ঢাকা    বুধবার, ৩০ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ১৫ আশ্বিন ১৪৩৩ ১৭ রবিউস সানি ১৪৪৮ হিজরি
বাংলাদেশ সময়
বাংলা ভিউজ

সংকট না থাকলেও গুনতে হচ্ছে বাড়তি দাম, তবুও মিলছে না এলপিজি

রাজধানীর বাজারে এলপিজি সিলিন্ডারের সরবরাহ নিয়ে সংকট নেই বলে দাবি করছেন বিক্রেতারা। তবে বাস্তবে সরকার নির্ধারিত দামের চেয়ে ৪০০ থেকে ৫০০ টাকা পর্যন্ত বেশি দরে বিক্রি হচ্ছে প্রতিটি সিলিন্ডার। বিক্রেতাদের দাবি, তাদেরই বেশি দামে এলপিজি কিনতে হচ্ছে। ফলে বাংলাদেশ এনার্জি রেগুলেটরি কমিশনের (বিইআরসি) নির্ধারিত দামে সিলিন্ডার বিক্রি করলে লোকসান গুনতে হবে।অন্যদিকে ভোক্তাদের অভিযোগ, বাড়তি দাম দিয়েও অনেক সময় চাহিদা অনুযায়ী এলপিজি সিলিন্ডার পাওয়া যাচ্ছে না। বিষয়টি নিয়ে সরকারের একাধিক সংস্থার সঙ্গে আলোচনা করেও কোনো সমাধান পাননি বলে দাবি করেছেন ব্যবসায়ীরা। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এলপিজির বাজারে দামের এই অস্বাভাবিকতার পেছনে কোথায় সমস্যা হচ্ছে, তা চিহ্নিত করে সমাধানে সরকারকে এগিয়ে আসতে হবে।তেজগাঁওয়ের একটি এলপিজি সিলিন্ডারের দোকানে ১২ কেজির সিলিন্ডার কিনতে এসেছিলেন বেসরকারি চাকরিজীবী মোহাম্মদ অয়ন। দোকানে গিয়ে তিনি জানতে পারেন, ১২ কেজির একটি সিলিন্ডারের দাম ১ হাজার ৯৫০ টাকা। অথচ এর আগে একই সিলিন্ডার তিনি কিনেছিলেন ১ হাজার ৬৫০ টাকায়।বাড়তি দাম নিয়ে দর-কষাকষি করেও কোনো লাভ হয়নি অয়নের। কারণ, তার আগেই সিলিন্ডারটি নেওয়ার জন্য আরও কয়েকজন ক্রেতা অপেক্ষা করছিলেন।অয়ন বলেন, তিনি দোকানিকে ১ হাজার ৭৫০ টাকা রাখার কথা বলেছিলেন। জবাবে দোকানি জানান, বর্তমানে গ্যাস নেই, তাই ১ হাজার ৯৫০ টাকাই দিতে হবে। দোকানে আরও দুই-তিনজন ক্রেতা অপেক্ষা করছেন বলেও তাকে জানানো হয়। অয়ন সিলিন্ডারটি না নিলে অন্য ক্রেতা নিয়ে যাবেন—এমন পরিস্থিতির কথাও দোকানি জানান।শুধু গৃহস্থালি ব্যবহারকারী নয়, বাড়তি দামের কারণে চাপের মুখে পড়েছেন ছোট ব্যবসায়ীরাও। চা দোকানি আরিফ মঙ্গলবার সকাল নাগাদ ১২ কেজির একটি এলপিজি সিলিন্ডার কিনেছেন ১ হাজার ৯৫০ টাকা দরে। তার দাবি, বাজারে সিলিন্ডার পাওয়া যাচ্ছে না। ফলে বাড়তি দাম দিয়েই দোকানের জন্য সিলিন্ডার কিনতে হচ্ছে তাকে। এতে আয়-ব্যয়ের হিসাব মেলাতে হিমশিম খেতে হচ্ছে।আরিফ বলেন, ‘আমাদেরও চলতে কষ্ট হচ্ছে। চায়ের দাম বাড়াতে পারছি না। দাম বাড়ালে ক্রেতারা আপত্তি করেন। পাঁচ টাকা রং চা ও ১০ টাকা দুধ চায়ের দামে কীভাবে ব্যবসা করব।’সেপ্টেম্বর মাসের জন্য বিইআরসি ১২ কেজি এলপিজি সিলিন্ডারের দাম নির্ধারণ করেছে ১ হাজার ৫৮৫ টাকা। কিন্তু রাজধানীর অধিকাংশ দোকানেই এর চেয়ে বেশি দামে বিক্রি হচ্ছে এলপিজি। ১২ কেজির একটি সিলিন্ডার বিক্রি হচ্ছে প্রায় ১ হাজার ৯০০ থেকে ২ হাজার ১০০ টাকার মধ্যে।এ ছাড়া ৩৫ কেজির সিলিন্ডারের দাম প্রায় ৪ হাজার ৫০০ টাকা এবং ৪৫ কেজির সিলিন্ডার বিক্রি হচ্ছে প্রায় সাড়ে ৬ হাজার টাকায়।এর মধ্যেও চাহিদা অনুযায়ী সিলিন্ডার পাওয়া যাচ্ছে না বলে অভিযোগ রয়েছে। যদিও বিক্রেতাদের দাবি, বাজারে এলপিজির সংকট নেই। তবে ক্রেতাদের অভিজ্ঞতায় দেখা যাচ্ছে, সরকার নির্ধারিত দামে তো নয়ই, বাড়তি দাম দিয়েও অনেক সময় প্রয়োজনীয় সিলিন্ডার সংগ্রহ করা কঠিন হয়ে পড়ছে।