ঢাকা    সোমবার, ২৮ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ১৩ আশ্বিন ১৪৩৩ ১৫ রবিউস সানি ১৪৪৮ হিজরি
বাংলাদেশ সময়
বাংলা ভিউজ

ভারতে ৬ শতাব্দী পুরোনো মসজিদ ভাঙা ঠেকাতে ২ সপ্তাহ ধরে পাহারায় হাজারো মুসলিম

ভারতের মধ্যপ্রদেশের উজ্জয়িনে ঐতিহাসিক শাহি মসজিদের একটি অংশ ভেঙে সড়ক সম্প্রসারণের প্রস্তাবকে কেন্দ্র করে উত্তেজনা তৈরি হয়েছে। মসজিদটি প্রায় ৬০০ বছরের পুরোনো বলে আল জাজিরার প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। প্রস্তাবিত ভাঙার বিরোধিতা করে শত শত মুসলিম মসজিদের ভেতরে অবস্থান নিয়েছেন। মাকতুব মিডিয়ার প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, গত রোববার গভীর রাতে মসজিদে বুলডোজার চালানোর চেষ্টা করা হলেও স্থানীয় বাসিন্দাদের জড়ো হওয়ার পর সেই অভিযান থেমে যায়।২০২৮ সালের সিংহস্থ কুম্ভকে সামনে রেখে উজ্জয়িনে সড়ক প্রশস্তকরণের একটি প্রকল্প চলছে। কুম্ভ হিন্দুদের একটি গুরুত্বপূর্ণ তীর্থযাত্রা। ওই প্রকল্পের অংশ হিসেবে মহাকালেশ্বর মন্দির ও ক্ষিপ্রা নদীর কাছাকাছি অবস্থিত শাহি মসজিদের একটি অংশ ভেঙে সড়ক চওড়া করার প্রস্তাব করা হয়েছে। প্রস্তাব অনুযায়ী, সড়কটি ১৫ মিটার প্রশস্ত করার কথা রয়েছে।মসজিদের ভেতরে অবস্থান নেওয়া স্থানীয় বাসিন্দা তৌকীর খান মাকতুব মিডিয়াকে বলেন, দুই সপ্তাহেরও বেশি সময় ধরে তারা পালাক্রমে মসজিদের ভেতরে অবস্থান করছেন। তার ভাষ্য, মসজিদ রক্ষার জন্য সমাজের মানুষ সর্বসম্মতভাবে এই সিদ্ধান্ত নিয়েছেন।তৌকীর খান বলেন, ‘মানুষ সর্বসম্মতিতে ঠিক করেছে যে তারা বিপুল সংখ্যায় পালা করে মসজিদের ভেতরে বসে থাকবে, যাতে মসজিদ ভাঙা না পড়ে। সব সময় অনেক মানুষ মসজিদের ভেতরে থাকে। প্রতিদিন পাঁচ ওয়াক্ত নামাজও সময়মতো হচ্ছে।’তিনি আরও বলেন, গত রাতে মসজিদ এলাকায় পুলিশের উপস্থিতি বাড়ানো হয় এবং র‍্যাপিড অ্যাকশন ফোর্স বা আরএএফ মোতায়েন করা হয়। তার দাবি, মসজিদ ভেঙে ফেলার উদ্দেশ্যে বুলডোজারও আনা হয়েছিল। তবে মসজিদের ভেতরে ও বাইরে বিপুলসংখ্যক মানুষ জড়ো হওয়ার পর অভিযান থেমে যায়।