ঢাকা    রোববার, ১১ অক্টোবর ২০২৬, ২৫ আশ্বিন ১৪৩৩ ২৮ রবিউস সানি ১৪৪৮ হিজরি
বাংলাদেশ সময়
বাংলা ভিউজ

ইরানের নতুন নেতাকে ঘিরে অনিশ্চয়তা

মার্কিন নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহারের চেয়েও হরমুজ প্রণালিতে নিজেদের একচ্ছত্র নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠাকে বেশি গুরুত্ব দিচ্ছে ইরানের শাসকগোষ্ঠী। তেহরানের বিশ্বাস, যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল সাম্প্রতিক যুদ্ধে নিজেদের প্রধান লক্ষ্য অর্জনে ব্যর্থ হওয়ায় ইরান আঞ্চলিক পরাশক্তি হিসেবে আত্মপ্রকাশ করেছে।ইরানি কর্মকর্তাদের ধারণা, কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ হরমুজ প্রণালির ওপর স্থায়ী নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা এবং পারস্য উপসাগরীয় অর্থনীতির ওপর প্রভাব ধরে রাখা সম্ভব হলে নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহারসহ অন্যান্য সুবিধাও আদায় করা যাবে।[BANGVIEWS-POST:1653]ইরানের পার্লামেন্টের জাতীয় নিরাপত্তা কমিশনের প্রধান ইব্রাহিম আজিজি বলেছেন, হরমুজ প্রণালিতে ইরানের তৈরি নতুন শৃঙ্খলা মেনে নেওয়াই একমাত্র পথ। পার্লামেন্টের স্পিকার মোহাম্মদ বাঘের গালিবাফও বলেছেন, হরমুজ প্রণালি আমেরিকার হুমকিতে নয়, ইরানি ব্যবস্থাপনার মাধ্যমেই উন্মুক্ত থাকবে।বিশ্লেষকদের মতে, তেহরানের এমন অবস্থান মধ্যপ্রাচ্যে দীর্ঘমেয়াদি অস্থিরতার ইঙ্গিত দিচ্ছে। এতে নিয়মিত সহিংসতা, বৈশ্বিক জ্বালানি বাজারে অনিশ্চয়তা এবং উপসাগরীয় দেশগুলোর ওপর নতুন হামলার ঝুঁকি তৈরি হতে পারে।ওয়াশিংটনভিত্তিক কার্নেগি এনডাউমেন্ট ফর ইন্টারন্যাশনাল পিসের ইরানবিষয়ক বিশেষজ্ঞ করিম সাদজাদপুরের মতে, সাম্প্রতিক সংঘাত থেকে ইরানের শিক্ষা হলো—শক্তি প্রয়োগের মাধ্যমে ছাড় আদায় করা যায়। প্রতিবেশী দেশগুলোর ওপর হামলা, হরমুজ প্রণালিকে হুমকির মুখে ফেলা এবং তেলের দাম বাড়ানোর কৌশল তেহরান ভবিষ্যতেও অনুসরণ করতে পারে।উপসাগরীয় দেশগুলো তেল ও গ্যাস রপ্তানির পাশাপাশি খাদ্য ও নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্য আমদানির জন্যও হরমুজ প্রণালির ওপর ব্যাপকভাবে নির্ভরশীল। এ কারণে প্রণালিটির ওপর ইরানের প্রাতিষ্ঠানিক নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠার চেষ্টা মধ্যপ্রাচ্যে নতুন ‘প্যাক্স ইরানিকা’ বা ইরানি নেতৃত্বাধীন আঞ্চলিক ব্যবস্থা গড়ে তোলার উচ্চাকাঙ্ক্ষা হিসেবে দেখা হচ্ছে।[BANGVIEWS-POST:1655]সম্প্রতি তেহরানে আলী খামেনির জানাজায় সৌদি আরব, কাতার ও ওমানের কর্মকর্তাদের উপস্থিতিকে আঞ্চলিক সম্পর্ক পরিবর্তনের একটি ইঙ্গিত হিসেবে বিবেচনা করা হচ্ছে। অন্যদিকে সংযুক্ত আরব আমিরাতসহ কয়েকটি দেশ জানাজায় অংশ না নিলেও তেহরানের সঙ্গে সরাসরি যোগাযোগ অব্যাহত রেখেছে।তেল আবিবের ইনস্টিটিউট ফর ন্যাশনাল সিকিউরিটি স্টাডিজের রাজ জিমাতের মতে, উপসাগরীয় দেশগুলো বুঝতে পেরেছে যে ইরান তাদের স্থায়ী প্রতিবেশী। মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প চিরকাল ক্ষমতায় থাকবেন না; তাই ইরানের সঙ্গে সহাবস্থানের বাস্তবতা তাদের মেনে নিতে হবে।