জুলাইকে অস্বীকার করে দেশ এগোবে না: প্রতিরক্ষা উপদেষ্টা
জুলাই গণঅভ্যুত্থানের ঐতিহাসিক গুরুত্ব উপেক্ষা করে বাংলাদেশকে সামনে এগিয়ে নেওয়া সম্ভব নয় বলে মন্তব্য করেছেন প্রধানমন্ত্রীর প্রতিরক্ষা উপদেষ্টা ব্রিগেডিয়ার জেনারেল (অব.) ড. এ কে এম শামছুল ইসলাম।তিনি বলেছেন, জুলাইয়ের চেতনাকে কোনো রাজনৈতিক দল, ব্যক্তি বা গোষ্ঠীর সংকীর্ণ স্বার্থে ব্যবহার করা উচিত নয়। বরং প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কার, ন্যায়বিচার, জাতীয় ঐক্য এবং রাষ্ট্রের জবাবদিহি প্রতিষ্ঠার ভিত্তি হিসেবে এ চেতনাকে ধারণ করতে হবে।শনিবার, ২৫ জুলাই রাজধানীর মহাখালীতে রাওয়া ক্লাব মিলনায়তনে আয়োজিত ‘ফিরে দেখা ২০২৪’ শীর্ষক মতবিনিময় সভায় তিনি এসব কথা বলেন। অনুষ্ঠানে সভাপতিত্ব করেন রাওয়া ক্লাবের চেয়ারম্যান ব্রিগেডিয়ার জেনারেল (অব.) আব্দুল হক।[BANGVIEWS-POST:2473]সভায় জুলাই আন্দোলনে অংশ নেওয়া ব্যক্তি, আহত যোদ্ধা এবং অবসরপ্রাপ্ত সশস্ত্র বাহিনীর কর্মকর্তারা উপস্থিত ছিলেন।জুলাই-আগস্টের আন্দোলনে অংশ নেওয়া ছাত্র-জনতা, পেশাজীবী ও অবসরপ্রাপ্ত সামরিক সদস্যদের প্রতি শ্রদ্ধা জানিয়ে প্রতিরক্ষা উপদেষ্টা বলেন, দেশের সংকটময় সময়ে তারা জীবন ঝুঁকিতে ফেলে এগিয়ে এসেছিলেন। তাদের ভূমিকা শুধু একটি রাজনৈতিক আন্দোলনের মধ্যে সীমাবদ্ধ ছিল না, বরং এটি জাতির ভবিষ্যৎ নির্ধারণের একটি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়।তিনি বলেন, জুলাই আন্দোলনে অংশগ্রহণকারীরা যে সাহস দেখিয়েছেন, তা নতুন বাংলাদেশের ইতিহাসের অংশ হয়ে থাকবে। অবসরপ্রাপ্ত সামরিক কর্মকর্তারাও দেশের প্রতি দায়িত্ববোধ থেকে ছাত্র-জনতার পাশে দাঁড়িয়েছিলেন।প্রতিরক্ষা উপদেষ্টা জানান, জুলাইয়ের শেষ ভাগ থেকে আগস্টের শুরু পর্যন্ত অবসরপ্রাপ্ত সামরিক কর্মকর্তারা জাতীয় প্রেস ক্লাব, কেন্দ্রীয় শহীদ মিনার, রাওয়া ক্লাবসহ রাজধানীর বিভিন্ন স্থানে সমবেত হয়ে আন্দোলনের প্রতি সংহতি জানিয়েছিলেন। অনেকে পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে নিয়ে গণমিছিলেও অংশ নেন।তিনি বলেন, জুলাই যোদ্ধা ও অবসরপ্রাপ্ত সামরিক কর্মকর্তাদের এ সম্পৃক্ততা সাহস, অভিজ্ঞতা ও দেশপ্রেমের সমন্বিত প্রতীক।সশস্ত্র বাহিনীর ভবিষ্যৎ কাঠামো নিয়ে ড. শামছুল ইসলাম বলেন, জুলাইয়ের চেতনা ধারণ করার অর্থ হলো বাহিনীকে আরও পেশাদার, রাজনৈতিকভাবে নিরপেক্ষ, জনমুখী ও জবাবদিহিমূলক প্রতিষ্ঠানে পরিণত করা।