একজন ক্রেতা বলেন, ‘যে ডিলারের কাছে যাচ্ছি, তার কাছেই নাকি সিলিন্ডার নেই। ফলে মানুষ নিরুপায়। রান্না করতে হবে, খেতে হবে—এ কারণে এলপিজির কোনো বিকল্প না থাকায় বাধ্য হয়েই বাড়তি দাম দিতে হচ্ছে।’অন্যদিকে দোকানিদের দাবি, তাদেরও বাড়তি দামে সিলিন্ডার কিনতে হচ্ছে। ১২ কেজির একটি সিলিন্ডার কিনতে তাদের খরচ পড়ছে ১ হাজার ৬৫০ থেকে ১ হাজার ৭০০ টাকার মধ্যে। ফলে বিইআরসির নির্ধারিত ১ হাজার ৫৮৫ টাকা দরে বিক্রি করলে লোকসান হবে বলে তাদের দাবি।একজন বিক্রেতা বলেন, ‘আমরা ১ হাজার ৬৫০ টাকা দিয়ে সিলিন্ডার কিনছি, অথচ সরকার নির্ধারিত দাম ১ হাজার ৫৮৫ টাকা। বিইআরসির নির্ধারিত দামের সঙ্গে কোম্পানির দামেরও পার্থক্য রয়েছে। ফলে ওই দামে সিলিন্ডার বিক্রি করা সম্ভব হচ্ছে না। এ কারণেই আমাদেরও বেশি দামে বিক্রি করতে হচ্ছে।’এলপিজি ব্যবসায়ীদের সংগঠন এলপি গ্যাস ট্রেডার্স কোঅপারেটিভ সোসাইটি লিমিটেডের নেতার দাবি, অধিকাংশ কোম্পানি চাহিদা অনুযায়ী এলপিজি সিলিন্ডার সরবরাহ করতে পারছে না। এ কারণে বাজারে সরবরাহ নিয়ে সমস্যা তৈরি হচ্ছে।সংগঠনটির ট্রেজারার আবু তাহের খোরশেদ বলেন, ‘পাঁচ দিন, সাত দিন, এমনকি আট দিন অপেক্ষা করে রেশনিং করে আমাদের মাল আনতে হয়। অনেক কোম্পানির কাছে সম্পূর্ণভাবে গ্যাস না থাকায় বিক্রি বন্ধ করে দিয়েছে। বিষয়টি নিয়ে ভোক্তাকেও অবহিত করা হয়েছে। তারা আমাদের বলেছে, নিয়মিত কার্যক্রমের অংশ হিসেবে বিষয়টি মনিটরিং করা হবে।’তবে বাজারে এলপিজির সরবরাহ ও দামের এই পরিস্থিতির কারণ কোথায়, সেটিই এখন বড় প্রশ্ন হয়ে দাঁড়িয়েছে। ব্যবসায়ীরা একদিকে বেশি দামে পণ্য কেনার কথা বলছেন, অন্যদিকে ভোক্তারা সরকার নির্ধারিত দামের চেয়ে কয়েকশ টাকা বেশি দিয়ে সিলিন্ডার কিনছেন। আবার বাড়তি দাম দেওয়ার পরও অনেক ক্ষেত্রে প্রয়োজন অনুযায়ী সিলিন্ডার পাওয়া যাচ্ছে না।কোন জায়গায় সমস্যা হচ্ছে, তা চিহ্নিত করে সরকারকে এ বিষয়ে সমাধানে এগিয়ে আসা উচিত বলে মনে করেন সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের (সিপিডি) সম্মাননীয় ফেলো ড. মোস্তাফিজুর রহমান।তিনি বলেন, এলপিজির বাজার দেখভালের জন্য সরকারের একাধিক প্রতিষ্ঠান রয়েছে। সাধারণ মানুষের স্বার্থ বিবেচনায় নিয়ে সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানগুলোর নির্ধারিত হিসাব অনুযায়ী দাম কার্যকর হচ্ছে কি না, তা নিশ্চিত করার দায়িত্ব তাদের।এদিকে জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) তথ্য অনুযায়ী, গত আগস্টে দেশে ১ লাখ ৫৭ হাজার টন এলপিজি আমদানি হয়েছে। সেপ্টেম্বরেও প্রায় কাছাকাছি পরিমাণ এলপিজি আমদানি হয়েছে।ফলে একদিকে দেশে উল্লেখযোগ্য পরিমাণ এলপিজি আমদানির তথ্য রয়েছে, অন্যদিকে বাজারে সরকার নির্ধারিত দামের চেয়ে কয়েকশ টাকা বেশি দামে সিলিন্ডার বিক্রি এবং চাহিদা অনুযায়ী সিলিন্ডার না পাওয়ার অভিযোগ উঠছে। এ অবস্থায় এলপিজির সরবরাহব্যবস্থার কোন পর্যায়ে সমস্যা তৈরি হচ্ছে এবং কেন ভোক্তাকে নির্ধারিত দামের চেয়ে বাড়তি অর্থ দিয়ে সিলিন্ডার কিনতে হচ্ছে—তা নিয়ে প্রশ্ন তৈরি হয়েছে।

সংকট না থাকলেও গুনতে হচ্ছে বাড়তি দাম, তবুও মিলছে না এলপিজি