মসজিদকে ঘিরে বিরোধের বিষয়গুলো দেখভালের জন্য ১১ সদস্যের ‘মসজিদ নুমাইন্দা কমিটি’ গঠন করা হয়েছে বলে প্রতিবেদনে জানানো হয়েছে। সমাজের দায়িত্বশীল ব্যক্তিদের সম্মতিতে গঠিত এই কমিটির সিদ্ধান্ত অনুযায়ী মুসলিমরা পালাক্রমে মসজিদের ভেতরে অবস্থান করছেন।ইন্দোরের আলেম মুফতি জুনাইদ মাকতুবকে বলেন, বিরোধ চলার মধ্যেই প্রশাসন মসজিদটি ভাঙার চেষ্টা করেছে বলে অভিযোগ রয়েছে। তার ভাষ্য, এ কারণেই মুসলিমরা মসজিদে অবস্থান নিয়েছেন।মুফতি জুনাইদ বলেন, ‘এই মসজিদ ভেঙে ফেলা হলে আরও ২৮টি মসজিদ লাইনে আছে। তারাও নিশানায় চলে যাবে। এটা স্বৈরাচারী কাজ। কোনো কিছুর পথে বাধা হচ্ছে, শুধু এই কারণে তারা একের পর এক মসজিদ ভাঙতে পারে না। এটা ভিত্তিহীন এবং অর্থহীন যে এক ধর্ম প্রতিষ্ঠা করতে গিয়ে অন্য ধর্মের অস্তিত্বই পুরোপুরি মুছে ফেলা হবে।’তার অভিযোগ, সিংহস্থ কুম্ভ উপলক্ষে উজ্জয়িন শহরকে নতুন করে সাজানোর পরিকল্পনায় বেশ কয়েকটি পুরোনো মসজিদ ঝুঁকির মধ্যে রয়েছে। তিনি বলেন, উজ্জয়িনে অনেক মুসলিম বসবাস করেন এবং সেখানে বহু পুরোনো মসজিদ রয়েছে।মুফতি জুনাইদ বলেন, ‘সেখানে অনেক মুসলিম বসবাস করেন। অনেক পুরোনো মসজিদও আছে। আমরা কীভাবে সেগুলো ভাঙতে দিতে পারি?’এর আগে উজ্জয়িনের তাখিয়া মসজিদ ভেঙে ফেলা হয়েছিল বলেও তিনি উল্লেখ করেন। তার দাবি, তাখিয়া মসজিদ ভাঙা হবে না বলে প্রশাসন মুসলিমদের একাধিকবার আশ্বাস দিয়েছিল। পরে হঠাৎ করে সেটি ভেঙে দেওয়া হয়।এ প্রসঙ্গে মুফতি জুনাইদ বলেন, ‘তারা (সরকার) বিশ্বাসঘাতকতা করেছে এবং তাখিয়া মসজিদ ভেঙে দিয়েছে। শাহি মসজিদের প্রশ্ন এলে মুসলিমরা তাদের মিথ্যা প্রতিশ্রুতি মানতে রাজি হননি। তারা নিজেরা জড়ো হয়ে মসজিদ রক্ষার সিদ্ধান্ত নিয়েছেন।’শাহি মসজিদের প্রস্তাবিত ভাঙার বিরুদ্ধে মসজিদ কর্তৃপক্ষ সুপ্রিম কোর্টেও যাওয়ার উদ্যোগ নিয়েছে। তবে এর আগে মধ্যপ্রদেশ হাইকোর্টে করা আবেদন খারিজ হয়। মুফতি জুনাইদের অভিযোগ, এরপর প্রশাসনের পক্ষ থেকে দাবি করা হয়েছিল যে মসজিদ ভাঙার অনুমতি দিয়ে আদালতের আদেশ তাদের কাছে রয়েছে।তিনি বলেন, ‘মসজিদ ভাঙা যাবে, এমন কোনো আদালতের আদেশ তাদের কাছে ছিল না। হাইকোর্ট শুধু ভাঙার আদেশে স্থগিতাদেশ দেওয়ার আমাদের আবেদন নাকচ করেছে। আদালত কোথাও বলেনি যে তারা মসজিদ ভেঙে ফেলতে পারে।’মুফতি জুনাইদ আরও বলেন, ‘সরকার আমাদের অনেকবার বিশ্বাসঘাতকতা করেছে। আমরা এভাবে একটির পর একটি মসজিদ ভাঙতে দিতে পারি না।’