প্রবাসী আয়ে নতুন মাইলফলক, এক বছরে এসেছে ৩২ বিলিয়ন ডলার
- আপডেট: শুক্রবার, ২ জানুয়ারী ২০২৬
- / 7
রেমিট্যান্স প্রবাহে ধারাবাহিক ইতিবাচক ধারা বজায় রেখেই সদ্য বিদায়ী ২০২৫ সালে নতুন এক মাইলফলক স্পর্শ করেছে বাংলাদেশ। প্রবাসী আয়ের ক্ষেত্রে এই বছরটি দেশের ইতিহাসে সবচেয়ে সফল বছর হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে। বাংলাদেশ ব্যাংকের সর্বশেষ পরিসংখ্যান অনুযায়ী, ২০২৫ সালে বিশ্বের বিভিন্ন দেশে কর্মরত বাংলাদেশিরা দেশে পাঠিয়েছেন ৩২ বিলিয়ন মার্কিন ডলারের বেশি রেমিট্যান্স—যা এক বছরে সর্বোচ্চ আহরণের রেকর্ড।
বিশ্ব অর্থনীতিতে মন্দা, মধ্যপ্রাচ্য ও ইউরোপের রাজনৈতিক অস্থিরতা এবং বৈশ্বিক আর্থিক অনিশ্চয়তার মধ্যেও প্রবাসীদের পাঠানো এই অর্থ দেশের বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভকে শক্ত ভিত্তি দিয়েছে। ফলে আমদানি ব্যয় মেটানো, বৈদেশিক দেনা পরিশোধ এবং সামগ্রিক অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা ধরে রাখতে সরকার ও কেন্দ্রীয় ব্যাংক স্বস্তি পেয়েছে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
আগের বছর ২০২৪ সালে দেশে রেমিট্যান্স এসেছিল ২৬ দশমিক ৮৯ বিলিয়ন ডলার। এক বছরের ব্যবধানে তা বেড়েছে প্রায় ৬ বিলিয়ন ডলার, যা শতকরা হিসাবে প্রায় ১৮ শতাংশের মতো বৃদ্ধি। বিশেষ করে বছরের শেষ দিকে রেমিট্যান্স প্রবাহ আরও জোরালো হয়। ডিসেম্বর মাসে প্রবাসীরা দেশে পাঠান ৩২৩ কোটি মার্কিন ডলার, যা একক মাসে দ্বিতীয় সর্বোচ্চ রেমিট্যান্স হিসেবে বিবেচিত। এর আগে ২০২৫ সালের মার্চ মাসে সর্বোচ্চ ৩২৯ কোটি ৫৬ লাখ ডলারের রেমিট্যান্স এসেছিল।
বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য বিশ্লেষণে দেখা যায়, ২০২৪ সালের ডিসেম্বর মাসে প্রবাসীরা দেশে পাঠিয়েছিলেন ২৬৪ কোটি ডলার। এক বছরের ব্যবধানে একই মাসে রেমিট্যান্স বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৩২৩ কোটি ডলারে। অর্থাৎ ডিসেম্বর মাসে রেমিট্যান্স প্রবাহ বেড়েছে প্রায় ৫৯ কোটি ডলার বা প্রায় ২২ শতাংশ, যা প্রবাসী আয়ের প্রবণতায় শক্তিশালী গতি নির্দেশ করে।
অর্থনীতিবিদরা বলছেন, দেশের বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ গঠনে মূলত তিনটি উৎস গুরুত্বপূর্ণ—রেমিট্যান্স, রপ্তানি আয় এবং বিদেশি ঋণ। এর মধ্যে রেমিট্যান্স সবচেয়ে নির্ভরযোগ্য উৎস, কারণ এটি সরাসরি বৈদেশিক মুদ্রা এনে দেয় এবং এর সঙ্গে শর্তযুক্ত ঋণের চাপ বা সুদের দায় নেই। ফলে অর্থনীতির জন্য এটি দীর্ঘমেয়াদে সবচেয়ে নিরাপদ সহায়ক শক্তি।
