ইলিশের বাজারে আগুন
মা ইলিশের নির্বিঘ্ন প্রজনন নিশ্চিত করতে আগামী ৮ অক্টোবর থেকে চাঁদপুরের পদ্মা-মেঘনা নদীতে সব ধরনের জাল ফেলা নিষিদ্ধ হচ্ছে। নিষেধাজ্ঞা শুরুর আগে শেষ মুহূর্তে ইলিশ কেনাবেচায় ব্যস্ত সময় পার করছেন জেলে, আড়তদার ও ব্যবসায়ীরা। চাঁদপুর বড় স্টেশন মাছঘাটসহ সদর উপজেলার বিভিন্ন মাছঘাটে বেড়েছে ক্রেতাদের আনাগোনা। তবে চাহিদার তুলনায় ইলিশের সরবরাহ কম থাকায় বাজারে বেড়েছে দাম। দুই সপ্তাহ আগেও এক কেজি ওজনের ইলিশ যেখানে ২ হাজার ৪০০ টাকায় বিক্রি হয়েছিল, বর্তমানে তা বিক্রি হচ্ছে ২ হাজার ৮০০ থেকে ৩ হাজার টাকায়।সোমবার (৫ অক্টোবর) সকাল থেকে দুপুর পর্যন্ত চাঁদপুর বড় স্টেশন মাছঘাট, সদর উপজেলার লক্ষ্মীপুর মডেল ইউনিয়নের বহরিয়া মাছঘাট এবং হরিণা ফেরিঘাটসংলগ্ন ইলিশের আড়ত ঘুরে ক্রেতা-বিক্রেতাদের সঙ্গে কথা বলে এসব তথ্য জানা গেছে।বহরিয়া মাছঘাটে গিয়ে দেখা যায়, কিছুক্ষণ পরপর জেলেরা নদী থেকে ধরা ইলিশ নিয়ে ঘাটে আসছেন। তবে সেখানে পাওয়া মাছের সর্বোচ্চ ওজন প্রায় ৫০০ গ্রাম। ঘাটে আনার পর হাঁকডাকের মধ্যেই দ্রুত বিক্রি হয়ে যাচ্ছে ইলিশ। ছোট আকারের ইলিশ প্রতি হালি ৩০০ থেকে ৫০০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। আর প্রায় ৫০০ গ্রাম ওজনের ইলিশের প্রতি হালির দাম হাঁকা হচ্ছে ২ হাজার টাকা।বহরিয়া এলাকার জেলে হান্নান গাজী বলেন, মৌসুমের শেষ দিকে এসে ইলিশের সরবরাহ কিছুটা বেড়েছে। তবে আগস্ট মাসে মাছের পরিমাণ ছিল খুবই কম। বর্তমানে জেলেরা যে পরিমাণ ইলিশ পাচ্ছেন, তা দিয়ে কোনো রকমে মাছ ধরার খরচ তুলতে পারছেন।একই ঘাটের আড়তদার মো. ইদ্রিস আলী জানান, মৌসুমের শেষ সময়ে ইলিশের সরবরাহ কিছুটা বাড়লেও তা চাহিদার তুলনায় যথেষ্ট নয়। চাঁদপুরের ইলিশের সুনাম থাকায় বিভিন্ন এলাকা থেকে ক্রেতারা এখানে মাছ কিনতে আসেন। ফলে সরবরাহ কম থাকায় বাজারে চাহিদার চাপও বেশি।হানারচর ইউনিয়নের জেলে নজরুল ইসলাম বলেন, তাঁদের একটি নৌকায় ১০ জন কাজ করেন। রাতে নদীতে মাছ ধরতে নেমে সকালে ঘাটে ফিরেছেন তাঁরা। এবার যে পরিমাণ ইলিশ পেয়েছেন, তাতে মাছ ধরার খরচ উঠে এসেছে। তবে জালে ময়লা-আবর্জনা আটকে যাওয়ায় সেদিন আর নদীতে নামতে পারবেন না বলে জানান তিনি। নিষেধাজ্ঞা শুরুর আগে হয়তো আরও এক-দুই দিন মাছ ধরার সুযোগ পাবেন বলেও আশা করছেন এই জেলে।