মসজিদ রক্ষার অবস্থান সম্পর্কে তিনি বলেন, ‘আমরা প্রশাসনের সঙ্গে লড়াই করতে পারি না। কিন্তু এখন আমাদের (মুসলিমদের) হাতে যত শক্তি আছে, তা দিয়ে আমরা আমাদের প্রতিষ্ঠান রক্ষা করব, এমনকি প্রাণ দিতে হলেও।’তিনি আরও বলেন, ‘এখন আমরা ঠিক করেছি, তারা যদি বুলডোজার চালাতে চায়, তাহলে আগে আমাদের ওপর দিয়ে চালাক, তারপর মসজিদের ওপর চালাক। কারণ আমাদের ধর্মীয় স্থাপনা যদি গুঁড়িয়ে দেওয়া হয়, তাহলে আমরা কী করব?’মুফতি জুনাইদের ভাষ্য, এ অবস্থানের কথা প্রশাসনকেও জানানো হয়েছে। তিনি বলেন, মুসলিমরা প্রশাসনের সঙ্গে সরাসরি লড়াই করতে পারবে না; তবে প্রশাসন গুলি চালাতে বা বুলডোজার দিয়ে তাদের সরিয়ে দেওয়ার চেষ্টা করলে তারা মসজিদ রক্ষায় অবস্থান চালিয়ে যাবেন।তিনি বলেন, ‘আমরা বলেছি, আমরা তাদের সঙ্গে লড়তে পারি না। তারা আমাদের গুলি করতে পারে, মেরে ফেলতে পারে, আমাদের ওপর দিয়ে বুলডোজার চালাতে পারে। সেটা শেষ হলে আমাদের লাশের ওপর দিয়ে বুলডোজার পার করে তারা আমাদের মসজিদের ওপরও চালাতে পারে।’শাহি মসজিদটি মহাকালেশ্বর মন্দিরের প্রায় উল্টো দিকে এবং ক্ষিপ্রা নদীর কাছে অবস্থিত। সড়ক ১৫ মিটার চওড়া করার প্রস্তাবের কারণে মসজিদের একটি অংশ ভেঙে ফেলার পরিকল্পনা করা হয়েছে।এদিকে মসজিদ ভাঙার নোটিশের বিরুদ্ধে করা দুটি আবেদন সম্প্রতি মধ্যপ্রদেশ হাইকোর্ট খারিজ করেছে। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, বিচারপতি সন্দীপ এন ভাটের আদালত মনে করেছে, প্রস্তাবিত পদক্ষেপ প্রযোজ্য আইনি বিধান অনুসরণ করেই নেওয়া হয়েছে। মসজিদ পরিচালনাকারীদের শুনানির সুযোগ দেওয়া হয়েছিল বলেও আদালত উল্লেখ করেছে।সংবিধানের ১৪, ২৫, ২৬ ও ৩০০এ অনুচ্ছেদ লঙ্ঘনের যে দাবি আবেদনকারীরা করেছিলেন, আদালত সেটিও নাকচ করেছে।২০২৮ সালের সিংহস্থ কুম্ভ উপলক্ষে উজ্জয়িনে বিপুল জনসমাগম হতে পারে—আদালত তারও উল্লেখ করেছে। যানবাহন চলাচল নিয়ন্ত্রণ এবং জনসুবিধার প্রয়োজনীয়তার কথাও আদালতের পর্যবেক্ষণে এসেছে। একই সঙ্গে মহাকালেশ্বর মন্দির ও ক্ষিপ্রা নদীর কাছে মসজিদটির অবস্থানের বিষয়টিও বিবেচনায় নেওয়া হয়েছে।