নিষেধাজ্ঞা উপেক্ষা করে পদ্মায় অবাধে চলছে মা ও পোনা ইলিশ শিকার
মা ইলিশের নিরাপদ প্রজনন ও ডিম ছাড়ার সুযোগ নিশ্চিত করতে সরকারের পক্ষ থেকে সারা দেশে ২২ দিনের (৮ অক্টোবর থেকে ২৯ অক্টোবর) জন্য ইলিশ আহরণ, পরিবহন ও বিক্রির ওপর কঠোর নিষেধাজ্ঞা জারি রয়েছে। তবে দিনে প্রশাসন ও মৎস্য বিভাগের কড়াকড়িতে আড়তগুলো ইলিশশূন্য দেখা গেলেও রাতের আঁধারে পদ্মা নদীতে অবাধে চলছে ডিমওয়ালা মা ইলিশ ও পোনা ইলিশ নিধন। জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাণিবিদ্যা বিভাগের অধ্যাপক এম এ আজিজের নেতৃত্বে পরিচালিত একটি নদীভিত্তিক গবেষণা দলের সরেজমিন পর্যবেক্ষণে উঠে এসেছে পদ্মায় নিষিদ্ধ ইলিশ শিকারের এই উদ্বেগজনক চিত্র।নদীর ডলফিন বা শুশুক জরিপ প্রকল্পের অংশ হিসেবে গবেষক দলটি রূপসা নদী থেকে আরিচা হয়ে পদ্মার উজান ঠেলে পাবনার নাজিরহাটের দিকে যাওয়ার পথে আরিচা ঘাট, শিবালয়ের নেহালপুর, তেউতা এবং রাজবাড়ীর দৌলতদিয়া সংলগ্ন চরভরাট এলাকায় এ পরিস্থিতি প্রত্যক্ষ করে। ১৮ অক্টোবর ভোরবেলায় আরিচা ফেরিঘাট আড়তে পদ্মা নদীর বড় চিতল, পাঙাশ, বাগাড়, পিয়ালি ও পাবদাসহ ৩৬ প্রজাতির দেশীয় মাছ উঠলেও সরকারি নিষেধাজ্ঞার কারণে সেখানে কোনো ইলিশের দেখা মেলেনি। তবে বিস্ময়করভাবে আড়তে ক্ষতিকর আগ্রাসী প্রজাতি হিসেবে চিহ্নিত দক্ষিণ আমেরিকার সাকার ফিশের উপস্থিতি লক্ষ করা গেছে, যা পদ্মার জলজ বাস্তুতন্ত্রের জন্য নতুন হুমকি।দিনের বেলায় আড়ত ও ঘাটগুলো নিয়মতান্ত্রিক মনে হলেও সন্ধ্যার পরপরই পদ্মার বুকে চিত্র পুরোপুরি বদলে যায়। শত শত ছোট ইঞ্জিনচালিত নৌকা নিয়ে জেলেরা নদীতে নেমে পড়েন। প্রশাসনের স্পিডবোটের টহল এলে জেলেরা সাময়িকভাবে সরে গেলেও টহল দল চলে যাওয়ার সাথে সাথেই আবার নদীতে পাতা জালের কাছে ফিরে আসেন। সারা রাত ধরে চলে মাছ শিকার। এরপর ফজরের আলো ফোটার পরপরই শিবালয়ের বিভিন্ন ঘাট ও রাজবাড়ীর চরভরাট খেয়াঘাটের মতো লোকচক্ষুর অন্তরালে থাকা পয়েন্টগুলোতে এই ইলিশ প্রকাশ্যেই বিক্রি করা হয়।সরেজমিনে দেখা যায়, ধরা পড়া মাছের বড় অংশই ৫ থেকে ৬ ইঞ্চি দৈর্ঘ্যের অপরিণত বাচ্চা ইলিশ এবং ৭০০ থেকে ৮০০ গ্রাম ওজনের ডিমওয়ালা মা ইলিশ। ঘাটে ব্যাপারীদের কাছে প্রতি কেজি ইলিশ মাত্র ৬০০ থেকে ৮০০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। সবচেয়ে আশঙ্কাজনক বিষয় হলো, জেলেরা তিন স্তরের সূক্ষ্ম ফাঁসের (১ ইঞ্চি, দেড় ইঞ্চি ও ২ ইঞ্চি) নিষিদ্ধ কারেন্ট জাল ব্যবহার করছেন, যা ভেদ করে কোনো মা কিংবা পোনা ইলিশের পক্ষে রক্ষা পাওয়া অসম্ভব। স্থানীয় জেলেদের অভিযোগ, ভাটি অঞ্চল থেকেই কারেন্ট জালের কারণে মাছ নির্বিচারে ধরা পড়ছে। ফলে সরকারের কঠোর নিষেধাজ্ঞা থাকা সত্ত্বেও নজরদারির ফাঁকফোকরে মাছের রাজা ইলিশের স্বাভাবিক বংশবৃদ্ধি ও বড় হওয়ার সুযোগ মারাত্মক হুমকির মুখে পড়েছে।