বাংলাদেশ ব্যাংকের কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, হুন্ডি ও অবৈধ চ্যানেল দমনে সরকারের কঠোর অবস্থান, প্রবাসী আয়ে নগদ প্রণোদনা অব্যাহত রাখা, ব্যাংকিং চ্যানেলের ডিজিটাল ও দ্রুত সেবা এবং মোবাইল ফাইন্যান্সিয়াল সেবার বিস্তারের কারণে প্রবাসীরা আগের চেয়ে বেশি হারে বৈধ পথে টাকা পাঠাচ্ছেন। এসব উদ্যোগের ফলেই রেমিট্যান্স প্রবাহে ধারাবাহিক উন্নতি দেখা যাচ্ছে।
২০২৫ সালের মাসভিত্তিক রেমিট্যান্স পরিসংখ্যানেও এই প্রবৃদ্ধির চিত্র স্পষ্ট। জানুয়ারি মাসে দেশে আসে ২১৮ কোটি ডলার, ফেব্রুয়ারিতে ২৫৩ কোটি, মার্চে ৩৩০ কোটি, এপ্রিলে ২৭৫ কোটি, মে মাসে ২৯৭ কোটি, জুনে ২৮২ কোটি, জুলাইয়ে ২৪৮ কোটি, আগস্টে ২৪২ কোটি, সেপ্টেম্বরে ২৬৮ কোটি, অক্টোবরে ২৫৬ কোটি, নভেম্বরে ২৮৯ কোটি এবং ডিসেম্বরে সর্বোচ্চগুলোর একটি হিসেবে আসে ৩২৩ কোটি মার্কিন ডলার।
বছরভিত্তিক পরিসংখ্যানেও দেখা যায়, সাম্প্রতিক বছরগুলোতে রেমিট্যান্সে ধারাবাহিক উন্নতি হয়েছে। ২০২৪ সালে প্রবাসী আয় ছিল ২৬ দশমিক ৮৯ বিলিয়ন ডলার, ২০২৩ সালে ২১ দশমিক ৯২ বিলিয়ন, ২০২২ সালে ২১ দশমিক ২৯ বিলিয়ন, ২০২১ সালে ২২ দশমিক ০৭ বিলিয়ন এবং ২০২০ সালে ২১ দশমিক ৭৪ বিলিয়ন ডলার। এর আগে ২০১৪ থেকে ২০১৯ সাল পর্যন্ত রেমিট্যান্সের পরিমাণ ছিল মূলত ১৩ থেকে ১৮ বিলিয়ন ডলারের মধ্যে সীমাবদ্ধ।
অর্থবছর হিসাবেও রেমিট্যান্সের প্রবৃদ্ধি ইতিবাচক রয়েছে। চলতি ২০২৫-২৬ অর্থবছরের প্রথম ছয় মাসে (জুলাই থেকে ডিসেম্বর) দেশে রেমিট্যান্স এসেছে ১৬ দশমিক ২৬ বিলিয়ন ডলার। আগের ২০২৪-২৫ অর্থবছরে মোট রেমিট্যান্স ছিল ৩০ দশমিক ৩২৮ বিলিয়ন ডলার এবং ২০২৩-২৪ অর্থবছরে ছিল ২৩ দশমিক ৯২ বিলিয়ন ডলার।
রেমিট্যান্স প্রবাহ বাড়ার সরাসরি প্রভাব পড়েছে বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভে। বাংলাদেশ ব্যাংকের হিসাব অনুযায়ী, ৩০ ডিসেম্বর পর্যন্ত দেশের মোট বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৩৩ দশমিক ১৮ বিলিয়ন ডলারে। আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের (আইএমএফ) বিপিএম-৬ পদ্ধতি অনুযায়ী রিজার্ভের পরিমাণ বর্তমানে ২৮ দশমিক ৫২ বিলিয়ন ডলার।
সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন, প্রবাসী আয় যদি এই ধারায় অব্যাহত থাকে, তাহলে বৈদেশিক লেনদেনের ভারসাম্য উন্নত হবে, রিজার্ভ আরও শক্তিশালী হবে এবং সামগ্রিকভাবে দেশের অর্থনীতি আরও স্থিতিশীল অবস্থানে যেতে পারবে।
