[BANGVIEWS-POST:2472]তার মতে, পদোন্নতি ও দায়িত্ব বণ্টনের ক্ষেত্রে মেধা, যোগ্যতা, সততা এবং পেশাদারত্বই একমাত্র মানদণ্ড হওয়া উচিত। অতীতের রাজনৈতিক পরিচয় বা ক্ষমতার সঙ্গে সংশ্লিষ্টতার কারণে কাউকে বিশেষ সুবিধা দেওয়া যাবে না।তিনি বলেন, সরকারের লক্ষ্য একটি আধুনিক, প্রযুক্তিনির্ভর, পেশাদার ও রাজনীতিমুক্ত সশস্ত্র বাহিনী গড়ে তোলা। এই বাহিনী কোনো ব্যক্তি, দল বা গোষ্ঠীর নয়, বরং এটি জনগণের আস্থার প্রতিষ্ঠান এবং দেশের স্বাধীনতা ও সার্বভৌমত্বের রক্ষাকবচ।প্রতিরক্ষা উপদেষ্টা স্পষ্ট করে বলেন, ভবিষ্যতে কোনো সংকীর্ণ রাজনৈতিক স্বার্থে সশস্ত্র বাহিনীকে ব্যবহার করতে দেওয়া হবে না। বাহিনীর সদস্যদের আনুগত্য থাকবে বাংলাদেশ, সংবিধান এবং জনগণের প্রতি।জুলাই গণঅভ্যুত্থানকে দলীয় সম্পদে পরিণত করার প্রবণতার সমালোচনা করে তিনি বলেন, কেউ কেউ এ আন্দোলনকে নিজেদের রাজনৈতিক অর্জন হিসেবে তুলে ধরতে চাইছেন। আবার অন্য একটি অংশ এর ঐতিহাসিক গুরুত্ব কমিয়ে দেখানোর চেষ্টা করছে।তিনি বলেন, ইতিহাসকে সম্মান করার অর্থ হলো সত্যকে ধারণ করা এবং ভবিষ্যৎ প্রজন্মের সামনে সঠিক তথ্য তুলে ধরা। এ ক্ষেত্রে আন্দোলনে অংশ নেওয়া সামরিক সদস্য, অবসরপ্রাপ্ত কর্মকর্তা এবং নিরাপত্তা বিশ্লেষকদের অভিজ্ঞতা গুরুত্বপূর্ণ।জুলাইয়ের একটি আলোচিত স্লোগানের কথা উল্লেখ করে তিনি বলেন, বাংলাদেশ কোনো ব্যক্তি বা পরিবারের ব্যক্তিগত সম্পত্তি নয়। রাষ্ট্র পরিচালিত হবে জনগণের ইচ্ছা, অধিকার ও স্বার্থের ভিত্তিতে।প্রতিরক্ষা উপদেষ্টা বলেন, জুলাই গণঅভ্যুত্থান বাংলাদেশকে সুশাসন, জনঅংশগ্রহণ, জবাবদিহি এবং বৈষম্যহীন সমাজ প্রতিষ্ঠার নতুন দায়িত্ব দিয়েছে। সরকার সেই চেতনাকে সামনে রেখেই একটি অন্তর্ভুক্তিমূলক রাষ্ট্র গড়ে তুলতে চায়।জুলাই আন্দোলনে নিহতদের পরিবার ও আহত যোদ্ধাদের প্রতি রাষ্ট্রের দায়িত্বের কথা উল্লেখ করে তিনি বলেন, এটি শুধু নৈতিক নয়, জাতীয় দায়িত্বও।তিনি জানান, আহতদের একটি বড় অংশকে তিনটি শ্রেণিতে ভাগ করে নিয়মিত মাসিক সম্মানী দেওয়া হচ্ছে। সরাসরি তাদের ব্যাংক হিসাবে অর্থ পাঠানো হচ্ছে। যারা এখনো এ কর্মসূচির বাইরে রয়েছেন, তাদের অন্তর্ভুক্ত করার প্রক্রিয়া চলছে।[BANGVIEWS-POST:2470]গুরুতর আহতদের মেডিক্যাল বোর্ডের সুপারিশে থাইল্যান্ড, সিঙ্গাপুর, তুরস্ক ও রাশিয়াসহ বিভিন্ন দেশে চিকিৎসার জন্য পাঠানো হয়েছে। অনেকে চিকিৎসা শেষে দেশে ফিরেছেন, আবার কেউ কেউ এখনো বিদেশে চিকিৎসাধীন।এ ছাড়া শহীদ ও আহতদের পরিবারের কর্মসংস্থানে আগ্রহী সদস্যদের তথ্যভান্ডার তৈরি করা হয়েছে। তাদের একটি অংশকে প্রশিক্ষণ ও পুনর্বাসন কর্মসূচির আওতায় আনা হয়েছে।