ঢাকা    রোববার, ১৮ অক্টোবর ২০২৬, ৩ কার্তিক ১৪৩৩ ৬ জমাদিউল আউয়াল ১৪৪৮ হিজরি
বাংলাদেশ সময়
বাংলা ভিউজ

অবৈধ রিসোর্টে আগুন কেড়ে নিল ১০ জীবন

শারদীয় দুর্গাপূজার ছুটিতে একটু নিরিবিলি পরিবেশের খোঁজে কক্সবাজার শহর থেকে প্রায় ৪০ কিলোমিটার দূরে উখিয়ার ইনানীর পাটুয়ারটেক এলাকার টুপটুপ রিসোর্টে উঠেছিলেন পর্যটকরা। কিন্তু শনিবার (১৭ অক্টোবর) ভোরের আলো ফোটার পরপরই রেস্টুরেন্টের রান্নাঘরের গ্যাস সিলিন্ডার বিস্ফোরণ ও ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ডে নিভে যায় ১০ জনের জীবনপ্রদীপ। তাঁদের মধ্যে তিন বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী ও এক শিশু রয়েছে। নিহতদের ছয়জনই ঢাকার একই পরিবারের সদস্য।স্থানীয় ও প্রত্যক্ষদর্শীদের বরাতে জানা গেছে, শুক্রবার রাতে রিসোর্টটিতে মোট ১৮ জন পর্যটক অবস্থান করছিলেন। শনিবার সকাল ৭টার দিকে রিসোর্টের একমাত্র প্রবেশ ও বেরোনোর পথে অবস্থিত নিচতলার রেস্টুরেন্টে রাখা বড় এলপিজি গ্যাস সিলিন্ডার বিকট শব্দে বিস্ফোরিত হয়। মুহূর্তের মধ্যেই আগুন কাঠ ও টিনের তৈরি তিনতলা সমান স্থাপনাটিতে ছড়িয়ে পড়ে। বের হওয়ার পথ সম্পূর্ণ অবরুদ্ধ হয়ে যাওয়ায় ঘুমন্ত পর্যটকেরা ভেতরেই আটকা পড়েন।খবর পেয়ে ফায়ার সার্ভিসের চারটি ইউনিটের পাশাপাশি বিজিবি, পুলিশ ও এসআরবি সদস্যরা উদ্ধারকাজে যোগ দেন। বেলা ১১টার দিকে আগুন নিয়ন্ত্রণে এলেও উদ্ধারকাজ চলে দুপুর পর্যন্ত। ধ্বংসস্তূপ থেকে প্রথমে ছয়টি এবং পরবর্তীতে পুড়ে যাওয়া বাথরুমের ভেতর থেকে আরও চারটি লাশ উদ্ধার করা হয়। সব মিলিয়ে এক শিশুসহ ১০ জনের মরদেহ উদ্ধার করা হয়েছে।আহত সাতজনকে উদ্ধার করে কক্সবাজার জেলা সদর হাসপাতালে পাঠানো হয়। তাঁদের মধ্যে গুরুতর দগ্ধ তিনজনকে উন্নত চিকিৎসার জন্য এয়ার অ্যাম্বুলেন্সে বা উড়োজাহাজে ঢাকায় স্থানান্তর করা হয়েছে। আহতদের মধ্যে মুগদা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের চিকিৎসক শাহাব উদ্দিন ও তাঁর স্ত্রী ডা. নাফিজা নাওয়ার খান রয়েছেন। অন্যান্য আহতদের একজন মিরপুরের আবদুল মান্নান জানান, সকালে ধোঁয়ায় চারপাশ অন্ধকার হয়ে গেলে তিনি পরিবারসহ পাশের নালায় লাফ দিয়ে জীবন বাঁচান।অন্যদিকে স্ত্রী ও আত্মীয়দের নিয়ে বেড়াতে আসা আশিকুল ইসলাম কান্নাজড়িত কণ্ঠে জানান, সকালে আগুন দেখে তাঁর স্ত্রী ঘুম থেকে তাঁকে ডেকে তোলেন এবং পাশের কক্ষে থাকা স্বজনদের বাঁচাতে যান। কিন্তু এর মধ্যেই আগুনের শিখা চারপাশ ঘিরে ফেলে। আশিক জানালার কাচ ভেঙে লাফিয়ে বের হতে পারলেও তাঁর স্ত্রী আর ফিরতে পারেননি। এ ঘটনায় নিহতদের মধ্যে রয়েছেন আশিকুলের স্ত্রী ইসরাত জাহান মালিহা, শ্যালিকা ইস্ট ওয়েস্ট ইউনিভার্সিটির শিক্ষার্থী মেলিতা মেহজাবিন আলভী, জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের রসায়ন বিভাগের শিক্ষার্থী লায়লা জাহান নাবিলা, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের চীনা ভাষা ও সংস্কৃতি বিভাগের শিক্ষার্থী নাফিজ তেহামী, ফারিহা কবির ও পাঁচ বছর বয়সী শিশু ফায়জান আহমেদ।ঢাবি ও জবি প্রশাসন পৃথক শোকবার্তায় তাঁদের মেধাবী শিক্ষার্থীদের অকাল মৃত্যুতে গভীর শোক প্রকাশ করেছে। সাভারের কেজি স্কুলের নিখোঁজ শিক্ষিকা নাসরিন আক্তারের বান্ধবী জানান, তাঁরা ভোরে বিচে ঘুরতে বেরিয়েছিলেন, কিন্তু ফিরে এসে দেখেন তাঁদের রিসোর্ট ও কক্ষে থাকা বান্ধবী আগুনে ভস্মীভূত হয়ে গেছে।ফায়ার সার্ভিস ও সিভিল ডিফেন্স অধিদপ্তরের মহাপরিচালক ব্রিগেডিয়ার জেনারেল সুলতানুল আফরীন জুনাইদ জানান, ৯ কক্ষের এই রিসোর্টটি সম্পূর্ণ অননুমোদিতভাবে চলছিল এবং তাদের কোনো ফায়ার সেফটি ছাড়পত্র ছিল না। গত জুনেই পরিদর্শন শেষে এটিকে ‘ঝুঁকিপূর্ণ’ হিসেবে চিহ্নিত করে নোটিস দেওয়া হলেও তা উপেক্ষা করে বাণিজ্যিক কার্যক্রম চালানো হচ্ছিল।এ ঘটনায় রিসোর্টের সহকারী ম্যানেজার মোহাম্মদ সুমনকে আটক করা হয়েছে। তবে তিনি দাবি করেছেন, বৈদ্যুতিক শর্টসার্কিট থেকে অগ্নিকাণ্ডের পর এসি ও সিলিন্ডার বিস্ফোরিত হয়।কক্সবাজারের জেলা প্রশাসক মো. আ. মান্নান জানিয়েছেন, নিহতদের মরদেহ অতিরিক্ত পুড়ে বিকৃত হয়ে যাওয়ায় পরিচয় সুনিশ্চিত করতে ডিএনএ পরীক্ষা করানো হবে। রিপোর্ট পাওয়ার পরই তা স্বজনদের কাছে হস্তান্তর করা হবে। অগ্নিকাণ্ডের সঠিক কারণ, ক্ষয়ক্ষতি ও সংশ্লিষ্টদের দায় নিরূপণে অতিরিক্ত জেলা ম্যাজিস্ট্রেটের নেতৃত্বে পাঁচ সদস্যের একটি উচ্চপর্যায়ের তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়েছে।

অবৈধ রিসোর্টে আগুন কেড়ে নিল ১০ জীবন