আর্সেনালকে হারিয়ে ইতিহাস গড়ল চতুর্থ বিভাগের ফ্লিটউড টাউন
ইংলিশ ফুটবলে অবিশ্বাস্য এক অঘটনের জন্ম দিয়েছে চতুর্থ বিভাগের ক্লাব ফ্লিটউড টাউন। প্রিমিয়ার লিগের বর্তমান চ্যাম্পিয়ন আর্সেনালকে পেনাল্টি শুটআউটে ৫-৩ ব্যবধানে হারিয়ে কারাবাও কাপের কোয়ার্টার ফাইনালে জায়গা করে নিয়েছে দলটি। নির্ধারিত সময়ে ১-১ গোলে সমতা থাকার পর টাইব্রেকারে জয় নিশ্চিত করে ফুটবল বিশ্বকে চমকে দিয়েছে ফ্লিটউড।মঙ্গলবার (২৭ অক্টোবর) ইংল্যান্ডের হাইবেরি স্টেডিয়ামে অনুষ্ঠিত কারাবাও কাপের চতুর্থ রাউন্ডের ম্যাচে এই নাটকীয় ফল আসে।ইংলিশ ফুটবলের লিগ কাঠামোয় আর্সেনালের চেয়ে ৮৪ ধাপ পিছিয়ে থাকা ফ্লিটউডের এমন জয়কে প্রতিযোগিতাটির ইতিহাসের অন্যতম বড় অঘটন হিসেবে দেখা হচ্ছে। এই জয়ের মাধ্যমে ক্লাবটির ইতিহাসে প্রথমবারের মতো কারাবাও কাপের শেষ আটে ওঠার কীর্তি গড়েছে তারা।ম্যাচের শুরুতে শক্তিশালী আর্সেনালের বিপক্ষে আত্মবিশ্বাসী ফুটবল খেলতে থাকে স্বাগতিক ফ্লিটউড। তবে খেলা শুরুর কিছুক্ষণের মধ্যেই স্টেডিয়ামের ওপর একটি ড্রোন উড়তে দেখা গেলে সাময়িকভাবে ম্যাচ বন্ধ রাখেন রেফারি মাইকেল সালিসবারি।নিরাপত্তার কারণে খেলোয়াড়দের কিছু সময়ের জন্য মাঠ ছেড়ে যেতে বলা হয়। প্রায় আট মিনিট পর আবার খেলা শুরু হয়।এরপর ম্যাচের ২১তম মিনিটে সবাইকে অবাক করে এগিয়ে যায় ফ্লিটউড।ফুলহাম থেকে ধারে খেলতে আসা অ্যারন লুপালো-বি আর্সেনালের তরুণ ডিফেন্ডার মার্লি সালমনকে পরাস্ত করে গোলরক্ষক ইলান মেলিয়েরকে ফাঁকি দিয়ে বল জালে পাঠান।অপ্রত্যাশিত এই গোলে হাইবেরি স্টেডিয়ামে উৎসবের পরিবেশ তৈরি হয়।গোল হজমের পর ম্যাচে নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করে আর্সেনাল। একের পর এক আক্রমণ চালালেও প্রথমার্ধে গোলের দেখা পায়নি মিকেল আর্তেতার দল।ফলে ১-০ ব্যবধানে এগিয়ে থেকেই বিরতিতে যায় ফ্লিটউড।প্রথমার্ধে পিছিয়ে থাকার পর বিরতিতে দলে পরিবর্তন আনেন আর্সেনাল কোচ মিকেল আর্তেতা। অধিনায়ক মার্টিন ওডেগার্ডকে মাঠে নামানো হলে আক্রমণে গতি বাড়ে।দ্বিতীয়ার্ধ শুরুর মাত্র চার মিনিটের মাথায় সমতায় ফেরে আর্সেনাল।ফ্লিটউডের গোলমুখে তৈরি হওয়া জটলার মধ্যে ছয় গজ বক্স থেকে বল জালে পাঠান ভিক্টর গিয়োকেরেস। এতে ম্যাচের স্কোর দাঁড়ায় ১-১।সমতায় ফেরার পর আর্সেনাল আরও আক্রমণাত্মক হয়ে ওঠে। কিন্তু সুযোগ তৈরি করেও গোল করতে ব্যর্থ হন দলটির ফুটবলাররা।পুরো ম্যাচে ২৬টি শট নেয় আর্সেনাল। ফ্লিটউডের পেনাল্টি বক্সের ভেতরে ৫৯ বার বল স্পর্শ করলেও একটি গোলের বেশি করতে পারেনি ইংলিশ চ্যাম্পিয়নরা।ম্যাচের শেষ দিকে আরও বড় ধাক্কা খায় আর্সেনাল।৮৬তম মিনিটে ফ্লিটউডের হ্যারিসন নিলের কঠিন ট্যাকলের পর প্রতিক্রিয়া দেখিয়ে তাঁকে লাথি মারেন আর্সেনালের ১৬ বছর বয়সী ফুটবলার ম্যাক্স ডাউম্যান।এ ঘটনায় সরাসরি লাল কার্ড দেখান রেফারি।