ঢাকা ০৬:১৯ অপরাহ্ন, বুধবার, ১৪ জানুয়ারী ২০২৬, ১ মাঘ ১৪৩২ বঙ্গাব্দ

জুমার নামাজ কতক্ষণ পর্যন্ত দেরি করে পড়া যায়?

স্টাফ রিপোর্টার
  • আপডেট: শুক্রবার, ২ জানুয়ারী ২০২৬
  • / 12

ইসলামী জীবনব্যবস্থায় জুমার নামাজ কেবল একটি ফরজ ইবাদত নয়; বরং এটি মুসলিম উম্মাহর ঐক্য, শৃঙ্খলা ও ঈমানি চেতনার প্রতিফলন। সপ্তাহের শ্রেষ্ঠ দিন হিসেবে স্বীকৃত জুমার দিনে আল্লাহ তাআলা বিশেষভাবে মুমিনদের তাঁর স্মরণের দিকে আহ্বান জানিয়েছেন। তবু বাস্তব জীবনে অনেকের মনে একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন দেখা দেয়—জুমার নামাজ সর্বোচ্চ কতক্ষণ পর্যন্ত দেরি করে আদায় করা যায়? এর সঠিক উত্তর জানতে হলে কোরআন, হাদিস এবং ফিকহে হানাফির স্পষ্ট দিকনির্দেশনার দিকে ফিরে তাকাতে হয়।

কোরআনের নির্দেশনা

আল্লাহ তাআলা পবিত্র কোরআনে বলেন—

“হে মুমিনগণ! জুমার দিনে যখন নামাজের জন্য আহ্বান করা হয়, তখন তোমরা আল্লাহর স্মরণের দিকে দ্রুত অগ্রসর হও এবং বেচাকেনা পরিত্যাগ কর।”
(সুরা আল-জুমআ : ৯)

এই আয়াত থেকে বোঝা যায়, জুমার নামাজ নির্দিষ্ট সময়ের সঙ্গে সম্পৃক্ত এবং এতে গাফিলতির কোনো সুযোগ নেই। আজান শোনার সঙ্গে সঙ্গে দুনিয়াবি ব্যস্ততা ত্যাগ করে মসজিদের দিকে যাত্রা করাই একজন মুমিনের দায়িত্ব।

হাদিসের আলোকে জুমার সময়

রাসুলুল্লাহ ﷺ নিয়মিতভাবে সূর্য মধ্যাকাশ থেকে পশ্চিমে ঢলে পড়ার পর—অর্থাৎ যাওয়ালের পর—জুমার নামাজ আদায় করতেন। সাহাবায়ে কেরামের আমল থেকেও এর ব্যতিক্রম পাওয়া যায় না।

হাদিসে এসেছে—

“রাসুলুল্লাহ ﷺ সূর্য ঢলে পড়ার পর জুমার নামাজ আদায় করতেন।”
(সহিহ বুখারি)

এ থেকে স্পষ্ট হয় যে, জুমার নামাজের সময় শুরু হয় জোহরের সময় শুরু হওয়ার সঙ্গে সঙ্গেই।

ফিকহে হানাফির সিদ্ধান্ত

ফিকহে হানাফির মতে, জুমার নামাজের সময় জোহরের সময়ের মতোই। অর্থাৎ সূর্য ঢলে পড়ার পর থেকে আসরের সময় শুরু হওয়ার আগ পর্যন্ত জুমা আদায় করা বৈধ। কিন্তু আসরের সময় শুরু হয়ে গেলে জুমা আর সহিহ থাকে না।

ইমাম আবু হানিফা (রহ.) ও তাঁর অনুসারীদের অভিমত অনুযায়ী, যদি কোনো কারণে আসরের আগ পর্যন্ত জুমা আদায় করা সম্ভব না হয়, তাহলে জুমা বাতিল হয়ে যাবে এবং তখন চার রাকাত জোহরের নামাজ পড়তে হবে।