হরিণা মাছঘাটের পাইকারি বিক্রেতা মো. জাহাঙ্গীর ছৈয়াল বলেন, গত দুই সপ্তাহ ধরে এ ঘাটে প্রতিদিন গড়ে প্রায় ২০০ মণ ইলিশের সরবরাহ ছিল। তবে কয়েক দিন ধরে সরবরাহ কিছুটা কমেছে। অন্যদিকে দূরদূরান্ত থেকে ক্রেতারা মাছ কিনতে এলেও তাঁদের চাহিদা পুরোপুরি পূরণ করা যাচ্ছে না। গত সপ্তাহে এক কেজি ওজনের ইলিশ ২ হাজার ৫০০ টাকায় বিক্রি হলেও বর্তমানে একই মাছের দাম পড়ছে ২ হাজার ৮০০ থেকে ৩ হাজার টাকা। ছোট আকারের ইলিশের প্রতি হালির দাম ৫০০ থেকে ২ হাজার টাকা পর্যন্ত।হরিণা মাছঘাটের প্রবীণ বিক্রেতা সিরাজুল ইসলাম সৈয়াল বলেন, এ ঘাটে পদ্মা-মেঘনা নদী থেকে জেলেরা সরাসরি ইলিশ ধরে নিয়ে আসেন। অনেক সময় বরফ দেওয়ার আগেই ক্রেতারা মাছ কিনে নেন। তাঁর দাবি, সরাসরি জেলেদের কাছ থেকে মাছ কেনার সুযোগ থাকায় এখানে প্রতারণার আশঙ্কা কম। সকাল থেকে রাত ১০টা পর্যন্ত ঘাটের আড়তগুলোতে ইলিশ কেনাবেচা চলে।চাঁদপুর মৎস্য বণিক সমিতির সাধারণ সম্পাদক শবেবরাত সরকার বলেন, আগের সপ্তাহে কিছুটা বেশি ইলিশ পাওয়া গেলেও চলতি সপ্তাহে সরবরাহ কমেছে। নিষেধাজ্ঞার আগে কম দামে ইলিশ কেনার আশায় অনেকে ঘাটে এসে ফিরে যাচ্ছেন। কিন্তু চাহিদার তুলনায় মাছ কম থাকায় দাম কমছে না। তাঁর মতে, বাজারে ইলিশের সরবরাহ বাড়লে দামও কমে আসবে।চাঁদপুর সদর উপজেলা জ্যেষ্ঠ মৎস্য কর্মকর্তা মির্জা ওমর ফারুক বলেন, মৌসুমের শেষ দিকে এবার ইলিশের সরবরাহ কিছুটা বেড়েছে। হাজার হাজার জেলে নদীতে মাছ ধরছেন এবং তাঁরা কমবেশি ইলিশ পাচ্ছেন। তাঁর পর্যবেক্ষণ অনুযায়ী, এ বছর ধরা পড়া ইলিশের গড় আকার তুলনামূলকভাবে বড়।এই কর্মকর্তা আরও বলেন, সামনে ২২ দিনের প্রজনন মৌসুম সফলভাবে সম্পন্ন হলে তার সুফল জেলেরাই পাবেন। মা ইলিশকে নির্বিঘ্নে ডিম ছাড়ার সুযোগ দিতে ইতোমধ্যে সচেতনতামূলক কার্যক্রম শুরু করেছে মৎস্য বিভাগ।মা ইলিশ সংরক্ষণে নির্ধারিত সময়ে নদীতে মাছ ধরা বন্ধ রাখা হলে ইলিশের প্রজনন ও উৎপাদন বাড়বে বলে আশা সংশ্লিষ্টদের। তবে নিষেধাজ্ঞা শুরুর আগমুহূর্তে সরবরাহ ও চাহিদার ব্যবধানের কারণে চাঁদপুরের বাজারে ইলিশের দাম বাড়তি রয়েছে।