যুক্তরাষ্ট্রের অর্থনৈতিক পতন ও দীর্ঘস্থায়ী যুদ্ধের পূর্বাভাস
‘আমেরিকার নস্ত্রাদামুস’ নামে পরিচিত ভবিষ্যৎবাণী গবেষক জন হগের এক চাঞ্চল্যকর পূর্বাভাস আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমে আলোচনার সৃষ্টি করেছে। তাঁর দাবি অনুযায়ী, ২০২৮ সালের মধ্যে ভূরাজনীতিতে ধারাবাহিক পারমাণবিক হামলা, পরাশক্তি হিসেবে যুক্তরাষ্ট্রের অর্থনৈতিক পতন এবং প্রায় ২৭ বছরব্যাপী এক বিধ্বংসী বিশ্বযুদ্ধের মতো সংকটময় পরিস্থিতির সৃষ্টি হতে পারে। তবে আন্তর্জাতিক বিশ্লেষক ও বিজ্ঞানীদের মতে, এসব দাবি সম্পূর্ণভাবে প্রাচীন সংকেতের ব্যক্তিগত ব্যাখ্যার ওপর প্রতিষ্ঠিত এবং এগুলোর পেছনে কোনো বস্তুনিষ্ঠ বা বৈজ্ঞানিক ভিত্তি নেই। জন হগ নিজেকে ষোড়শ শতকের প্রখ্যাত ফরাসি ভবিষ্যৎদ্রষ্টা মিশেল দ্য নস্ত্রেদামের (নস্ত্রাদামুস) লেখা নিয়ে প্রায় চার দশক ধরে গবেষণারত বলে দাবি করেন। সম্প্রতি ব্রিটিশ গণমাধ্যম দ্য সানকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে তিনি মধ্যপ্রাচ্যে চরম অস্থিরতা, বৈশ্বিক জ্বালানি অবকাঠামো ধ্বংস এবং পারমাণবিক বিপর্যয়ের সম্ভাবনার কথা তুলে ধরেন।হগের পূর্বাভাসে মধ্যপ্রাচ্যকে সম্ভাব্য সংঘাতের প্রধান কেন্দ্র হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে। তাঁর দাবি, ইরান-ইসরায়েল ও পশ্চিমা সামরিক উত্তেজনার একপর্যায়ে যদি প্রচলিত অস্ত্রের সংকট তৈরি হয়, তবে কৌশলগত পারমাণবিক অস্ত্র ব্যবহারের মারাত্মক ঝুঁকি দেখা দেবে। ইরানের ভূগর্ভস্থ পারমাণবিক স্থাপনায় যেকোনো ধরনের আঘাত পাল্টা প্রতিক্রিয়া হিসেবে আরব সাগরে অবস্থানরত মার্কিন যুদ্ধজাহাজে ড্রোন ও ক্ষেপণাস্ত্র হামলার পথ খুলে দিতে পারে, যা সংঘাতকে পূর্ণাঙ্গ পারমাণবিক রূপ দেবে। নস্ত্রাদামুসের প্রাচীন চতুর্দশপদী শ্লোক ব্যাখ্যা করতে গিয়ে জন হগ ‘মাবুস’ (Mabus) নামের এক রহস্যময় চরিত্রের অপমৃত্যুর প্রসঙ্গ টানেন। তাঁর ব্যক্তিগত বিশ্লেষণ অনুযায়ী, এই ‘মাবুস’ সৌদি আরবের যুবরাজ মোহাম্মদ বিন সালমানকে (এমবিএস) নির্দেশ করতে পারে। হগের মতে, সেখানে কোনো অভ্যুত্থান বা আকস্মিক মৃত্যুর ঘটনা ঘটলে পশ্চিম এশিয়ার তেল, প্রাকৃতিক গ্যাস ও সরবরাহব্যবস্থা ধ্বংস হয়ে ২৭ বছর মেয়াদি যুদ্ধ শুরু হতে পারে, যার ধাক্কায় সারা বিশ্বে তীব্র খাদ্য ও মানবিক সংকট দেখা দেবে। তবে ইতিহাসবিদরা বরাবরই স্পষ্ট করেছেন যে, ‘মাবুস’ নিয়ে এমন যোগসূত্র সম্পূর্ণ মনগড়া ব্যাখ্যা মাত্র। ইউরোপের প্রেক্ষাপট টেনে হগ সতর্ক করেন, রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধে পশ্চিমা দেশগুলোর সরাসরি সম্পৃক্ততা বাড়লে রাশিয়া ইউরোপীয় অস্ত্র কারখানায় হাইপারসনিক হামলা চালাতে পারে, যা শেষ পর্যন্ত ন্যাটো বনাম রাশিয়ার তৃতীয় বিশ্বযুদ্ধে রূপ নিতে পারে। যুক্তরাষ্ট্রের ভবিষ্যৎ নিয়ে তিনি দাবি করেন, ২০২৬ থেকে ২০২৮ সালের মধ্যে বৈশ্বিক পরাশক্তি হিসেবে দেশটির একচ্ছত্র আধিপত্যের অবসান ঘটতে পারে। তীব্র মূল্যস্ফীতি, জ্বালানি তেলের সংকট ও অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক বিভাজনের কারণে ২০২৮ সালের ১১ সেপ্টেম্বর—নাইন-ইলেভেনের বার্ষিকীকে প্রতীকী সময় ধরে তিনি যুক্তরাষ্ট্রের অর্থনৈতিক ভাঙনের আশঙ্কা প্রকাশ করেন। ভীতিকর এসব পূর্বাভাসের বিষয়ে জন হগ দাবি করেছেন, তাঁর লক্ষ্য জনমনে আতঙ্ক তৈরি করা নয়, বরং যুদ্ধের ধ্বংসযজ্ঞ থেকে মানুষকে শান্তির পথে ফিরে আসার তাগিদ দেওয়া। তবে বিশ্লেষকদের অভিমত, নস্ত্রাদামুসের লেখাগুলো অস্পষ্ট ও রূপকধর্মী হওয়ায় বিভিন্ন সময় সেগুলোকে সমসাময়িক ঘটনার সঙ্গে মিলিয়ে বিভ্রান্তিকর ব্যাখ্যা দাঁড় করানো হয়; বাস্তব ভূরাজনীতিতে এমন পূর্বাভাসের কোনো নির্ভরযোগ্যতা নেই।