ফিকহের গ্রন্থে বলা হয়েছে—

“জুমার সময় হলো জোহরের সময়। জোহরের সময় শেষ হয়ে গেলে জুমাও ছুটে যায়।”
(হিদায়া ১/১৮২; আল-ইনায়া ২/৩৭৪)

ইচ্ছাকৃত দেরির পরিণতি

যদিও শরিয়ত আসরের আগ পর্যন্ত সময়ের অনুমতি দিয়েছে, তবুও অকারণে জুমার নামাজ দেরি করা অত্যন্ত নিন্দনীয়। রাসুলুল্লাহ ﷺ কঠোরভাবে সতর্ক করে বলেছেন—

“যে ব্যক্তি অবহেলার কারণে পরপর তিনটি জুমা পরিত্যাগ করে, আল্লাহ তার অন্তরে মোহর মেরে দেন।”
(আবু দাউদ)

অতএব, কেবল সময়সীমার মধ্যে নামাজ আদায় করাই যথেষ্ট নয়; বরং খুতবা শোনাসহ যথাসম্ভব আগেভাগে মসজিদে উপস্থিত হওয়াই একজন মুত্তাকির পরিচয়।

উপসংহার

সংক্ষেপে বলা যায়, ফিকহে হানাফির আলোকে জুমার নামাজ জোহরের সময় শুরু হওয়ার পর থেকে আসরের সময় শুরু হওয়ার আগ পর্যন্ত আদায় করা যায়। তবে বিনা কারণে দেরি করা মুমিনের জন্য শোভন নয়। জুমা আল্লাহর পক্ষ থেকে একটি বিশেষ আহ্বান—এই আহ্বানে সাড়া দেওয়া ঈমানের পরিচয়, আর অবহেলা করা অন্তরের দুর্বলতার লক্ষণ।

আল্লাহ তাআলা আমাদের সবাইকে সময়ের গুরুত্ব অনুধাবন করে জুমার নামাজ যথাযথ আদব ও আন্তরিকতার সঙ্গে আদায় করার তাওফিক দান করুন। আমিন।

শেয়ার করুন

জুমার নামাজ কতক্ষণ পর্যন্ত দেরি করে পড়া যায়?

আপডেট: শুক্রবার, ২ জানুয়ারী ২০২৬

ইসলামী জীবনব্যবস্থায় জুমার নামাজ কেবল একটি ফরজ ইবাদত নয়; বরং এটি মুসলিম উম্মাহর ঐক্য, শৃঙ্খলা ও ঈমানি চেতনার প্রতিফলন। সপ্তাহের শ্রেষ্ঠ দিন হিসেবে স্বীকৃত জুমার দিনে আল্লাহ তাআলা বিশেষভাবে মুমিনদের তাঁর স্মরণের দিকে আহ্বান জানিয়েছেন। তবু বাস্তব জীবনে অনেকের মনে একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন দেখা দেয়—জুমার নামাজ সর্বোচ্চ কতক্ষণ পর্যন্ত দেরি করে আদায় করা যায়? এর সঠিক উত্তর জানতে হলে কোরআন, হাদিস এবং ফিকহে হানাফির স্পষ্ট দিকনির্দেশনার দিকে ফিরে তাকাতে হয়।

কোরআনের নির্দেশনা

আল্লাহ তাআলা পবিত্র কোরআনে বলেন—

“হে মুমিনগণ! জুমার দিনে যখন নামাজের জন্য আহ্বান করা হয়, তখন তোমরা আল্লাহর স্মরণের দিকে দ্রুত অগ্রসর হও এবং বেচাকেনা পরিত্যাগ কর।”
(সুরা আল-জুমআ : ৯)

এই আয়াত থেকে বোঝা যায়, জুমার নামাজ নির্দিষ্ট সময়ের সঙ্গে সম্পৃক্ত এবং এতে গাফিলতির কোনো সুযোগ নেই। আজান শোনার সঙ্গে সঙ্গে দুনিয়াবি ব্যস্ততা ত্যাগ করে মসজিদের দিকে যাত্রা করাই একজন মুমিনের দায়িত্ব।