মসজিদ ভাঙার নোটিশের বিরুদ্ধে কয়েকটি গোষ্ঠী আদালতে আবেদন করেছিল। তারা মসজিদটি দেখাশোনার সঙ্গে যুক্ত বলে দাবি করে। মসজিদটি ওয়াকফ সম্পত্তি হিসেবে নিবন্ধিত বলেও আবেদনে উল্লেখ করা হয়। আবেদনকারীদের যুক্তি ছিল, মসজিদ ভাঙা হলে নামাজঘরের একটি অংশ ক্ষতিগ্রস্ত হবে। পাশাপাশি ১২০ ফুট উঁচু একটি মিনার এবং মাজার চৌক শাহিও ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার আশঙ্কার কথা জানানো হয়। পৌর কর্পোরেশনের নেওয়া পদক্ষেপ আইনসম্মত কি না, সে প্রশ্নও তোলা হয়।মসজিদ কর্তৃপক্ষের দাবি, শাহি মসজিদ শত বছরেরও বেশি পুরোনো। এ দাবির সমর্থনে কমিটির পক্ষ থেকে কয়েকটি নথির কথা উল্লেখ করা হয়েছে। এর মধ্যে একটি ১৯২৫ সালের চিঠি। সিন্ধিয়া আমলের গোয়ালিয়র সরকারের অধীনে টাউন ইমপ্রুভমেন্ট ট্রাস্ট ওই চিঠি লিখেছিল বলে প্রতিবেদনে জানানো হয়েছে। চিঠিতে জমি অধিগ্রহণের কথা উল্লেখের পাশাপাশি মসজিদের অবশিষ্ট অংশ অক্ষত রাখার নির্দেশ ছিল বলে কমিটির পক্ষ থেকে দাবি করা হয়েছে।আরেকটি নথি হিসেবে ১৯৮৫ সালের মধ্যপ্রদেশ সরকারের গেজেট বিজ্ঞপ্তির কথা উল্লেখ করা হয়েছে। ওই বিজ্ঞপ্তিতে মসজিদ এবং এর মাপের উল্লেখ রয়েছে বলে জানানো হয়েছে।অ্যাসোসিয়েশন ফর প্রোটেকশন অব সিভিল রাইটসের আইনজীবী জায়েদ পাঠান মাকতুবকে বলেন, নুমাইন্দা কমিটি তাদের আইনজীবীর মাধ্যমে হাইকোর্টের আদেশের বিরুদ্ধে সুপ্রিম কোর্টে যাওয়ার প্রক্রিয়ায় রয়েছে।জায়েদ পাঠান বলেন, ‘নুমাইন্দা কমিটি তাদের আইনজীবীকে নিয়ে হাইকোর্টের আদেশের বিরুদ্ধে সুপ্রিম কোর্টে যাওয়ার প্রক্রিয়ায় আছে।’তিনি আরও বলেন, ‘আপাতত সর্বসম্মতিক্রমে ঠিক করা অনুযায়ী মানুষ মসজিদের ভেতরে বসে আছেন। মসজিদ রক্ষা করতে এবং প্রস্তাবিত ভাঙার প্রতিবাদ জানাতে। তারা এটাকেই ভাঙা ঠেকানোর শেষ উপায় মনে করছেন।’প্রতিবেদন অনুযায়ী, গত রাত থেকে পুলিশ মসজিদের চারপাশ ঘিরে রেখেছে। প্রতিবেদন লেখা পর্যন্ত অন্তত এক হাজার মানুষ জোহরের নামাজ পড়ে মসজিদের ভেতরে অবস্থান করছিলেন। পালা পরিবর্তনের সঙ্গে সঙ্গে মসজিদের ভেতরে অবস্থানকারী মানুষের সংখ্যাও বদলাচ্ছে। তবে সব সময়ই সেখানে বিপুলসংখ্যক মানুষ অবস্থান করছেন বলে প্রতিবেদনে জানানো হয়েছে।

ভারতে ৬ শতাব্দী পুরোনো মসজিদ ভাঙা ঠেকাতে ২ সপ্তাহ ধরে পাহারায় হাজারো মুসলিম