট পাওয়ার শর্তে কিস্তিতে ৮৫ লাখ টাকা পরিশোধ করেন। পরে তিনি জানতে পারেন, একই ফ্ল্যাটের শেয়ার বিক্রি করা হয়েছে একাধিক ব্যক্তির কাছে এবং সংশ্লিষ্ট জমি নিয়ে আদালতে আগে থেকেই মামলা চলছে। একইভাবে পশ্চিম মেরুল বাড্ডার ‘আমার বাড়ি আমার ঘর’ ডেভেলপার কোম্পানির বিরুদ্ধে ১৪৯ জন শেয়ার ক্রেতার প্রায় ৭০ কোটি টাকা আত্মসাতের অভিযোগে ৬৫ জন ক্রেতা আদালতে মামলা করেছেন। এছাড়া আফতাবনগরের ‘শেয়ার ল্যান্ড বিল্ড হোম’-এর বিরুদ্ধে শতাধিক গ্রাহকের কাছ থেকে অন্তত ৩০ কোটি টাকা হাতিয়ে নেওয়ার অভিযোগ উঠেছে।আদালত সূত্রে জানা গেছে, চলতি বছরের ১ অক্টোবর পর্যন্ত সারা দেশে জমির শেয়ারভিত্তিক আবাসন প্রকল্পে প্রতারণার অভিযোগে ৯ হাজার ৯০৩টি মামলা বিচারাধীন রয়েছে। এর মধ্যে ঢাকা মহানগর ও জেলা জজ আদালতেই চলছে ৫ হাজার ৯৪৮টি মামলা। এছাড়া মুন্সীগঞ্জে ৫৩৮টি, চট্টগ্রামে ৩৮৬টি, নারায়ণগঞ্জে ২৮৬টি এবং সিলেটে ২১৩টি মামলার বিচার চলছে। এসব মামলায় অন্তত ৪০ হাজার ভুক্তভোগী ক্রেতা নিজেদের পাওনা ও বিচার পেতে আদালতের দ্বারে দ্বারে ঘুরছেন।তদন্ত ও মামলার এজাহার পর্যালোচনায় দেখা যায়, কেরানীগঞ্জ, আমিনবাজার, বছিলা, রূপগঞ্জ, সাভার, আশুলিয়া ও হেমায়েতপুরের মতো ঢাকার আশপাশের এলাকাগুলোতে এ ধরনের প্রতারণা সবচেয়ে বেশি ঘটছে। প্রথমে কোনো একটি জমিতে প্রকল্প ও কোম্পানির সাইনবোর্ড ঝুলিয়ে গ্রাহকদের আকৃষ্ট করা হয়। এরপর প্রাথমিক রসিদের মাধ্যমে ৭ থেকে ১০ লাখ বা তারও বেশি টাকা নিয়ে পুরো শেয়ার বিক্রি শেষ হলে সাইনবোর্ড ফেলে লাপাত্তা হয়ে যায় প্রতারক চক্র। কোনো কোনো ক্ষেত্রে জমির পরিমাণের চেয়ে কয়েক গুণ বেশি শেয়ার বিক্রি এবং সরকারি খাসজমি দেখিয়ে প্রতারণার নজিরও মিলেছে। অভিযুক্ত এসব প্রতিষ্ঠানের কোনোটিই রিয়েল এস্টেট অ্যান্ড হাউজিং অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (রিহ্যাব) সদস্য নয়।অন্যদিকে শেয়ারভিত্তিক প্রকল্পের বাইরেও প্লট বরাদ্দের নামে অর্থ লোপাট চলছে। রূপগঞ্জে বেস্টওয়ে ল্যান্ড প্রোপার্টিজ অন্তত ৩৭ জন গ্রাহকের ৭ কোটি ২ লাখ টাকা নিয়ে জমি না দেওয়ায় সিআইডি তাদের ব্যবস্থাপনা পরিচালককে গ্রেপ্তার করেছে। উত্তরায় রাজউকের প্লট দেওয়ার কথা বলে এক ব্যবসায়ীর ৬ কোটি ২৩ লাখ টাকা আত্মসাতের ঘটনাও ঘটেছে।আইন বিশেষজ্ঞরা বলছেন, চটকদার বিজ্ঞাপন, আকর্ষণীয় নকশা কিংবা কোম্পানির ট্রেড লাইসেন্স দেখে বিনিয়োগ করা চরম ঝুঁকিপূর্ণ। সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী ব্যারিস্টার শিহাব উদ্দিন খান ও অ্যাডভোকেট জাকির হোসাইন জুয়েল জানান, জমির শেয়ার কেনা মানেই ফ্ল্যাটের চূড়ান্ত মালিকানা নয়। বিনিয়োগের আগে জমির মূল মালিক কে, দলিল-খতিয়ান ও নামজারি হালনাগাদ আছে কি না এবং জমিটি আগে অন্য কোথাও বন্ধক রাখা হয়েছে কি না—তা দক্ষ আইনজীবীর মাধ্যমে যাচাই করা জরুরি। একই সঙ্গে রাজধানী উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ (রাজউক) বা সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের প্রকল্পের অনুমোদন ও আবাসন কোম্পানির বৈধ ছাড়পত্র নিশ্চিত ছাড়া অর্থ লেনদেন না করার এবং প্রতিটি লেনদেনের দালিলিক প্রমাণ সংরক্ষণের পরামর্শ দিয়েছেন তারা।

ফ্ল্যাট ও জমির শেয়ার বিক্রির নামে শতকোটি টাকা আত্মসাৎ