ডাউম্যান মাঠ ছাড়ার সময় তাঁর আচরণে অসন্তোষ প্রকাশ করতে দেখা যায় কোচ মিকেল আর্তেতাকে।একজন কম নিয়ে বাকি সময় খেলতে হয় আর্সেনালকে। এর ফলে ম্যাচের শেষ মুহূর্তে জয়ের চেষ্টা আরও কঠিন হয়ে পড়ে দলটির জন্য।ফ্লিটউডের ঐতিহাসিক জয়ের অন্যতম নায়ক ছিলেন গোলরক্ষক জে লিঞ্চ।ম্যাচের শেষ মুহূর্তে আর্সেনালের বেন হোয়াইটের নিশ্চিত গোলের সুযোগ আটকে দেন তিনি। এরপর মার্টিন ওডেগার্ডের বিপজ্জনক শটও ফিরিয়ে দেন এই গোলরক্ষক।তাঁর অসাধারণ দুটি সেভের কারণে নির্ধারিত সময়ে আর কোনো গোল করতে পারেনি আর্সেনাল।ফলে ১-১ সমতায় শেষ হয় ম্যাচ এবং বিজয়ী নির্ধারণের জন্য পেনাল্টি শুটআউট অনুষ্ঠিত হয়।টাইব্রেকারে আর্সেনালের বিপক্ষে অসাধারণ আত্মবিশ্বাস দেখান ফ্লিটউডের ফুটবলাররা।দলটির রোনান কফলান, হ্যারিসন নিল, উইল ডেভিস এবং অ্যান্ডি ক্যানন নিজেদের পেনাল্টি থেকে গোল করেন।অন্যদিকে আর্সেনালের হয়ে প্রথম তিনটি পেনাল্টিতে গোল করেন মার্টিন ওডেগার্ড, কাই হাভার্টজ ও ভিক্টর গিয়োকেরেস।তবে চতুর্থ পেনাল্টিতে ব্রুনো গিমারায়েসের শট ঠেকিয়ে দেন ফ্লিটউড গোলরক্ষক জে লিঞ্চ।এরপর পঞ্চম পেনাল্টি নিতে আসেন ফ্লিটউডের কনর হগি। তাঁর জোরালো শট জালে জড়াতেই ৫-৩ ব্যবধানে জয় নিশ্চিত হয় স্বাগতিকদের।আর্সেনাল গোলরক্ষক ইলান মেলিয়ের ফ্লিটউডের পাঁচটি পেনাল্টির একটিও ঠেকাতে পারেননি।কনর হগির জয়সূচক পেনাল্টির পর হাইবেরি স্টেডিয়ামে আনন্দের বিস্ফোরণ ঘটে।গ্যালারি থেকে অসংখ্য সমর্থক মাঠে নেমে আসেন। ফুটবলারদের সঙ্গে জয় উদযাপনে যোগ দেন তাঁরা।অবিশ্বাস্য এই জয়ে আবেগ ধরে রাখতে পারেননি ফ্লিটউডের কোচ ম্যাট ললর। উদযাপনের সময় তাঁকে কাঁদতে দেখা যায়।ফ্লিটউড বর্তমানে ইংল্যান্ডের চতুর্থ স্তরের লিগ টুতে ১৮তম অবস্থানে রয়েছে। এমন একটি দল প্রিমিয়ার লিগের চ্যাম্পিয়নদের হারিয়ে শেষ আটে পৌঁছানোয় জয়টি বিশেষ গুরুত্ব পেয়েছে।এভারটনের বিপক্ষে আগের শনিবারের ম্যাচে জয় পাওয়া একাদশে নয়টি পরিবর্তন এনেছিলেন মিকেল আর্তেতা।তরুণ ফুটবলার ও নিয়মিত একাদশের বাইরে থাকা খেলোয়াড়দের সুযোগ দিয়েছিলেন তিনি।আর্সেনালের হয়ে দ্বিতীয় সিনিয়র ম্যাচ খেলতে নামা ১৭ বছর বয়সী ডিফেন্ডার মার্লি সালমন প্রথম গোলের সময় লুপালো-বিকে আটকাতে পারেননি। বিরতির সময় তাঁকে তুলে নেওয়া হয়।অন্যদিকে ফ্লিটউডের রক্ষণভাগে রিস বেনেট, কনর হগি এবং শন রুনি আর্সেনালের একের পর এক আক্রমণ প্রতিহত করতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখেন।বল দখল ও আক্রমণে আর্সেনাল এগিয়ে থাকলেও সুযোগ কাজে লাগানোর ব্যর্থতা শেষ পর্যন্ত তাদের বিদায়ের অন্যতম কারণ হয়ে দাঁড়ায়।এই জয়ের ফলে কারাবাও কাপের কোয়ার্টার ফাইনালে জায়গা নিশ্চিত করেছে ফ্লিটউড টাউন।বুধবার (২৮ অক্টোবর) চেলসি ও লিভারপুলের ম্যাচ শেষ হওয়ার পর অনুষ্ঠিত ড্রয়ে শেষ আটে ফ্লিটউডের প্রতিপক্ষ নির্ধারিত হওয়ার কথা রয়েছে।সূত্র: বিবিসি নিউজ।