সাম্প্রতিক সহিংসতার পর আন্তর্জাতিক বাজারে ইরানের তেল বিক্রির অনুমতি দিয়ে জারি করা ছাড়পত্র প্রত্যাহার করেছে ওয়াশিংটন। পারমাণবিক কর্মসূচি নিয়ে আলোচনা চলাকালে এ ছাড়পত্র নিষেধাজ্ঞায় বিপর্যস্ত ইরানি অর্থনীতির জন্য গুরুত্বপূর্ণ সহায়তা হিসেবে কাজ করছিল।হরমুজ প্রণালি পার হওয়ার চেষ্টা করা কয়েকটি জাহাজে ইরানের হামলার পর যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে নতুন করে পাল্টাপাল্টি হামলা শুরু হয়। তেহরানের দাবি, নৌযানগুলো ইরানি ব্যবস্থাপনা এড়িয়ে ওমানের জলসীমা ব্যবহার করছিল। যুক্তরাষ্ট্র এ ব্যাখ্যা প্রত্যাখ্যান করে হামলাকে সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ড হিসেবে আখ্যা দিয়েছে।হরমুজ প্রণালি কীভাবে পরিচালিত হবে, তা নিয়ে ওমান ও ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রীরা বৈঠক করেছেন। তবে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরান—দুই পক্ষই সাম্প্রতিক সংঘাতে নিজেদের বিজয়ী মনে করায় সংকটের চূড়ান্ত সমাধান অনিশ্চিত হয়ে পড়েছে।ওয়াশিংটন ইনস্টিটিউট ফর নিয়ার ইস্ট পলিসির হোলি ড্যাগরেসের মতে, ইরান যুদ্ধের দ্বারপ্রান্তে গিয়ে দর-কষাকষির কৌশল নিয়েছে। তেহরান মনে করছে, হরমুজে অচলাবস্থা ও যুদ্ধ নিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের অভ্যন্তরীণ অসন্তোষ প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের ওপর চাপ বাড়াবে।তবে সৌদি ভূরাজনৈতিক বিশ্লেষক সালমান আল-আনসারি ইরানের আঞ্চলিক পরাশক্তি হয়ে ওঠার দাবিকে বিভ্রান্তি হিসেবে দেখছেন। তাঁর মতে, ইরানের সামরিক শক্তি, প্রক্সি নেটওয়ার্ক ও অর্থনীতি দুর্বল হয়ে পড়েছে। বর্তমানে ভয় দেখানো এবং অস্থিতিশীলতা তৈরির সামর্থ্যই দেশটির প্রধান হাতিয়ার।এখনো পাল্টাপাল্টি হামলা পূর্ণাঙ্গ যুদ্ধে রূপ নেয়নি। যুক্তরাষ্ট্র সরাসরি তেহরানকে লক্ষ্যবস্তু করেনি এবং ইরানও সৌদি আরব ও সংযুক্ত আরব আমিরাতে নতুন কোনো হামলা চালায়নি। তবে কোনো বড় হামলায় মার্কিন সেনা নিহত হলে পরিস্থিতি দ্রুত নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যেতে পারে বলে সতর্ক করেছেন সিআইএর সাবেক কর্মকর্তা মার্ক পলিমেরোপুলোস।ইরানের অভ্যন্তরীণ নেতৃত্ব সংকট পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলেছে। সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষমতা কার হাতে রয়েছে, তা স্পষ্ট নয়। দেশটির কয়েকটি কট্টরপন্থী গোষ্ঠী যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সমঝোতার বিরোধিতা করছে। বিশ্লেষকদের মতে, রাজনৈতিক সংস্কারের পথ বন্ধ এবং শাসনব্যবস্থা আরও শক্তিশালী করতে এসব গোষ্ঠীর সংকট দীর্ঘায়িত করার স্বার্থ রয়েছে।কুয়েত বিশ্ববিদ্যালয়ের রাষ্ট্রবিজ্ঞানের অধ্যাপক হামাদ আলসুনায়িয়ান বলেছেন, যুক্তরাষ্ট্রের নীতি নিয়ে অসন্তোষ থাকলেও পারস্য উপসাগরীয় দেশগুলোর জন্য ওয়াশিংটন এখনো সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ নিরাপত্তা অংশীদার। ইরানের আধিপত্য বিস্তারের চেষ্টা মোকাবিলায় দেশগুলোর পারস্পরিক সহযোগিতা ও সামরিক প্রতিরোধক্ষমতা বাড়ানো প্রয়োজন।তাঁর মতে, উপসাগরীয় দেশগুলো ইরানের হুমকি মোকাবিলায় কী ধরনের সিদ্ধান্ত নেয়, তার ওপরই এ অঞ্চলের ভবিষ্যৎ ভূরাজনীতি অনেকাংশে নির্ভর করবে।

ইরানের নতুন নেতাকে ঘিরে অনিশ্চয়তা