প্রতিরক্ষা উপদেষ্টা আশ্বাস দেন, আহতদের চিকিৎসা, পুনর্বাসন, শিক্ষা, কর্মসংস্থান ও সার্বিক কল্যাণ নিশ্চিত করার উদ্যোগ অব্যাহত থাকবে। প্রয়োজন হলে এসব কার্যক্রম আরও সম্প্রসারণ করা হবে।বিডিআর হত্যাকাণ্ড, মেজর সিনহা হত্যাকাণ্ড এবং সশস্ত্র বাহিনীর সদস্যদের বিরুদ্ধে অতীতে সংঘটিত অন্যায়ের বিচার প্রসঙ্গে তিনি বলেন, সরকার ন্যায়বিচার নিশ্চিত করতে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ।মেজর সিনহা হত্যাকাণ্ডের বিচারিক প্রক্রিয়া দ্রুত সম্পন্ন করতে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেওয়া হচ্ছে বলে জানান তিনি। পাশাপাশি বিডিআর হত্যাকাণ্ড নিয়ে গঠিত কমিশনের সুপারিশগুলো পর্যায়ক্রমে বাস্তবায়নের চেষ্টা চলছে।তিনি বলেন, দীর্ঘ সময় ধরে রাষ্ট্রের বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান দুর্বল হয়েছে। এসব প্রতিষ্ঠান সংস্কার ও পুনর্গঠন একটি সময়সাপেক্ষ প্রক্রিয়া। এজন্য সরকারকে প্রয়োজনীয় সময় দেওয়ার আহ্বান জানান তিনি।জাতীয় নিরাপত্তা প্রসঙ্গে প্রতিরক্ষা উপদেষ্টা বলেন, বর্তমান সময়ে নিরাপত্তা শুধু সীমান্ত রক্ষার মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। অর্থনীতি, খাদ্য, সাইবার জগৎ, তথ্য, সমুদ্র ও আকাশসীমা, দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা এবং সামাজিক সম্প্রীতিও জাতীয় নিরাপত্তার গুরুত্বপূর্ণ অংশ।এসব চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় সশস্ত্র বাহিনীর আধুনিকায়ন, প্রযুক্তিগত সক্ষমতা বৃদ্ধি এবং আত্মনির্ভরশীল কাঠামো তৈরিতে সরকার উদ্যোগ নেবে বলে জানান তিনি।[BANGVIEWS-POST:2471]দেশের রাজনৈতিক বিভাজন ও অবিশ্বাস দূর করার আহ্বান জানিয়ে ড. শামছুল ইসলাম বলেন, জুলাই দেখিয়েছে, ছাত্র, জনতা, কৃষক, শ্রমিক, পেশাজীবী এবং সশস্ত্র বাহিনীর সদস্যরা জাতীয় আকাঙ্ক্ষায় ঐক্যবদ্ধ হলে কোনো শক্তিই বাংলাদেশকে থামাতে পারে না।তিনি বলেন, গণতান্ত্রিক সমাজে মত ও পথের পার্থক্য স্বাভাবিক। তবে দেশের স্বাধীনতা, সার্বভৌমত্ব ও জাতীয় স্বার্থের প্রশ্নে সবাইকে ঐক্যবদ্ধ থাকতে হবে।প্রতিরক্ষা উপদেষ্টা বলেন, বাংলাদেশ কোনো আধিপত্যবাদী শক্তির কাছে মাথা নত করবে না। একটি নিরাপদ, ন্যায়ভিত্তিক, সমৃদ্ধ, ঐক্যবদ্ধ ও আত্মমর্যাদাশীল রাষ্ট্র গড়ে তোলাই সরকারের অঙ্গীকার।অনুষ্ঠানের শেষদিকে তিনি জুলাই গণঅভ্যুত্থানে নিহতদের রুহের মাগফিরাত কামনা করেন এবং তাদের আত্মত্যাগকে নতুন বাংলাদেশ গড়ার প্রেরণা হিসেবে স্মরণ করার আহ্বান জানান।