হাদিসের আলোকে জুমার সময়

রাসুলুল্লাহ ﷺ নিয়মিতভাবে সূর্য মধ্যাকাশ থেকে পশ্চিমে ঢলে পড়ার পর—অর্থাৎ যাওয়ালের পর—জুমার নামাজ আদায় করতেন। সাহাবায়ে কেরামের আমল থেকেও এর ব্যতিক্রম পাওয়া যায় না।

হাদিসে এসেছে—

“রাসুলুল্লাহ ﷺ সূর্য ঢলে পড়ার পর জুমার নামাজ আদায় করতেন।”
(সহিহ বুখারি)

এ থেকে স্পষ্ট হয় যে, জুমার নামাজের সময় শুরু হয় জোহরের সময় শুরু হওয়ার সঙ্গে সঙ্গেই।

ফিকহে হানাফির সিদ্ধান্ত

ফিকহে হানাফির মতে, জুমার নামাজের সময় জোহরের সময়ের মতোই। অর্থাৎ সূর্য ঢলে পড়ার পর থেকে আসরের সময় শুরু হওয়ার আগ পর্যন্ত জুমা আদায় করা বৈধ। কিন্তু আসরের সময় শুরু হয়ে গেলে জুমা আর সহিহ থাকে না।

ইমাম আবু হানিফা (রহ.) ও তাঁর অনুসারীদের অভিমত অনুযায়ী, যদি কোনো কারণে আসরের আগ পর্যন্ত জুমা আদায় করা সম্ভব না হয়, তাহলে জুমা বাতিল হয়ে যাবে এবং তখন চার রাকাত জোহরের নামাজ পড়তে হবে।

ফিকহের গ্রন্থে বলা হয়েছে—

“জুমার সময় হলো জোহরের সময়। জোহরের সময় শেষ হয়ে গেলে জুমাও ছুটে যায়।”
(হিদায়া ১/১৮২; আল-ইনায়া ২/৩৭৪)

ইচ্ছাকৃত দেরির পরিণতি

যদিও শরিয়ত আসরের আগ পর্যন্ত সময়ের অনুমতি দিয়েছে, তবুও অকারণে জুমার নামাজ দেরি করা অত্যন্ত নিন্দনীয়। রাসুলুল্লাহ ﷺ কঠোরভাবে সতর্ক করে বলেছেন—

“যে ব্যক্তি অবহেলার কারণে পরপর তিনটি জুমা পরিত্যাগ করে, আল্লাহ তার অন্তরে মোহর মেরে দেন।”
(আবু দাউদ)

অতএব, কেবল সময়সীমার মধ্যে নামাজ আদায় করাই যথেষ্ট নয়; বরং খুতবা শোনাসহ যথাসম্ভব আগেভাগে মসজিদে উপস্থিত হওয়াই একজন মুত্তাকির পরিচয়।

উপসংহার

সংক্ষেপে বলা যায়, ফিকহে হানাফির আলোকে জুমার নামাজ জোহরের সময় শুরু হওয়ার পর থেকে আসরের সময় শুরু হওয়ার আগ পর্যন্ত আদায় করা যায়। তবে বিনা কারণে দেরি করা মুমিনের জন্য শোভন নয়। জুমা আল্লাহর পক্ষ থেকে একটি বিশেষ আহ্বান—এই আহ্বানে সাড়া দেওয়া ঈমানের পরিচয়, আর অবহেলা করা অন্তরের দুর্বলতার লক্ষণ।

আল্লাহ তাআলা আমাদের সবাইকে সময়ের গুরুত্ব অনুধাবন করে জুমার নামাজ যথাযথ আদব ও আন্তরিকতার সঙ্গে আদায় করার তাওফিক দান করুন। আমিন।